‘চিলেকোঠার সেপাই’ কেন পাঠকের ভাবনা ওলটপালট করে

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’

বইয়ের নামের সঙ্গে দৃশ্যের সাদৃশ্য থাকলেও মূল গল্পটা একদমই ভিন্ন। নাম দেখে কখনোই আন্দাজ করা যাবে না উপন্যাসটি কী নিয়ে লেখা। যেকোনো পাঠক বইটি পড়তে পড়তে নামের সঙ্গে গল্পের তাৎপর্য বুঝতে পারবে। পড়ার সময় মনে হয়েছে, লেখক খুব যত্নসহকারে সময় নিয়ে প্রতিটি বাক্য লিখে, যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করে, তবেই প্রকাশ করেছেন।

প্রাথমিক বইপড়ুয়া কিংবা শখের বশে বইপড়ুয়াদের জন্য বইটি সাজেস্ট করা যায় না। কারণ, পড়তে গেলে তাদের মাথা ধরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। এমনকি কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে চিন্তাভাবনা ওলটপালট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তার চেয়ে বরং বলতে পারি, ৫০ বা শখানেক বই পড়েছেন কিংবা মোটামুটি বই পড়তে আগ্রহী ও অভ্যস্ত কোনো নিয়মিত পাঠক, তাঁদের জন্য বইটি ভালো পাঠ্য হতে পারে।

এই বাংলায় অনেক আন্দোলন হয়েছে। মাতৃভাষার জন্য, নিজ জাতির মুক্তির জন্য, নিজ অধিকার আদায়ের জন্য। দেশীয় সর্বজনীন আন্দোলনগুলোর মধ্যে অন্যতম উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থান। সে সময়ের শহর ও গ্রামের সার্বিক চিত্রই প্রকাশ পেয়েছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসে। চিলেকোঠা শব্দটি আছে বলে যে চিলেকোঠার গল্প রয়েছে, এমন নয়। চিলেকোঠার ঘরের দৃশ্য ছাড়াও সমগ্র আন্দোলন, শহর ও গ্রামের রাজনীতির প্রেক্ষাপট, নিম্ন ও শোষিত শ্রেণির মানুষের মনের কথা, নিষিদ্ধ সামাজিক কিছু দৃশ্যের সত্য উপস্থাপন, ক্ষমতার পালাবদলে মানুষের নানা রকম অবস্থার পরিবর্তন ইত্যাদি খুব সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

জাতীয় আন্দোলন হলে মূলত শহরের সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপরই বেশি প্রভাব পড়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখা যায়, সে আন্দোলন শহর থেকে উপশহর ও গ্রামেও চলে যায়। যেতে যেতে আন্দোলনের দিক পরিবর্তন হয়, কৌশল পরিবর্তন হয়, সামাজিক প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে রণকৌশলসহ লক্ষ্যও বদলে যায়। অবশ্যই মৌলিক কিছু বিষয় ও উদ্দেশ্য থাকে, যা একই থাকে আর তা নিয়েই আন্দোলন চলমান রাখে আন্দোলনকারীরা। উপন্যাসে শহর ও গ্রামে আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে যে কত রকম রাজনৈতিক নানা প্রেক্ষাপট তৈরি হয়, তা তুলে ধরা হয়েছে। সব শ্রেণির প্রভাব এই উপন্যাসে তেমন তুলে ধরা না হলেও, উচ্চবিত্ত ব্যক্তিরা ও তাদের সমমনা সম্প্রদায় কীভাবে সমাজের মধ্যবিত্ত ও নিম্নশ্রেণির মানুষের ওপর প্রভুত্ব বিরাজমান রাখে, তা খুব যত্নসহকারে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ওসমান অন্যতম প্রধান চরিত্র, নায়কও বলা চলে। তবে নায়ক মানেই রোমান্টিক গল্পের মতো নায়িকা থাকবে, এই উপন্যাসে সেটা নেই। গল্পের প্রয়োজনে নায়িকা হাজির হলেও, দৃশ্যমান আবার বদলে গেছে লেখকের ভিন্ন চিন্তায়। এখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার নায়ককে তুলে ধরা হয়েছে গুরুত্ব দিয়ে। খিজিরের মতো নিম্নশ্রেণির দিনমজুর মানুষের, সাহসী ও প্রতিবাদী চরিত্রকেও লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন সুনিপুণভাবে। তবে রোমান্টিকতা যে একদমই নেই, তা বলা যাবে না। যা আছে তা চরিত্রে একক কল্পনা কিংবা সমাজের নিষিদ্ধ কিছু বাস্তব দৃশ্য ও উপলব্ধি, যা অহরহ ঘটে; কিন্তু চার দেয়ালে আটকা থাকে। বাধ্যতামূলক খারাপ কিছু নয়, তবে প্রকাশের অযোগ্য, এটাই সামাজিক রীতি।

ওসমানের বন্ধু আনোয়ারের নিজ গ্রাম ভ্রমণে উঠে এসেছে গ্রামীণ রাজনীতির লুকায়িত কালো কৌশল, যা শহরের রাজনীতি থেকে একদমই ভিন্ন। হঠাৎ করে পড়লে কেউ বিশ্বাসই করতে পারবে না, গ্রামের শাসনব্যবস্থা বছরের পর বছর ধরে কীভাবে চলমান থাকে। খয়বার গাজীর মতো ব্যক্তিরা কীভাবে গ্রামের মুরব্বি ও মাথা হয়ে থাকার জন্য কৌশলে গ্রামের কৃষকদের গরু চুরি করে চরে চালান করে, অর্থ দিয়ে ফেরত আনার ব্যবস্থা রাখা, বিপদে সাহায্য করার নাটক করা, সুদিনের স্বপ্ন দেখানো ইত্যাদি নিজ ক্ষমতাবলে চালিয়ে যেতে পারে।

উপন্যাসের দৃশ্যগুলোতে প্রকাশ পেয়েছে দেশের মুক্তির সংগ্রাম আন্দোলনে কীভাবে নিম্নশ্রেণির লোকেরা সাহসী হয়ে ওঠে, রাস্তায় নেমে যায় জীবন বাজি রেখে, রক্তচোষা শাসকগোষ্ঠীর চোখরাঙানি উপেক্ষা করে মিছিল করে, প্রাণপণ লড়াই করে সমগ্র সমাজের মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে। আবার এটাও প্রকাশ পেয়েছে, যা কিছুই হয়ে যাক, একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ আগে–পরে ঠিকই নিজস্ব সম্পর্ক ঠিক রাখে, শুধু প্রয়োজনে সবার সামনে চরিত্র পাল্টায় সুবিধা নেওয়ার তাগিদে। এ রকম ভয়াবহ ভণ্ডামি প্রকাশিত হয়েছে গল্পের নানা অংশে।

এ গল্পে লেখক অনেক কিছু এড়িয়ে গেছেন, যা সচরাচর অন্য সব আন্দোলনের ওপর রচিত লেখায় প্রকাশিত হয়। বড় বড় নেতা ও তাঁদের কার্যক্রম, ভাষণ, বড় বড় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল, বিশ্বের অন্য দেশগুলোর কতটা নিয়ন্ত্রণ, সাপোর্ট, বিপক্ষে অবস্থান রয়েছে ইত্যাদি বিষয়। ঘটনার বিবরণের প্রয়োজনে অনেক কিছুই উঠে এসেছে লেখায়, যা অবশ্যই উল্লেখ করার মতো। তবে সেটা একদমই বাধ্যতামূলক নীতি হয়ে। যে দুজন ব্যক্তির নাম বেশি এসেছে তাঁরা হলেন শেখ মুজিবুর রহমান; ওনাকে জেল থেকে মুক্তির দাবি বারবার উচ্চারিত হয়েছিল। আর শাসক আইয়ুব খান, যাঁর শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন–সংগ্রাম চলমান ছিল।

উপন্যাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ প্রকাশিত হয়, যখন প্রধান চরিত্র ওসমান উন্মাদ হয়ে যায়। সে সব বন্ধন, বাধা, অন্যায়, লড়াই, পরাধীনতা ভেদ করে মুক্ত হতে চায়। আন্দোলনের মিছিলে গিয়ে মিলিটারিদের দেওয়া কারফিউ আর ধ্বংসের লীলায় নিহত হওয়া হাড্ডি খিজির যখন ওসমানকে তাড়া করে, সে তাড়ায় তাড়িত হয়ে সে স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে চলে যায়। একসময় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে বন্ধু আনোয়ারের যত্ন আর রক্ষা শিকল ভেদ করে।

আরও পড়ুন

খুব সাধারণভাবে দেখলে দেখা যায়, উপন্যাসটি একটি আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়তো। কিন্তু পড়ার মধ্যে একটু থামলে বোঝা যায় সমাজের নানা চিত্র এখানে লেখক খুব দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে নিম্নশ্রেণির মানুষেরা আন্দোলন চলাকালীন যে জীবন অতিবাহিত করে, সে দৃশ্যের প্রমাণসহ উপস্থাপন। আরও লক্ষ করলে দেখা যাবে, গ্রাম আর শহরের সব সময়ের পার্থক্যরত রাজনৈতিক পরিবেশ, যা যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে এবং এখনো চলছে; কিন্তু প্রকাশিত হচ্ছে না কিংবা নানা বাধায় প্রকাশ পাচ্ছে না।

এক উপন্যাসে কোনো নির্দিষ্ট আন্দোলনের সমগ্র চিত্র, সামাজিক প্রেক্ষাপট, রাষ্ট্রীয় পরিবেশ কেমন হয় তা তুলে ধরা সম্ভব নয়। লেখক সে চেষ্টাও করেননি। তবে তিনি যা করেছেন তা হলো, নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের মতো গভীর থেকে গভীরে গিয়ে তথ্যগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। পরিবেশ, সময়, প্রেক্ষাপটের সঙ্গে চরিত্রগুলোকে ঘটনা ও দৃশ্যের প্রয়োজনে যেভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন, তা তিনি করতে পেরেছেন।

একনজরে
প্রকাশনী: দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড
প্রকাশক: মাহরুখ মহিউদ্দিন
প্রচ্ছদ: সমর মজুমদার
প্রথম প্রকাশ: ১৯৮৬
মূল্য: ৩৯০ টাকা মাত্র

হাজীপুর, নরসিংদী