অন্য প্রেমকাহিনি থেকে ‘নীল রেইনকোট’ কেন আলাদা
বৃষ্টিস্নাত এক সন্ধ্যা, শহরের নিঃশব্দ রাস্তা, নীল রঙের এক রেইনকোট, পুরোনো বই আর বইয়ের পাতায় লুকিয়ে থাকা হাতে লেখা চিঠি—এই সবকিছুর আবহে তৈরি হয়েছে তানভীর হাসানের লেখা নাটক ‘নীল রেইনকোট’। এটি শুধুই একটি প্রেমের গল্প নয়; বরং সময়, বাস্তবতা আর জীবনের ভারে চাপা পড়ে যাওয়া মানুষের না-বলা অনুভূতির এক গভীর দলিল।
নাটকটি আমাদের খুব চেনা এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়। জীবনের ব্যস্ততা, চাকরির অনিশ্চয়তা, পারিবারিক দায়—এই সবকিছু মিলে কীভাবে ধীরে ধীরে প্রিয় মানুষদের কাছ থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দেয়, সেই চাপা আর্তনাদগুলোই গল্পের মূল সুর। ভালোবাসা এখানে উচ্চ স্বরে কিছু দাবি করে না; বরং নীরবে অপেক্ষা করে, হারিয়ে যায়, অপূর্ণ থেকে যায়। আর ঠিক এই অপূর্ণতাই দর্শকের মনে দীর্ঘ সময় ধরে রেশ রেখে যায়।
ডিজিটাল যুগের ‘জাদুর বাক্স’ আর দ্রুতগতির ইন্টারনেটের ভিড়ে বইয়ের পাতায় ভাঁজ করে রাখা চিঠি যেন এক হারিয়ে যাওয়া আবেগের প্রতীক। হাতে লেখা শব্দ, অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস আর না পাওয়ার আক্ষেপ—এই চিঠিগুলো নাটকটিকে কেবল রোমান্টিক নয়, বরং গভীরভাবে প্রাণবন্ত করে তোলে। মনে হয়, এই গল্পের ভেতর কোথাও আমাদের নিজেদেরই কিছু না বলা কষ্ট, অভিমান আর অসমাপ্ত কথোপকথন আটকে আছে।
নাটকটি দেখা শেষ করে লেখকের প্রতি একধরনের অভিমান থেকে যায়। কেন ছয় মাস, ছয় বসন্ত কিংবা হাজার দিন পেরিয়েও তারা একে অপরকে পেল না? কেন ভালোবেসে নিজ থেকেই হারিয়ে যেতে হলো, যাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। হয়তো এই অপূর্ণতাই গল্পটাকে আরও বাস্তবিক করে তোলে।
ভালোবাসারা কি অপেক্ষায় বাঁচে?
নাটকের একটি সংলাপ বিশেষভাবে মনে দাগ কাটে আর সেটি হলো—‘বইয়ের কোনো বিশেষত্ব হয় না, বই তখনই বিশেষ হয় যখন তা বিশেষ মানুষের হাতে যায়।’ এই একটি লাইনের মধ্যেই যেন পুরো নাটকের দর্শন লুকিয়ে আছে।
একদিকে প্রেমিকের খোঁজে বারবার বইয়ের দোকানে প্রেমিকার যাওয়া-আসা, অন্যদিকে বেকারত্বের দায় মাথায় নিয়ে চাকরির আশায় এই টেবিল থেকে ওই টেবিল ছুটে চলা—এই সমান্তরাল বাস্তবতা নাটকটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। জীবনের এমন নির্মম বাঁকগুলোই ‘নীল রেইনকোট’-কে নিছক প্রেমকাহিনি থেকে আলাদা কাতারে দাঁড় করায়।
‘নীল রেইনকোট’ নাটকের আরেকটি নীরব শক্তির জায়গা হলো নির্মাতা রুবেল আনুশের নির্মাণশৈলী। তিনি গল্পকে অতিরিক্ত নাটকীয় করে তোলার লোভে যাননি। খুব সচেতনভাবে সংযত ফ্রেম, ধীরগতির দৃশ্যবিন্যাস আর নিঃশব্দ বিরতি ব্যবহার করেছেন।
সবচেয়ে বড় কথা, রুবেল আনুশ গল্পকে সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেননি। তিনি দর্শকের হাতে গল্পটা ছেড়ে দিয়েছেন। এই নির্মাণদৃষ্টিই ‘নীল রেইনকোট’-কে সাধারণ টেলিভিশন নাটকের সীমা পেরিয়ে একধরনের অনুভবনীয় শিল্পে পরিণত করেছে।
সাংগঠনিক সম্পাদক, সাতক্ষীরা বন্ধুসভা