যা ধরে রাখা হয়নি

ছবি: এআই/বন্ধুসভা

একপশলা বৃষ্টি শেষে আকাশে এখন রোদ।
পূর্বাভাসবিহীন বৃষ্টিতে আধা ঘণ্টার মতো থেমে ছিল আখড়া বাজারের মোটরসাইকেলের সারাইখানাগুলো। সূর্যের সাহসী ফেরা দেখে আগের মতন প্রাণ ফিরে এল শহরের এই ব্যস্ত মহল্লায়। রেঞ্চ-প্লায়ার্স আর স্ক্রুড্রাইভারের নিবিড় সঙ্গে ওখানকার কর্মীদের হাতগুলো কালো ও শক্ত হয়ে গেছে। তাদের চিন্তন কিংবা হৃদয়ের কথা অবশ্য জানা যায় না। হয়তো দিনের সব কালিঝুলি, পোড়া মবিলের মলিনতাকে অগ্রাহ্য করে তাদের হৃদয় এখনো তরতাজাই আছে!

সারাইখানার একটিতে বসেছিলাম বাইকের সমস্যা সারানোর জন্য। দোকানি আমাকে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিলেন। অনেকগুলো মোটরসাইকেল অপেক্ষমাণ। আমার সিরিয়াল আসতে একটু দেরিই হবে। বাইকের ছোট্ট একটি নাট খানিকটা আলগা হয়ে গেছে। উপযুক্ত যন্ত্র ও যন্ত্রজ্ঞান থাকলে সামান্য ত্রুটির জন্য সারাইখানায় আসতে হতো না। নিজেই সারিয়ে নিতে পারতাম। অপেক্ষমাণ রোগী বাইকগুলো পরখ করে দেখলাম, এদের কোনোটার লাগবে জটিল অস্ত্রোপচার, কোনোটার হালকা ব্যান্ডেজ। আমারটা শেষের দলের মধ্যে পড়ে।

চায়ের কাপ নিয়ে অলস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি রাস্তার দিকে। অসংখ্য রিকশা, অটোরিকশা আর গাড়ির ভিড়ে কে কোথায় ছুটছে, ঠাহর করা যাচ্ছে না।

চায়ের কাপ নিয়ে অলস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি রাস্তার দিকে। অসংখ্য রিকশা, অটোরিকশা আর গাড়ির ভিড়ে কে কোথায় ছুটছে, ঠাহর করা যাচ্ছে না। তবু একটি রিকশার যাত্রীকে দেখে চোখ আটকে যায়। বুকে একটা কম্পন অনুভূত হয়। কে ছিল? দীপিকা নয় তো? তার তো এখানে থাকার কথা নয়। সে তো বহু দূরের কোনো নিভৃত শহরের বাসিন্দা এখন।

দীপিকার সঙ্গে যখন শেষবার দেখা হয়, তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল দ্রুত। ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যার সঙ্গে হিম হিম কুয়াশা দ্রুতই ঢেকে দিচ্ছিল চারদিক। এমন আবছা অন্ধকারে প্লাবিত সন্ধ্যায় তার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না তেমন। নিয়মিত বিরতি দিয়ে কথা বলার যে নিয়ত ছন্দ, তা বেশ স্পষ্ট করেই শুনতে পাচ্ছিলাম। বাচিক চর্চার মানুষ দীপিকা। ব্যক্তি-আলাপেও আঞ্চলিকতা পরিহারের সচেতন প্রয়াস দেখা যায় সব সময়। সেদিনও তার ব্যতিক্রম ছিল না।

সরকারি একটা অফিসে কম্পিউটার সামনে নিয়ে বসত সে। পরের সপ্তাহ থেকে এই শহরে সে আর বসবে না। অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে তার পোস্টিং হয়েছিল। আমার সঙ্গে তার কাটানো সময়গুলোর অম্ল-মধুর সারসংক্ষেপের বয়ান শেষ করে একটা শপিং ব্যাগ ধরিয়ে দিল। বাসায় এসে পরে দেখেছিলাম, চমৎকার একটা টি-শার্টের সঙ্গে চিরকুটও ছিল। চিরকুটের ভাষা অত্যন্ত মাপা, প্রাঞ্জল আর বেদনাবাহী। যেমন মাপা, চাপা, স্নিগ্ধ ও শান্ত স্বভাবের সে।

‘প্রিয় দেবদূত,
তোমার শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি। ভালোবাসাবাসির ইতিহাস নেই বলে বিরহের কোনো আনুষ্ঠানিকতা থাকবে না, জানি। তবু যদি মনে পড়ে, কখনো আমাকে ভেবে তোমার মন খারাপ হয়, তবে এই বেঞ্চিটাতে এসে বসো। যেখানে আমাদের অনেক মান-অভিমান, ঝগড়া-আপসের ধারাবাহিক ঘটন-অঘটনগুলো জড়িয়ে আছে।

‘তোমার মতো কাউকে অথবা তোমাকেই চেয়েছিলাম। তুমি খুব শক্ত হৃদয়ের মানুষ। অথবা এর উল্টোটাও হতে পারে। আমি ঠিক জানি না। তবে তোমার ভেতরকার দর্শন, জীবনবোধ আমাকে প্রাণিত করে। তুমি কী করে আবেগ আর বাস্তবতার মিশেলে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারো, এটা আমার শেখা উচিত ছিল তোমার থেকে। একদিন হয়তো শিখে নেব। তোমার কিছু বিষয় আমাকে অদৃশ্য জাদুর মতো টানে। কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ বাধা আমাদের এক হতে দেয়নি। অথবা প্রকৃতিকে অন্য আট-দশটা মানুষের মতো বশে আনতে চাওনি তুমি। আমার কী দোষ, বলো?

‘তবু তিন-সাড়ে তিন মাসের যে অম্ল-মধুর, ঘটনাবহুল স্মৃতি তোমার থেকে নিয়ে যাচ্ছি, তা জীবনভর মনে রাখব। তুমি চাইলেই ধরতে পারতে; আমার হাত, ফসকে যাওয়া সময়-সুতো। আরও শক্ত করে, আরও নিবিড় করে। কিন্তু ধরোনি। জানি না, ভবিষ্যতে আর কাউকে এমন করে চাইতে পারব কি না। আর তুমিও কাউকে এমনভাবে মুগ্ধ অথবা আহত করতে পারবে কি না।

‘তবে আমাকে তোমার নিদারুণভাবে ফিরিয়ে দেওয়াটা আমৃত্যু মনে রাখব। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা, তিনি তোমার মঙ্গল করুন। নিজেকে ভালো রেখো।
তোমার নিবেদিতা, দীপ।’

আরও পড়ুন

দীপিকাদের সব সময় জানতে দিতে নেই যে অনেক ব্যথা সঙ্গোপনে লুকিয়ে রেখে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে পারা শক্ত বস্তুটিই পাহাড়। আর অনেক ব্যথা সহ্য করার দরুনই পাহাড় থেকে নিয়ত বইতে থাকে অবিরাম জলধারা; যাকে আমরা ঝরনা অথবা নদী বলে চিনি। কেবল কিছু মানুষই বুঝতে পারে, এই সব ঝরনাধারা কিংবা নদী মূলত পাহাড়ের কান্না।

দীপিকাকে ধরে রাখার জন্য যে প্রকৃত দীপাধার দরকার ছিল, তা যে আমার নেই, এটা আমি ছাড়া আর কে জানে! এই যে আমরা চাঁদ নিয়ে এত আদিখ্যেতা করি, সমুদ্রকে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে উপভোগ করি; তাদের কি হাতের তালুতে পুরে রাখা যায়?

চিরকুটের যে প্রাঞ্জল, মোলায়েম ভাষা, সেটা দীপিকার আবেগপ্রসূত প্রকাশ। সেই আবেগও একদিন আলগা হয়ে যাবে। তা সে যতই শক্ত করে বাঁধতে চাক। সময় এমনই কবিরাজ, এমনই বিধ্বংসী; শত প্রচেষ্টার পরও একদিন সব বাঁধন আলগা হয়ে পড়ে। হোক তা হৃদয়ের বাঁধন, হোক তো মোটরসাইকেলের কোনো নাট-বল্টুর বাঁধন।

নগুয়া, কিশোরগঞ্জ