মানুষ কইত, ‘কুদ্দুস, দুইটা গান শোনাও’

কুদ্দুস বয়াতি
বাড়ি বাড়ি গেছি। কেউ ১০ টাকা দিছে, কেউ ২০ টাকা; আবার কেউ একমুঠ চাল। ওই চাল দিয়া ঘরে ভাত রাঁধা হইছে। লজ্জা পাই নাই। গান গাওয়া আমার ইজ্জত।
কুদ্দুস বয়াতি

লোকসংগীতের এক নিবেদিত কণ্ঠ কুদ্দুস বয়াতি। জন্ম নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেই গ্রামই তাঁর শিল্পের প্রথম পাঠশালা। ‘দিনবদলের গান’, ‘এই দিন দিন নয়, আরও দিন আছে’ তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে সর্বস্তরের মানুষের কাছে। ‘পাগলা ঘোড়া’ গানের মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে থাকতে চান মানুষের হৃদয়ে। চলচ্চিত্র ও নাটকে গান ও অভিনয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। বিশেষ করে ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ ছবিতে উপস্থিতি তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও পরিচিত করেছে। সহজ-সরল এই মানুষটি বলেন, ‘মানুষের ভালোবাসাই আমার বড় পুঁজি।’

সম্প্রতি লোকসংগীতের এই জীবন্ত কিংবদন্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ময়মনসিংহ বন্ধুসভার উপদেষ্টা মো. আবুল বাশার, যেখানে উঠে এসেছে শৈশব, গান গাওয়ার শুরুর দিকের গল্প, কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, চলচ্চিত্রে অভিনয়, জীবনদর্শনসহ নানা বিষয়।

কুদ্দুস বয়াতি

বন্ধুসভা: শৈশবের গল্প দিয়ে শুরু করি। কেন্দুয়ার সেই প্রত্যন্ত গ্রাম কেমন ছিল?

কুদ্দুস বয়াতি: আরে ভাই, আমার সবকিছুর শুরুডাই তো ওই গাঁওগেরাম থাইকা। মাঠঘাট, হাওর-বাঁওড়—এগুলোই তো আমার গান। কেন্দুয়ার ওই গেরামের মানুষ যেমন সোজা, তেমনি সোজা আমার সুর।

বন্ধুসভা: শুরুর দিনগুলো কেমন ছিল?

কুদ্দুস বয়াতি: কষ্টের আছিল। বাড়ি বাড়ি গেছি। কেউ ১০ টাকা দিছে, কেউ ২০ টাকা; আবার কেউ একমুঠ চাল। ওই চাল দিয়া ঘরে ভাত রাঁধা হইছে। লজ্জা পাই নাই। গান গাওয়া আমার ইজ্জত। মানুষ কইত, ‘কুদ্দুস, দুইটা গান শোনাও’—তাৎক্ষণিক মনে যা আইত, তা–ই গাইতাম সুর দিয়া। এইডাই ছিল আমার গান। আসল মঞ্চ।

বন্ধুসভা: আপনাকে প্রায়ই বলতে শুনি ‘এক টাকার কুদ্দুইচ্ছা’ থেকে কুদ্দুস বয়াতি অইছি। এর সারমর্ম কী?

কুদ্দুস বয়াতি: ছোটবেলায় গেরামের মানুষ ডাকত কুদ্দুস কইয়া। এখন ভাবি, ওই নামডাই আমার শক্তি। লেহাপড়া নাই, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা আছে, মনে জোর আছে। মানুষ যদি না চাইত, কুদ্দুইচ্ছা কুদ্দুস হইত না। এইডাই তো আমার শক্তি।

কুদ্দুস বয়াতির সঙ্গে।

বন্ধুসভা: চলচ্চিত্রে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?

কুদ্দুস বয়াতি: হুমায়ূন আহমেদ স্যারের কাজ শিখাইছে—শিল্প মানে দায়বদ্ধতা। ‘ঘেটুপুত্র কমলা’-তে থাকতে পারছি। এটা বড় পাওয়া। ক্যামেরার সামনে দাঁড়াইলেও আমি গাঁয়ের মানুষই থাকি। একবার হুমায়ূন স্যার হাতে একটা কাগজ দিয়া কইলো এই গানটা গাইতে হবে। আমি তো পড়তে জানি না, কাগজে লেখা গান কেমনে গাইব? আমি বলছি, স্যার, আপনে কাহিনিডা কইন। আমি কিছু করতাম পারি কি না দেখি। স্যার ‘খাদক’ নাকটের কাহিনি কইলো। আমি মারলাম টান—‘খদক লও রে আল্লার নাম, খাদক লও রে আল্লার নাম, আরে হরদমে হরদমে লইয়ো আল্লাহ নবীর নাম’। হুমায়ূন স্যার শুনে খুব খুশি হইলেন।

বন্ধুসভা: লোকজ শিল্পকে অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার কথা বলেন—কেন?

কুদ্দুস বয়াতি: বয়াতি মানে শুধু গান নয়, গল্পও। মাইনষে সাজডা দেইখাই যাতে বুইজ্জলায় কিতা কইতাম চাইতাছি। চরিত্রে ঢুকতে হয়। আমি গাইতে গাইতে অভিনয় করি—মানুষ যেন দেখেও শোনে, শুইনাও দেখে। এই জন্যই হয়তো বেশি সমাদর পাই।

‘জীবনরেখা’ গ্রন্থ হাতে কুদ্দুস বয়াতি।
আরও পড়ুন

বন্ধুসভা: আপনার অনেক গান নাকি সংগ্রহে নেই?

কুদ্দুস বয়াতি: ঠিক কইছেন। লেহাপড়া না থাকায় সব জমাইয়া রাখতাম পারছি না। অনেক গান মানুষের মুখে আছে। চাই—কেউ এগুলা জড়ো কইরা রাখুক, যাতে হারাইয়া না যায়।

বন্ধুসভা: লোকজ গান বাঁচিয়ে রাখতে আপনার উদ্যোগ?

কুদ্দুস বয়াতি: দেশ ঘুরি—এই প্রান্ত থেইকা ওই প্রান্ত। মেলা-উৎসব, স্কুল-কলেজে যাই। তরুণদের কই—‘এইডা আমাদের শিকড়’। বাছাই কইরা গান রাখার চেষ্টা করি। যত দিন গলা আছে, তত দিন গান থাকব।

বন্ধুসভা: ‘পাগলা ঘোড়া’ নিয়ে আপনার আশা?

কুদ্দুস বয়াতি: বিশ্বাস করি, মানুষ ‘পাগলা ঘোড়া’ মনে রাখব। ওইডা আমার মনের দৌড়—দুঃখ থেইকা আশার দিকে।

সাক্ষাৎকারের শেষে কুদ্দুস বয়াতি হেসে বলেন, ‘আমার কোনো পড়াশোনা নাই; আমি মানুষের ভালোবাসায় বড় হইছি।’ তাঁর জীবনসংগ্রাম প্রমাণ করে—লোকজ শিল্প শুধু সুর নয়, একধরনের সাধনা। নেত্রকোনার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ১০–২০ টাকা কিংবা একমুঠ চালের বিনিময়ে গান গাওয়া সেই শিল্পী আজও মাটির কাছেই আছেন। তিনি বেঁচে থাকতে চান লোকজ গায়ক হিসেবেই—মানুষের হৃদয়ে, বাংলার শিকড়ে।

উপদেষ্টা, ময়মনসিংহ বন্ধুসভা