বসন্তের চনমনে বিকেল। নরম–কোমল হাওয়া উষ্ণতার পরশ বুলিয়ে দেয় গায়ে। শীতের রিক্ততা শেষ হয়ে এখনো গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম পড়েনি। তা না হলে রোজা রেখে কোথাও বেড়াতে যাওয়া কষ্টসাধ্য ছিল। গ্রামীণ মেঠো পথ ধরে আমি আর আব্বা হেঁটে যাচ্ছি। গন্তব্য বড়াপুদের বাড়ি—রসুনপুর। কড়া রোদে হলুদ হয়ে আছে চারপাশ। আব্বার পেছন পেছন হাঁটছি। রাস্তার চিত্র খুবই নাজুক। গাড়ি চলাচলের অযোগ্য। বিকল্প পথ ছিল, কিন্তু সেখান দিয়ে অনেক সময় ফুরাবে।
বড়াপুদের বাড়িতে পৌঁছাতে হবে ইফতারের আগে। আব্বা বড় কদমে পা ফেলছেন। আমার অবস্থা কাহিল, প্রচণ্ড তেষ্টা পেয়েছে আজ। বিকেলের হলদে আলো এসে আছড়ে পড়ছে আমার নাকে-মুখে, সর্বাঙ্গে। বেশ ক্লান্ত দেহ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।
আমার হাতে একটা লাল শপিং বেগের পোঁটলা। ভেতরে আছে আম্মার কিনে দেওয়া কিছু কাপড়চোপড়, কতক প্রসাধনী। আরও একটা দামি জিনিস আছে, বকুল ফুলের তোড়া। নিজ হাতে পরম যত্নে বানিয়েছি। আমাদের ঘরের সামনে যে একচিলতে উঠান, সেখানে বকুল ফুল ও হাসনাহেনার একটা করে গাছ আছে। বড়াপু বিয়ের আগে নিজ হাতে লাগিয়েছিল। পরম মমতায় আদরযত্ন করে বড় করে তুলেছে সে।
আপুর বিয়ে হয়েছে এক বছর। ওনার সঙ্গে অনেক হাসি-আনন্দের স্মৃতি আছে। সেগুলো মনে পড়লে মন খারাপ হয়। স্মৃতিরা খামচে ধরে আমায়। মরে যেতে ইচ্ছে করে। অবশ্য মেয়েদের ক্ষেত্রে এমনই অলিখিত বিধান। জীবনের নির্দিষ্ট একটা সময় অতিবাহিত হলে পুরাণের মিথ অনুযায়ী তারা আকাশের তারা হয়ে যায়। এখন আর আমাদের বাড়িটা আমেজপূর্ণ থাকে না। আমি আর আপু পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখতাম। কত খোশগল্পই না হতো! এখন সেসব কেবলই ধূসর স্মৃতি। মনে পড়লে কষ্ট লাগে অনেক, দলা পাকিয়ে কান্না আসে। এক অনিঃশেষ শূন্যতা চারপাশে ঘিরে ধরে।
সূর্য অনেকটা হেলে পড়েছে পশ্চিমাকাশে। হলদে আলো এখন লাল আভায় রূপ নিয়েছে। পশ্চিমের প্রান্তরজুড়ে লালে লাল সব। আর কিছু দূর হাঁটলেই আপুদের বাড়ি। আব্বা হাঁটছেন আনমনে। তার এক হাতে মিষ্টির ব্যাগ। অন্য হাতে দইয়ের হাঁড়ি, সঙ্গে নানা পদের পিঠাও আছে; আম্মার হাতে বানানো। আপু দই পছন্দ করে অনেক। আমাদের প্রস্তুত করে এখানে পাঠানোর আগে অনেকটা ব্যস্ত সময় পার করতে হয়েছে আম্মার। রীতিমতো হন্তদন্ত শুরু করে দিয়েছিলেন তিনি। কী রেখে কী করবেন, এমন অবস্থা। একমাত্র মেয়ে বলে কথা।
আমার মন কিছুটা অস্থির। কোনো বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী হওয়ার আগে হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করার অভ্যাস আছে। আপুকে অনেক দিন দেখি না। বুকের ভেতর প্রচ্ছন্ন খুশি অনুভূত হচ্ছে। কী এক অদৃশ্য আনন্দ-বিহ্বলতায় দুলে দুলে উঠছে আমার সর্বাঙ্গে। আমি এগিয়ে যাচ্ছি আব্বার পেছন পেছন। দেখতে দেখতে একদম আপুদের বাড়ির আঙিনায়। হঠাৎই আমার চোখ হেসে ওঠে। মুখ হেসে ওঠে। ওই তো আপু, ঘরের সামনে আপু, আপুকে দেখা যাচ্ছে। সহাস্য বদনে এগিয়ে আসছে আপু। আপু, আমার বড় বোন। যে আমার সুখ-দুঃখের এককালের অনুপম সঙ্গী।
শিক্ষার্থী, মুকুল নিকতন উচ্চবিদ্যালয়, ময়মনসিংহ