নীল রেইনকোট: এক অপূর্ণ মানস-প্রতিমার অশ্রুলেখ

‘নীল রেইনকোট’ নাটকের দৃশ্যসংগৃহীত

বৃষ্টি ও নিয়তি: জীবনানন্দের ছায়াপাত
নাটকটির আবহে যেন বারবার ফিরে আসে জীবনানন্দ দাশের সেই হাহাকার—‘সব রাঙা কামনার শিয়রে যে দেয়াল ওঠে, তার নাম সময়।’ এক ঘনঘোর বর্ষায় গল্পের শুরু, যেখানে বৃষ্টির ঝাপটা কেবল ধূলিকণা ধুয়ে দেয় না, বরং দুই অপরিচিত আত্মার অন্তরাত্মাকে নগ্ন করে দেয়। শুভ্র যেন সেই বিপন্ন বিস্ময় নিয়ে বেঁচে থাকা যুবক, যার পকেটে কেবল অচল মুদ্রার মতো জমে আছে একরাশ অভিমান। আর অর্পিতা? সে যেন বনলতা সেন, যে নিরাশ্রয় জীবনের ক্লান্তির মাঝে শুভ্রর রেইনকোটের নিচে খুঁজে পায় এক মুহূর্তের আশ্রয়।

রৈখিক প্রেমের ঊর্ধ্বে: শেষের কবিতার আধুনিক বয়ান
নাটকের মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা। অমিত ও লাবণ্যের মতো শুভ্র আর অর্পিতার প্রেমও কি কেবল মানসলোকে বন্দি থাকার জন্যই সৃষ্টি হয়েছিল? পরিচালক এখানে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে দেখিয়েছেন, বাস্তবতার করালগ্রাসে অনেক সময় ‘অমিত-লাবণ্য’রা হারিয়ে যায়, শুধু পড়ে থাকে তাদের ব্যবহৃত কিছু স্মৃতি—যেমন এই ‘নীল রেইনকোট’। বইয়ের দোকানে চিরকুট আদান-প্রদান যেন এক প্রাচীন ঋতুচক্রের পুনরাবৃত্তি, যেখানে শব্দগুলো কাগজের বুকে নয়, হৃদয়ের গহিনে চারাগাছ হয়ে বেড়ে ওঠে।

শূন্যতার নন্দনতত্ত্ব ও নীল বিষাদ
নীল রং এখানে কেবল রঙের ব্যঞ্জনা নয়, তা এক অনন্ত বেদনার প্রতীক। মধ্যবিত্তের না-পাওয়ার বেদনা, যোগ্যতাহীনতার গ্লানি আর চাকরির বাজারে পণ্য হয়ে যাওয়ার যে আর্তনাদ শুভ্রর চরিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে, তা যেন আধুনিক যুগের এক সামাজিক ট্র্যাজেডি। শুভ্রর ঘর ছেড়ে নিরুদ্দেশ হওয়াটা কোনো পলায়নবৃত্তি নয়; বরং এটি শরৎচন্দ্রীয় সেই ত্যাগ, যেখানে নায়ক নিজেকে নিঃস্ব করে দিয়েও প্রিয়তমার সম্মান রক্ষা করতে চায়। সে জানত, রিক্ত হস্তের আলিঙ্গনে কেবল দারিদ্র্যের কাঁটা থাকে, প্রেমের পুষ্পশয্যা নয়।

একটানা অপেক্ষার কাব্য: ওয়েটিং ফর গোডোর ছায়া
নাটকটির শেষাংশ যেন স্যামুয়েল বেকেটের সেই নিরন্তর অপেক্ষার কথা মনে করিয়ে দেয়। অর্পিতা স্টেশনে কিংবা বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় যে নীল রেইনকোট পরে দাঁড়িয়ে থাকে, তা যেন এক মরীচিকার পেছনে ছোটা। শুভ্র ফেরেনি, হয়তো ফিরবেও না। কিন্তু এই না-ফেরাটুকু আছে বলেই প্রেমটি তার পবিত্রতা হারায়নি। সাহিত্যের ভাষায়—‘মিলনই প্রেমের অন্তিম পরিণতি নয়, বিরহই তার অনন্ত যৌবন’। অর্পিতার দৃষ্টিতে যে শূন্যতা ফুটে ওঠে, তা যেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে লেখা কোনো এক নিঃসঙ্গ নারীর আত্মকথন। শহর বদলে যায়, মানুষ বদলে যায়, শুধু বদলে যায় না সেই নীল রেইনকোটের ঘ্রাণ, যা অর্পিতার নাসারন্ধ্রে আজও এক হারানো বসন্তের স্মৃতি বয়ে আনে।

‘নীল রেইনকোট’ নাটকের পোস্টার।

উপসংহারহীন এক যাত্রা
‘নীল রেইনকোট’ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে মহৎ সাহিত্য বা নাটক সব সময় সুখের বারতা নিয়ে আসে না। এটি আমাদের হৃদয়ে সেই দহনটুকু জ্বালিয়ে রাখে, যা আমাদের মানুষ হিসেবে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। মেঘলা দুপুরে জানালার পাশে বসে যখন নাটকটি শেষ হয়, তখন বুকের ভেতর একধরনের হাহাকার তৈরি হয়—যাকে সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রে বলা হয় ‘করুণ রস’।

শুভ্র আর অর্পিতা হারিয়ে গেছে সময়ের অতলে, কিন্তু তাদের সেই অসমাপ্ত প্রেম চিরকাল বেঁচে থাকবে বৃষ্টির প্রতিটি শব্দের মাঝে, প্রতিটি নীল রেইনকোটের আড়ালে।

দীর্ঘ প্রশ্নের জট, সম্পর্কে টানাপোড়েন আর পাওয়া না–পাওয়ার আবহেই নির্মিত হয়েছে বিশেষ নাটক ‘নীল রেইনকোট’। তরুণ লেখক তানভীর হাসানের গল্পে নাটকটি পরিচালনা করেছেন রুবেল আনুশ। এতে ‘শুভ্র’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাদ নাওভি এবং ‘অর্পিতা’ চরিত্রে জিম। এ ছাড়া বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন দিশা রহমান, আনোয়ার আজপুর, আনোয়ার, সিদ্ধাত্য, আব্রাহাম তামিম প্রমুখ। প্রযোজনা করেছেন আকবর হায়দার মুন্না। নাটকটি দেখা যাচ্ছে ক্লাব ইলেভেন এন্টারটেইনমেন্টের ইউটিউব চ্যানেলে।

হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত