ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপন্যাস। উপন্যাসটি একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি শ্রমিকশ্রেণির আত্ম–আবিষ্কার, ভয় থেকে মুক্তি এবং সংগ্রামের পথে এগিয়ে যাওয়ার দলিল। এর কেন্দ্রে রয়েছে এক মা ও তার ছেলে—যাদের ব্যক্তিগত জীবনের রূপান্তর ধীরে ধীরে সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রতীকে পরিণত হয়।
ছেলে পাভেল বস্তিতে থেকেও বাম রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়। তার কথাবার্তা, চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি আশপাশের মানুষের থেকে আলাদা। সে প্রশ্ন তোলে—কেন শ্রমিকেরা সারা জীবন খেটে মরেও সম্মান পায় না, কেন ভয়কে অস্ত্র করে শাসকেরা মানুষকে কাবু করে রাখে। তার এই বোধ বইপড়া, চিন্তাচর্চা ও সংগঠনের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়। আর এই পরিবর্তনের প্রথম দর্শক তার মা পেলাগিয়া নিলোভনা।
শুরুতে মা ছেলের আচরণে বিস্মিত, কখনো শঙ্কিত। কিন্তু ধীরে ধীরে ছেলের বন্ধুদের সংস্পর্শে এসে তিনি এক নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হন। যারা ধর্ম মানে না, কিন্তু মানুষের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। যারা ক্ষমতায় নেই, কিন্তু সত্যের পক্ষে দৃঢ়। এখানেই গোর্কি অসাধারণ দক্ষতায় দেখান, একজন সাধারণ, নিপীড়িত নারীর চেতনার ধীরে ধীরে জেগে ওঠা। মা শুধু ছেলের জন্য গর্বিত নন, তিনি নিজেও সংগ্রামের অংশ হয়ে ওঠেন।
ছেলে শ্রমিক আন্দোলনের কারণে গ্রেপ্তার হলে উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরটি ঘটে, মা সামনে এগিয়ে আসেন। লিফলেট বিতরণ, গোপন কাজে অংশগ্রহণ, ভয়কে অতিক্রম করে রাজপথে দাঁড়ানো—সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন আন্দোলনের জীবন্ত প্রতীক। একসময় যে নারী নির্যাতন, দারিদ্র্য আর নীরবতার জীবন যাপন করেছেন, সেই তিনিই বলেন দেশের জন্য, মেহনতি মানুষের জন্য জীবন দিতে হলে হাসিমুখেই দেবেন।
উপন্যাসের উক্তিগুলো এর রাজনৈতিক দর্শনকে স্পষ্ট করে তোলে। গোর্কির চোখে জাতি বা ধর্ম নয়, পৃথিবীতে আসলে দুটি শ্রেণিই বিদ্যমান—ধনী ও গরিব। শ্রমিকেরাই সভ্যতা গড়ে, রুটি জোগায়, কারখানা বানায়, অথচ জীবনে তাদের স্থান সবচেয়ে পেছনে। ভয় ও দমন যত বাড়ে, ততই সংগ্রামের আগুন ছড়ায়—এই বাস্তব সত্যটি গোর্কি অত্যন্ত শক্তভাবে উপস্থাপন করেছেন।
উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নারী জীবনবোধ। পেলাগিয়া কেবল ‘কারও মা’ নন, তিনি নিজস্ব চেতনা ও সিদ্ধান্তের অধিকারী একজন মানুষ। পুরুষশাসিত সমাজে থেকেও তিনি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠেন, যা রুশ বাস্তবতার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী নারীর আত্ম–উত্থানের কথাই বলে।
সব মিলিয়ে, ‘মা’ এমন একটি উপন্যাস, যা ভয় থেকে সাহসের, নীরবতা থেকে উচ্চারণের, ব্যক্তিগত জীবন থেকে সামষ্টিক সংগ্রামে পৌঁছানোর এক অনন্য সাহিত্যিক যাত্রা। আজও এই উপন্যাস প্রাসঙ্গিক। কারণ, শোষণ, ভয় ও প্রতিরোধের গল্প এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
মানবাধিকারকর্মী ও শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়