রুৎকার নোটবই: যুদ্ধের অন্ধকারে এক কিশোরীর স্বপ্ন

রুৎকার নোটবই

তাঁর চোখ বাঁধা হলো।
বুটের প্রথম লাথি রক্তাক্ত করলো তার মুখ।
থ্যাঁতলানো ঠোঁটজোড়া লালা-রক্তে একাকার হলো,
জিভ নাড়তেই দুটো ভাঙা দাঁত ঝরে পড়ল কংক্রিটে।
—রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’

আনা ফ্রাঙ্ককে চেনেন না, এমন মানুষ বোধ হয় কমই আছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক কিশোরীর ডায়েরি কীভাবে সে সময়ের প্রমাণ আর সাক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে, আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি তারই এক অসাধারণ উদাহরণ। একটি কিশোরীর ব্যক্তিগত লেখা কীভাবে একটি সময়ের ইতিহাস হয়ে ওঠে, সেটিও আমরা তার ডায়েরি পড়ে বুঝতে পারি।

কিন্তু আনা একা নন, ইতিহাসের অন্ধকার সময়ে আরও অনেক কিশোর-কিশোরী তাদের দিনগুলোর কথা লিখে গেছে। তাদের অনেকের লেখা হারিয়ে গেছে, অনেকের নামও আমরা জানি না। সেই হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠগুলোর মধ্যে রুৎকা লাস্কিয়ার অন্যতম।

রুৎকা লাস্কিয়ারকে বলা হয় ‘পোলিশ আনা ফ্রাঙ্ক’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা, চারপাশের মানুষ, ভয়, ভালোবাসা, আশা, স্বপ্ন এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট ঘটনাগুলো সে লিখে রেখেছিল তার নোটবইয়ে। মাত্র ১৪ বছর বয়সী এই কিশোরীর সেই ভয়াল দিনগুলোর কথা, সেই নোটবইয়ের পাতাগুলোই আজ আমাদের হাতে এসেছে ‘রুৎকার নোটবই’ নামে।

আনা ফ্রাঙ্কের মতো রুৎকার লেখাতেও যুদ্ধ আছে। তবে এতে শুধু যুদ্ধই নয়, আছে একজন কিশোরীর স্বাভাবিক জীবনের আকাঙ্ক্ষা; আছে ভালোবাসা, সম্পর্ক, ভবিষ্যতের স্বপ্ন, ভয়, অভিমান আর চারপাশের পৃথিবীকে বোঝার চেষ্টা।

একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, অন্যদিকে একটি কিশোরীর একেবারে ব্যক্তিগত কিছু অনুভূতি। এত বড় একটি ইতিহাসের ভেতরে এই ছোট ছোট কথা প্রথমে হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু পড়তে পড়তে বোঝা যায়, ইতিহাস আসলে এমন অসংখ্য মানুষের ছোট ছোট জীবনের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়।

আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ কিংবা আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন, একটি দিনলিপির পাতায় শুধু দিনের ঘটনা লেখা থাকে না, সেখানে একটি সময়ের মানুষের ভয়, ভালোবাসা, আশা, অসহায়ত্ব এবং বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাও জমা থাকে। ‘রুৎকার নোটবই’য়েও তেমনই একটি সময়কে দেখা যায়।

কিন্তু তার শেষ মুহূর্তের কথা আমরা জানি না। রুৎকার পরিণতি কী হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তার জীবনের শেষ অধ্যায় আমাদের অজানা। হয়তো বুলেটে, হয়তো বেয়োনেটের আঘাতে, কিংবা আগুনে পুড়িয়ে শেষ হয়েছিল তার জীবন। জানি শুধু, এক কিশোরী ভয়াবহ একসময়ের মধ্যে বসে তার চারপাশের পৃথিবীকে লিখে গিয়েছিল।

এই নির্মমতা নিয়ে তাই খুব বেশি কিছু বলতে ইচ্ছে করে না। কিছু বইয়ের গল্প বলা যায়, কিন্তু কিছু বইয়ের ভয়াবহতা শুধু পড়ে অনুভব করতে হয়। ‘রুৎকার নোটবই’ তেমনই একটি বই।

কোলের শিশুকে মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া, মানুষকে গুম করা, নির্যাতন, হত্যা, মানুষের ওপর মানুষের এমন নির্মমতা—এসব চেনা চেনা লাগছে? এ যুদ্ধের চেনা গল্প। যুগের পর যুগ ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে এসব ঘটে এসেছে। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, অস্ত্র বদলেছে, কিন্তু নির্মমতার গল্প যেন বদলায়নি।

আদতে যুদ্ধ কি কখনো থেমেছে
নাৎসি বাহিনী আজ নেই, কিন্তু মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার তো ইতিহাসের পাতায় থেমে থাকেনি। পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজও যুদ্ধ, হত্যা, নির্যাতন আর ঘরহারা মানুষের গল্প শোনা যায়। তাহলে এই বিশ্বজুড়ে নির্মমতার শেষ কোথায়?

বইটির অনুবাদ নিয়েও কিছু কথা। শুরুর দিকে কোথাও কোথাও অনুবাদে সামান্য জড়তা মনে হয়েছে। কিছু দীর্ঘ বাক্য আরও ছোট করে লেখা হলে পড়তে স্বস্তি পাওয়া যেত। এতে বাক্যের সৌন্দর্যও হয়তো আরও বাড়ত।

বইটিতে কিছু ভয়ংকর ছবিও যুক্ত করা হয়েছে। সেসব ছবি দেখলে আবারও সেই প্রশ্ন ফিরে আসে, মানুষ কীভাবে আরেকজন মানুষের প্রতি এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে?

অন্যদিকে অনুবাদের একটি বিষয় আমার ভালো লেগেছে। বইটির প্রচ্ছদ দেখলে প্রথমে মনে হতে পারে, এটি হয়তো একটি ছোট্ট মেয়ের সাধারণ জীবন, পুতুল খেলা, স্কুল কিংবা কিশোরী বয়সের নানা গল্প নিয়ে লেখা বই। প্রচ্ছদ দেখে ভেতরের ভয়াবহতা অনুমান করার উপায় নেই।

আর এখানেই অনুবাদকের কাজটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এত ভয়াবহ একটি সময়কে শিশু-কিশোরদের উপযোগী করে সহজ ভাষায় তুলে ধরা সহজ নয়। পড়ে যতটুকু মনে হয়েছে, সুদীপ্ত সালাম খুব সচেতনভাবেই সেই কাজ করেছেন। ভয়াবহ ঘটনাগুলোকে অযথা ভারী ভাষায় না লিখে সহজ ও পাঠযোগ্য করে তোলার চেষ্টা রয়েছে।

বইটি শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে। তবে আমার মনে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। এত নির্মমতা শিশুদের সামনে তুলে ধরা কতটা সহজ? আবার পৃথিবীর অন্ধকার দিকগুলো সম্পর্কে ছোট বয়স থেকেই জানা কি জরুরি নয়?

আরও পড়ুন

হয়তো দুটো কথাই সত্য। কারণ, পৃথিবী শুধু ফুল, পাখি, রোদ আর স্বপ্নের নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে অন্ধকারও আছে। সেই অন্ধকারকে না জানলে হয়তো আলোকে চেনাও কঠিন। আর রুৎকার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নগুলো মনে আসে, সেগুলোর কোনো উত্তর নেই।
চোখ বোজার আগে রুৎকা কী ভাবছিল?
তার স্বপ্ন কী ছিল?
সে কি একটি শান্ত পৃথিবী চেয়েছিল?
সে কি মুক্তির অপেক্ষায় ছিল?
কীভাবে শেষ হয়েছিল তার জীবন?

আমরা জানি না। হয়তো কোনো দিন জানবও না। শুধু ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার কথা। আর সেই ভয়াবহতার ভেতরেও বেঁচে থাকবে এক কিশোরীর ছোট ছোট স্বপ্ন, ভালোবাসা, ভয় এবং একটি স্বাভাবিক জীবনের জন্য তার আকুলতা।

আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি থেকে শহীদজননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ যেমন আমাদের একটি সময়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়, ‘রুৎকার নোটবই’ও তেমনই। পার্থক্য শুধু এই যে ইতিহাসে পরিচিত একটি নামের পাশে আরও একটি কিশোরীর কণ্ঠ আমরা শুনতে পাই।

রুৎকা হয়তো জানত না, তার লেখা একদিন যুদ্ধের বহু বছর পরও কেউ পড়বে। জানত না, তার ব্যক্তিগত নোটবই একদিন হয়ে উঠবে ইতিহাসের সাক্ষ্য। তবু সে লিখেছিল। আর সেই লেখাগুলোই আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে, মানুষ কি সত্যিই তার ইতিহাস থেকে কিছু শেখে? মানুষ সত্যিই মানুষ?