শম্ভুগঞ্জ ঘাটের সেই ছোট্ট চেম্বারটি এখন আর নেই। পুরোনো টিনের চাল, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, কাঠের বেঞ্চ আর কাচের আলমারিতে সাজানো কয়েকটি ওষুধের শিশি—সবই সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে।
মানুষ চলে যায়, ঘরবাড়ি ভেঙে যায়। এর মধ্যেও কিছু স্মৃতি থেকে যায়। চোখ বন্ধ করলে সেসব স্মৃতি মনের মুকুরে জ্বলজ্বল করে ভেসে ওঠে।
একদিনের কথা। বাইরে আষাঢ়ের মেঘ। নদীর দিক থেকে আসা ভেজা বাতাস। রোগী বলতে হাতে গোনা দু-একজন। চিকিৎসক হিসেবে তখন আমার পথচলার একেবারে শুরু। অভিজ্ঞতার চেয়ে স্বপ্নই বেশি। এমন সময় দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন একজন ভদ্রলোক। সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি, মুখভরা শান্ত হাসি। পাশে একজন ভদ্রমহিলা।
ভেতরে ঢুকে খুব বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ডাক্তার আপা, আমার স্ত্রীর একটু সমস্যা। একটু কি দেখবেন?
রোগীকে বসতে বললাম। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ওষুধ লিখে দিলাম। ভদ্রলোক মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি নির্দেশ শুনলেন। চলে যাওয়ার আগে প্রেসক্রিপশনটি ভাঁজ করে পকেটে রাখলেন। তারপর হঠাৎ একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘একটা কথা বলি?’
‘বলুন।’
তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘আপনাকে দিদি বলে ডাকলে কিছু মনে করবেন কি?’
প্রশ্নটা এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
তারপর হেসে বললাম, ‘মনে করার কী আছে? ডাকতেই পারেন।’
তিনি যেন শিশুর মতো খুশি হয়ে উঠলেন।
‘আচ্ছা দিদি, তাহলে আমরা চলি।’
সেদিন বিষয়টিকে খুব সাধারণভাবেই নিয়েছিলাম।
একজন রোগী তার চিকিৎসককে আপন করে সম্বোধন করতেই পারেন। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তখন কি জানতাম, ওই একটি সম্বোধনই একদিন আমাদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভিত হয়ে উঠবে।
এরপর তিনি প্রায়ই আসতেন।
কখনো স্ত্রীকে নিয়ে, কখনো নিজের সমস্যা নিয়ে, কখনো রিপোর্ট দেখাতে। তাঁর ভেতরকার একটি বিষয় আমাকে বারবার মুগ্ধ করত—অসাধারণ ভদ্রতা।
কোনো দিন তাঁকে বিরক্ত হতে দেখিনি। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হলেও মুখে হাসি লেগেই থাকত। দরজায় ঢুকেই বলতেন, ‘নমস্কার দিদি।’
জবাবে আমিও বলতাম, ‘নমস্কার। আসুন ভাই, বসুন।’
‘ভাই’ শব্দটি আমার মুখ থেকে কবে প্রথম বের হয়েছিল, আজ আর মনে নেই।
কিন্তু একদিন খেয়াল করলাম, আমি আর তাঁকে রোগীর মতো দেখি না। আপনজনের মতো দেখি।
এর কিছুদিন পর তাঁর স্ত্রী প্রথমবার সন্তানসম্ভবা হলেন।
প্রসবের সময় নানা জটিলতা তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার উৎকণ্ঠার পর অবশেষে একটি ফুটফুটে কন্যাশিশুর কান্না ভেসে উঠল।
শিশুটিকে তার বাবার কোলে তুলে দিতেই আনন্দে চোখ ভিজে উঠল।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন, ‘দিদি, সৃষ্টিকর্তা আপনাকে ভালো রাখুন।’
আমি শুধু মৃদু হেসেছিলাম।
তারপর যেন এটাই নিয়ম হয়ে গেল।
দ্বিতীয় সন্তান...
তারপর তৃতীয়...
চতুর্থ...
পঞ্চম...
তিনটি মেয়ে আর দুটি ছেলে—পাঁচটি শিশুই আমার হাত ধরে এই পৃথিবীতে এল।
শিশুরা বড় হতে লাগল। আমিও যেন ওদের বড় হতে দেখে নিজের সময়ের হিসাব রাখতাম।
তিনি প্রায়ই আমার জন্য নানা রকম উপহার নিয়ে আসতেন। ঈদের আগে কিছু একটা নিয়ে এসে বলতেন, ‘দিদি, বাচ্চাদের জন্য দোয়া করবেন।’
পরীক্ষার ফল ভালো হলে খবর দিতেন।
কেউ অসুস্থ হলে ফোন করতেন।
কেউ ভালো কিছু করলে মিষ্টি নিয়ে হাজির হতেন।
কবে যে চিকিৎসকের চেম্বারের দরজা পেরিয়ে তাঁদের সংসারে আমার জন্য একটি অদৃশ্য আসন তৈরি হয়ে গেছে, নিজেও বুঝিনি।
একদিন দুপুরে চেম্বার থেকে ফিরে দেখি, বারান্দায় একটি ঝুড়ি রাখা।
খুলে দেখি, গাছপাকা লিচু।
সঙ্গে ছোট্ট একটি কাগজ।
‘দিদির জন্য।’
এর পর থেকে প্রায় সব মৌসুমেই এমন হতো।
কখনো আম।
কখনো কাঁঠাল।
কখনো নতুন ধানের চাল।
কখনো খেজুরের গুড়।
আমি অনেকবার বারণ করেছি।
ভাই শুধু হেসে বলতেন, ‘দিদি, এটা ফল না। এটা আমাদের ভালোবাসা। ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে নেই।’
কথাটা শুনে আর কোনো দিন আপত্তি করিনি।
কারণ বুঝে গিয়েছিলাম, কিছু উপহার গ্রহণ করা মানে কোনো জিনিস গ্রহণ করা নয়, একটি হৃদয়কে সম্মান করা।
সেই মানুষটির নাম শরীফুল ইসলাম।
আজ এত বছর পরও আমি তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিই একটিমাত্র শব্দে ‘আমার ভাই’। রক্তের বাঁধনে সে বাঁধা ছিল না। তবু জীবনের সবচেয়ে সত্য সম্পর্কগুলোর একটি ছিল এই সম্পর্ক।
২.
সময় মানুষের চেহারা বদলে দেয়, বাড়ির রং বদলে দেয়, জীবনের ঠিকানাও বদলে দেয়। কিন্তু কিছু মানুষের স্বভাব বদলায় না।
শরীফুল ভাই ছিলেন তেমনই একজন।
একদিন খবর পেলাম, শম্ভুগঞ্জে তিনি নিজের বাড়ি করেছেন। তারপর শুনলাম, বাজারে পাঁচতলা একটি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করছেন। পরে জানলাম, নিজের উদ্যোগে একটি মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করেছেন। ব্যবসাও অনেক বড় হয়েছে।
অনেকেই সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। কথাবার্তায় দূরত্ব আসে, চোখে অহংকারের ছায়া নামে। কিন্তু শরীফুল ভাইকে যতবার দেখেছি, ততবারই মনে হয়েছে—সৃষ্টিকর্তা তাঁর রিজিক যেমন বাড়িয়েছেন, তেমনি বিনয়টাকেও বাড়িয়ে দিয়েছেন।
এত পরিবর্তনের পরও তিনি চেম্বারে ঢুকে আগের মতোই বলতেন, ‘দিদি, কেমন আছেন?’
আমি মজা করে বলতাম, ‘আপনাকে তো এখন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে দেখা উচিত। এত বড় ব্যবসায়ী হয়ে গেছেন!’
তিনি হেসে মাথা নাড়তেন, ‘দিদি, মানুষের পরিচয় টাকায় হয় না। মানুষ মানুষই থাকে।’
কথাটা তিনি খুব সহজভাবে বলতেন। কিন্তু আমি জানতাম, সহজ কথার মধ্যেই মানুষের আসল পরিচয় লুকিয়ে থাকে।
তাঁদের বাড়িতে কোনো আনন্দের অনুষ্ঠান হলে খবর আসত। কোনো দুঃখের দিন এলে খবর আসত তারও আগে।
আমি অতিথি হয়ে যেতাম না, বাড়ির একজন হয়ে যেতাম।
এত আনন্দের মধ্যেও একটি দুঃসংবাদ যেন সংসারের আকাশে একটি কালো মেঘ হয়ে ভেসে বেড়াত। তাঁর বড় মেয়েটি মৃগীরোগে আক্রান্ত। কত চিকিৎসা, কত ওষুধ, কত সতর্কতা—সবই যেন জলে গেছে। তারপরও মেয়েটি লেখাপড়া করেছে, বড় হয়েছে, হাসতে শিখেছে। সৃষ্টিকর্তা তাকে একটি ভালো জীবনসঙ্গীও দিয়েছেন।
বিয়ের দিন শরীফুল ভাইয়ের মুখে যে স্বস্তির হাসি দেখেছিলাম, মনে হয়েছিল বহুদিনের দুশ্চিন্তা বুঝি শেষ হলো।
কিন্তু জীবন তখনো তার শেষ পরীক্ষাটি নেয়নি।
কয়েক মাস পর খবর এল, মেয়েটি সন্তানসম্ভবা।
খবরটি শুনে আমি যেমন আনন্দিত হয়েছিলাম, তেমনি সতর্কও ছিলাম।
তিন মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই সব শেষ।
প্রথম গর্ভপাত।
আমি সান্ত্বনা দিয়েছিলাম—এমন হয়। মন শক্ত রাখো। আবার হবে।
হয়েছিলও।
দ্বিতীয়বারও একই পরিণতি।
তারপর তৃতীয়বার।
প্রতিবারই নতুন করে আশা জাগত।
প্রতিবারই সেই আশার প্রদীপটি নিভে যেত।
চতুর্থবার যখন গর্ভপাত হলো, আমি মেয়েটির চোখের দিকে তাকাতে পারিনি।
সে কোনো অভিযোগ করেনি। শুধু শান্ত স্বরে বলেছিল, ‘আমার কি কখনো সন্তান হবে না?’
একজন চিকিৎসকের কাছে এর চেয়ে কঠিন প্রশ্ন খুব কমই আসে। কারণ, সব প্রশ্নের উত্তর ওষুধের বইয়ে লেখা থাকে না। আমি তার হাতটা ধরে শুধু বলেছিলাম, ‘আশা ছেড়ো না।’
কিন্তু কথাটা বলতে গিয়েও নিজের কণ্ঠে আমি পূর্ণ নিশ্চয়তা খুঁজে পাইনি।
এরপর পঞ্চমবার...
সেই দিনটার কথা ভীষণ মনে পড়ে।
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল।
চেম্বারের কাজ শেষ করে বসে আছি। এমন সময় ফোন বেজে উঠল।
ওপাশে শরীফুল ভাই।
স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক নিচু গলায় বললেন, ‘দিদি...আবারও রইল না।’
আর কোনো কথা তিনি বলতে পারেননি।
ফোনের ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
আমি বুঝতে পারছিলাম, একজন বাবা কাঁদছেন। কিন্তু সেই কান্নার শব্দও যেন তিনি কাউকে শুনতে দিতে চাচ্ছেন না।
সেদিন রাতে আমার আর ঘুম হয়নি।
চিকিৎসকের জীবনে অসংখ্য রোগী আসে, অসংখ্য অস্ত্রোপচার হয়, অসংখ্য সাফল্য আর ব্যর্থতা থাকে।
কিন্তু কিছু মানুষ পেশার সীমা ছাড়িয়ে হৃদয়ের ভেতরে জায়গা করে নেয়।
শরীফুল ভাইয়ের পরিবার ছিল তেমনই।
মনে হচ্ছিল, এ শুধু তাঁর মেয়ের লড়াই নয়। এ লড়াই আমাদের সবার।
আমি জানতাম না, সামনে আরও বড় একটি পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। তবে এটুকু বিশ্বাস ছিল—মানুষ যখন আশা ধরে রাখে, তখন সৃষ্টিকর্তা এমনভাবে দরজা খুলে দেন, যা মানুষের কল্পনারও বাইরে।
৩.
কখনো কখনো কিছু মানুষের কষ্ট আমাদের নিজেদের কষ্ট হয়ে যায়। কেন হয়, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।
হয়তো দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, হয়তো অগাধ বিশ্বাস, হয়তো নিঃশব্দে একে অপরের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। যাই হোক, শরীফুল ভাইয়ের পরিবারের কথা ভাবলেই আমার মনে হতো, এই যুদ্ধে আমিও একজন সৈনিক।
গত বছর একটি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা-সংক্রান্ত কর্মশালা শেষে ওমান থেকে দেশে ফিরছিলাম।
বিমানের জানালার পাশে বসেছি। নিচে তুলার মতো সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে। চারিদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা। যাত্রীরা কেউ ঘুমিয়ে, কেউ বই পড়ছে।
আর আমি?
আমি বারবার একটি মুখই দেখছিলাম।
শরীফুল ভাইয়ের বড় মেয়ের মুখ।
পাঁচবার ভেঙে যাওয়া মাতৃত্বের স্বপ্ন।
পাঁচবার নতুন করে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।
আমি জানি, চিকিৎসাবিজ্ঞানে অনুভূতির আলাদা কোনো অধ্যায় নেই। সেখানে আছে পরিসংখ্যান, সম্ভাবনা, ঝুঁকি আর চিকিৎসাপদ্ধতি।
তবু মানুষ কেবল বিজ্ঞান দিয়ে বাঁচে না।
আমি চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে প্রার্থনা করেছিলাম—
‘হে ভগবান, যদি কল্যাণ থাকে, তবে এবার ওর কোলটা ভরে দিয়ো।’
দেশে ফিরে কাজের ব্যস্ততায় ডুবে গেলাম।
ঠিক কয়েক সপ্তাহ পর এক সকালে শরীফুল ভাইয়ের ফোন।
কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা।
‘দিদি...একটা খবর আছে।’
আমি হেসে বললাম, ‘বলুন, কী খবর?’
ওপাশ থেকে উত্তর এল, ‘ও...আবার মা হতে চলেছে।’
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরে যেন একসঙ্গে আনন্দ আর শঙ্কা জেগে উঠল। আনন্দের কারণ হলো নতুন জীবন আবার দরজায় কড়া নেড়েছে। আর আশঙ্কার কারণ হলো আগের পাঁচটি স্মৃতি তখনো আমার মনে।
সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আলট্রাসনোগ্রামের মনিটরের দিকে তাকিয়ে আমি কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ ছিলাম।
দুটি হৃৎস্পন্দন।
দুটি ছোট্ট প্রাণ।
যমজ সন্তান।
আমি মনিটর থেকে চোখ সরিয়ে মেয়েটির দিকে তাকালাম।
তার চোখে আনন্দের চেয়ে ভয়ই বেশি।
আমি মৃদু হেসে বললাম, ‘ভয় পেয়ো না। এবার আমরা সবাই মিলে খুব সতর্ক থাকব।’
সেদিনই সিদ্ধান্ত নিলাম, এই গর্ভধারণকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। সময়মতো ম্যাকডোনাল্ড সারক্লাজ করলাম। প্রতিটি ওষুধ, প্রতিটি পরীক্ষা, প্রতিটি বিশ্রামের নিয়ম নতুন করে বুঝিয়ে দিলাম। নিয়মিত পর্যবেক্ষণের সুবিধার জন্য আমার বাসার কাছাকাছি থাকার ব্যবস্থা করলাম। আমি সব সময়ই খোঁজ নিতাম—কখনো ফোনে, কখনো সরাসরি।
প্রতিবার আলট্রাসনোগ্রামের সময় দুটি ছোট্ট হৃৎস্পন্দন শুনলে মনে হতো, আশা এখনো বেঁচে আছে।
শরীফুল ভাই আগের চেয়ে অনেক বেশি চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন।
একদিন রিপোর্ট দেখে বেরিয়ে তিনি খুব ধীরে বললেন, ‘দিদি, আমি আল্লাহর কাছে শুধু একটা দোয়াই করি—যা-ই দেন, সুস্থভাবে যেন দেন।’
আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তবে সবই ওপরওয়ালার ইচ্ছা।’
তিনি মাথা নাড়লেন।
তারপর দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব রইলাম।
কারণ, কিছু কথার পর নীরবতাই সবচেয়ে সত্য ভাষা।
দিনগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল।
একেকটি সপ্তাহ পার হওয়া মানেই একেকটি বিজয়।
চব্বিশ সপ্তাহ...
ছাব্বিশ...
সাতাশ...
আমরা যেন স্বস্তির দিকে একটু একটু করে এগোচ্ছিলাম।
ঠিক তখনই, এক গভীর রাতে ফোন বেজে উঠল।
ঘুম ভাঙতেই বুঝলাম, কোনো অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে।
ওপাশ থেকে আতঙ্কিত কণ্ঠ, ‘দিদি...পানি ভেঙে গেছে।’
মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত ঘুম উধাও হয়ে গেল। ঘড়ির কাঁটা তখন গভীর রাত ছুঁয়েছে। গর্ভকাল মাত্র ২৮ সপ্তাহ।
তার ওপর যমজ সন্তান।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে আমার একমুহূর্তও সময় লাগেনি। দ্রুত প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
তারপর সিদ্ধান্ত হলো, উন্নত চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে ঢাকায় পাঠাতে হবে।
অ্যাম্বুলেন্সের দরজা বন্ধ হওয়ার আগে আমি মেয়েটির হাত ধরে বলেছিলাম, ‘ভয় পেয়ো না। সাহস রাখো।
সে কোনো কথা বলেনি।’
শুধু আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরেছিল।
সেই স্পর্শে আমি বুঝেছিলাম, ও শুধু একজন চিকিৎসকের হাত ধরে নেই, একজন মায়ের হাত ধরে আছে।
অ্যাম্বুলেন্সের লাল আলো রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ আমি হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
আকাশে তখন ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে।
কিন্তু আমাদের জীবনে তখনো ভোর আসতে অনেক দেরি।
৪.
ঢাকায় পৌঁছানোর পর শুরু হলো আরেকটি যুদ্ধ। এ যুদ্ধ অস্ত্রের নয়, সময়ের সঙ্গে। প্রতিটি ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি দিন অমূল্য।
ফোনের ওপাশ থেকে প্রতিদিন নতুন খবর আসত। কখনো আশাব্যঞ্জক, কখনো উদ্বেগের। আমি চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলতাম, রিপোর্ট দেখতাম, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতাম। আর যখনই ফোনটি নামিয়ে রাখতাম, নিঃশব্দে একটি দোয়া বেরিয়ে আসত—
‘হে ভগবান, এত দূর এনে আর ফিরিয়ে দিয়ো না।’
অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান হলো। দুটি কন্যাশিশু জন্ম নিল। খুব ছোট। খুব নরম।
দুটি জীবন যেন মৃত্যুর দরজার সামনে দাঁড়িয়েও পৃথিবীকে ছেড়ে দিতে রাজি নয়।
তারপর শুরু হলো নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কক্ষের দিনগুলো।
স্বচ্ছ কাচের ওপারে দুটি ক্ষুদ্র মুখ। ক্ষুদ্র দুটি বুক ওঠানামা করছে।
শরীফুল ভাই প্রথম দিন কিছুই বলতে পারেননি। শুধু অনেকক্ষণ কাচের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আমি বুঝেছিলাম, একজন মানুষের চোখেও কখনো কখনো সিজদা নেমে আসে।
দিন গড়াল।
একদিন অক্সিজেন দেওয়া কমল। আরেক দিন ওদের প্রথমবার মায়ের বুকের কাছে নেওয়া হলো।
তারপর ধীরে ধীরে চিকিৎসকেরা বললেন, এখন বিপদ অনেকটাই কেটে গেছে।
সেদিন বহুদিন পর আমি নিশ্চিন্ত হয়ে দীর্ঘ একটি নিশ্বাস নিয়েছিলাম।
এখন সেই দুই শিশুর বয়স ছয় মাস।
ওরা ঘরের মধ্যে যখন খেলা করে, তখন মনে হয়, ঘরের ভেতর দুটি ছোট্ট রোদ খেলছে। একজন হাসলে অন্যজনও হাসে। একজন হাত বাড়ালে অন্যজনও যেন তাকে অনুসরণ করে।
ওদের কথা ভাবলে আমার কখনো পাঁচটি গর্ভপাতের ইতিহাস মনে পড়ে না।
মনে পড়ে শুধু মানুষের অবিশ্বাস্য লড়াই করার ক্ষমতা।
মনে পড়ে, আশা কখনো কখনো সত্যিই ফিরে আসে।
এর কিছুদিন পর শরীফুল ভাই হজ পালন করে দেশে ফিরলেন।
এক বিকেলে তিনি আমার চেম্বারে এলেন।
হাতে একটি কাপড়ের ব্যাগ।
ভেতর থেকে বের করলেন জমজমের পানি, খেজুর, কাপড়।
আমি হেসে বললাম, ‘ভাই, এত কিছু আনার কী দরকার ছিল?’
তিনি মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, ‘এগুলো তো শুধু বাহানা, দিদি। আপনার জন্য আসল জিনিসটা অন্য।’
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
খুব ধীরে আমার মাথায় হাত রাখলেন।
সেই স্পর্শে আমি যেন বহু বছরের বিশ্বাসের উষ্ণতা অনুভব করলাম।
তিনি বললেন, ‘কাবা শরিফের সামনে দাঁড়িয়ে আমি আপনার জন্য দোয়া করেছি। আল্লাহ যেন আপনাকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখেন। আপনি না থাকলে আজ আমার মেয়ের কোল ভরত না। আমাদের সংসারও এভাবে পূর্ণ হতো না।’
আমি জানি, একজন চিকিৎসক কখনোই একা কোনো জীবন গড়ে তোলেন না। সেখানে থাকে রোগীর সাহস, পরিবারের ধৈর্য, সহকর্মীদের নিষ্ঠা সর্বোপরি সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা।
তবু তাঁর কৃতজ্ঞতার ভাষা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করল। চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
কথা ঘুরিয়ে আমি বললাম, ‘ভাই, চলুন, আজ একটা ছবি তুলি।’
তিনি কিছুটা সংকোচ নিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন।
ক্যামেরা প্রস্তুত।
ঠিক সেই মুহূর্তে আমি দেখলাম, তাঁর চোখ বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ছে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘এ কী! কাঁদছেন কেন?’
তিনি শিশুর মতো সরল কণ্ঠে বললেন, ‘দিদি...আপনি আমাকে এত সম্মান দিলেন!’
আমি আর কোনো উত্তর দিইনি। কারণ জানতাম, তিনি ভুল বলছেন। সম্মান আমি তাঁকে দিইনি। সম্মান তিনি নিজেই অর্জন করেছেন। একজন মানুষের প্রতি অবিচল বিশ্বাস রেখে। ধর্মের দেয়াল অতিক্রম করে একটি সম্পর্ককে আপন করে নিয়ে। ভালোবাসাকে রক্তের চেয়েও বড় প্রমাণ করে।
সেই ছবিটা আজও আমার কাছে আছে।
অনেকেই ছবিটা দেখে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার ভাই?’
আমি হেসে বলি, ‘হ্যাঁ, আমার ভাই।’
তারপর আর কোনো ব্যাখ্যা দিই না।
সব সম্পর্কের পরিচয় ব্যাখ্যা করে বোঝানো যায় না। কিছু সম্পর্ক মাতৃগর্ভে জন্ম নেয় না। জন্ম নেয় মানুষের হৃদয়ে।
সেদিন বুঝেছিলাম, রক্ত মানুষকে আত্মীয় করে আর ভালোবাসা মানুষকে আপন করে। সেই আপন হওয়ার জন্য একই ধর্ম, একই বংশ, একই রক্তের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু একটি নির্মল হৃদয়।
চিকিৎসক হিসেবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনো পদক নয়, কোনো সম্মাননা নয়, কোনো সফল অস্ত্রোপচারও নয়। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি—মানুষের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসেরই একটি নাম শরীফুল ইসলাম।
তিনি আমার রক্তের ভাই নন। তবু আমার জীবনের সবচেয়ে সত্য ভাইদের একজন। তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক রক্তের বাঁধনে বাঁধা ছিল না; তার চেয়েও গভীর কিছুতে বাঁধা ছিল।
ঢাকা
০৫–০৭–২০২৬