‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ যে কারণে অবশ্যই পড়তে হবে

আমি বীরাঙ্গনা বলছিছবি: সংগৃহীত

সংসারের নিয়ম হলো, কোনো কিছু পেতে হলে তার মূল্য দিতে হয়। বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পাওয়ার জন্য বহু নারীকে মূল্য দিতে হয়েছে। ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ বইটিতে লেখক এমন সাতজন বীরাঙ্গনার গল্প তুলে ধরেছেন, যাঁদের ত্যাগের বিনিময়েই আমাদের এই স্বাধীনতা।

এত কষ্ট ও আত্মত্যাগের পরও স্বাধীন দেশ তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে পারেনি। অনেক বীরাঙ্গনাকে পরিবার গ্রহণ করেনি, ফলে বাধ্য হয়ে তাঁরা বিদেশে চলে গেছেন। বইটিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মমতা ও নারীদের ওপর চালানো পাশবিক নির্যাতনের কিছু বাস্তব বর্ণনা রয়েছে। এমন এক ঘটনার কথা বলা হয়েছে, এক পাকিস্তানি সেনা একটি মেয়েকে ধরে নিয়ে তাঁর সারা শরীরে কামড়ায়, তাঁকে ধর্ষণ করে, পরে তাঁর মুখে পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করায়। মেয়েটি কামড় দিলে তাঁর চুল লুঙ্গি দিয়ে বেঁধে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে ফ্যান ছেড়ে দেওয়া হয়। এসব পড়ার পর দীর্ঘ সময় অসুস্থ লাগা স্বাভাবিক।

এমন আরও অসংখ্য কাহিনি রয়েছে এই বইয়ে। যারা যুদ্ধের এসব সত্য পড়তে চায় না, তারাই আজ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনতে চায়। সে কারণেই ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ সবার জন্য একটি অবশ্যপাঠ্য বই। আমাদের ইতিহাস জানতেই হবে।

বীরাঙ্গনাদের জীবনের কাহিনি বর্ণনার পাশাপাশি লেখক জীবনবোধ ও সমাজভাবনার কিছু গভীর উক্তিও তুলে ধরেছেন। যেমন—

‘বর্তমানকে আমরা চিন্তাভাবনা, অনুভূতি ও যোগ্যতা দিয়ে পূর্ণ করে রাখতে চাই, যেন অতীত কোনো ছিদ্রপথে প্রবেশ করতে না পারে।’
এক বীরাঙ্গনার কণ্ঠে শোনা যায়, ‘আমি নির্বাসিত হলেও রাজাকার-আলবদর নির্বাসিত হয়নি, বরং আমাদের ওপর অত্যাচারের জন্য তারা পুরস্কৃত হয়েছে।’
‘সেদিন বাঙালি দেহে স্বাধীন হলেও মনকে পরিচ্ছন্ন করতে পারেনি; মানুষের চেয়ে প্রথা বড় হয়ে উঠেছে।’
‘সত্যিই কার্যকারণ দিয়ে মানুষের মনকে বিচার করা যায় না।’
‘মুসলমানরা লেখাপড়া শিখে ভদ্র হয়েছে, হিন্দুদের অনুকরণ করে সমান হয়েছে; তাই তারাও ঘর পায়নি।’
বিদেশে নির্বাসিত এক বীরাঙ্গনা বলেন, ‘আমার মৃত্যুর পর আমাকে বাংলাদেশে নেওয়ার চেষ্টা কোরো না। জন্ম দিলে জননী হওয়া যায়, লালন-পালন না করলে মা হওয়া যায় না।’
• ‘বাঙালি মেয়ের জীবন যদি আল্লাহর নির্দেশেই চলত, তাহলে মৌলবি-মাওলানারা বেকার হয়ে যেতেন।’
‘শুধু নারী বলেই আমরা অপবিত্র, অথচ রাজাকার-আলবদররা আজও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি।’
‘মানুষের মাতৃভূমির টান গভীর। ভুলে থাকলেও ভোলা যায় না।’
‘লেখাপড়া মানুষকে চাকরি দেয়, কিন্তু মনের প্রসারতা দিতে পারে না।’
‘যে ধর্মেরই হোক, খাকি পোশাক গায়ে তুললেই মনুষ্যত্ববোধ মরে যায়।’
• ‘এই মাটিতে দয়ালু, উদার মানুষের ঠাঁই নেই। স্বার্থান্ধের হাতে তাদের নিধন অনিবার্য।’
‘মেয়েদের জীবন নিয়ে পুরুষ যা ইচ্ছে তা–ই করতে পারে, ভোগ করে ছুড়ে ফেলে দেয়।’

এই বই আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু বিজয়ের নয়, ভয়াবহ বেদনা ও অবহেলার ইতিহাসও। ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ পড়া মানে এটি আমাদের দায়, আমাদের লজ্জা এবং আমাদের দায়িত্ব স্মরণ করা।

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়