কুসুমতী মুক্ত পাঠশালা

ছবি: এআই/বন্ধুসভা

নদীর নাম কুসুমতী। বর্ষায় সে উন্মাদ কিশোরীর মতো ছুটে বেড়ায়, আর শীতে মনে পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি এসে তার বুকেই ঘুমিয়ে পড়ে। নদীর ধারে একা দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে। গ্রামের সবাই তাকে ডাকে অলকা। ওর জন্মের তিন দিনের মাথায় মা চলে গেছে। বাবা ছিল মাঝি। এক ভাদ্রের ঝড়ে নৌকা উল্টে নদী তাকে নিজের কাছে রেখে দেয়। তখন অলকার বয়স মাত্র পাঁচ। এর পর থেকে মানুষ তাকে বড় করেনি। বড় করেছে নদী, বাতাস আর একটা কুকুর। কুকুরটার নাম ছাই। কালচে-ধূসর রঙের রোগা প্রাণীটা কোথা থেকে যেন এক বর্ষার সকালে এসে অলকার পিছু নেয়। এর পর থেকে আর ছাড়ল না কোনো দিন।

অলকা নদীতে কাপড় কাচতে গেলে ছাই বসে থাকত ঘাটের সিঁড়িতে। মাঠে শাক তুলতে গেলে একটু দূরে দূরে পাহারা দেয়। রাতে অলকার কুঁড়েঘরের দরজায় গোল হয়ে শুয়ে থাকে। গ্রামের কেউ কেউ বলে, ‘ঈশ্বর যখন মানুষ কেড়ে নেন, তখন কখনো কখনো একটি প্রাণীকে পাঠিয়ে দেন পাহারাদার করে।’
অলকা এসব শুনে শুধু হাসে। তার হাসিটা খুব অদ্ভুত। মনে হয় অনেক কান্না শুকিয়ে গেলে যেমন একটা নরম আলো জন্মায়, ঠিক তেমন। অলকার একটা স্বপ্ন ছিল। সে নদীর ধারে একদিন একটা ছোট্ট পাঠশালা করবে। যেসব শিশু বই কিনতে পারে না, তারা সেখানে পড়বে। কেউ ফি দেবে না। কেউ কারও নাম জিজ্ঞেস করবে না। শুধু অক্ষর শেখানো হবে। অলকা বলে, ‘মানুষের হাতে যদি একটা বই তুলে দেওয়া যায়, তবে সে একদিন নিজের ভাগ্য নিজেই লিখে নিতে পারবে।’

গ্রামের লোক হাসে। গরিব মেয়ের স্বপ্ন নাকি এত বড় হতে নেই। তবে কুসুমতী কোনো দিন হাসেনি। ছাইও না। বরং প্রতিদিন বিকেলে অলকা যখন নদীর পাড়ে বসে পুরোনো বই পড়ে, ছাই মাথাটা তার হাঁটুর ওপর রেখে নিশ্চিন্তে চোখ বোজে। মনে হয়, পৃথিবীতে অন্তত একজন আছে, যে অলকার প্রতিটি স্বপ্ন বিশ্বাস করে। আর সেই বিশ্বাসের দাম যে কত বড়, তা তখনো কেউ বুঝিনি...

দুই.
শীতের ভোরে কুসুমতী নদীর বুক এমন কুয়াশায় ঢেকে যায় যে ওপারের তালগাছগুলোকে মনে হয় কেউ সাদা চাদরের আড়ালে দাঁড় করিয়ে রেখেছে বিভ্রাট পাহাড়। অলকার দিনের শুরু হয় সূর্য ওঠারও আগে। উঠান ঝাঁট দেওয়া, কলসি ভরে জল আনা, ছাইকে একমুঠো ভাত খেতে দেওয়া, তারপর মাথায় বাঁশের ডালা তুলে পাশের গ্রামের হাটে যাওয়া। ডালায় থাকে কচি লাউ, শাপলা, কলমিশাক, কখনো বুনো ফুলের ছোট ছোট গুচ্ছ। বিক্রি শেষে যে কয়টা টাকা হাতে আসে, তার অর্ধেক দিয়ে চাল কেনে আর বাকিটা জমিয়ে রাখে পুরোনো একটি টিনের বাক্সে। কেউ জানে না, সেই টাকাগুলোর জন্য তার কত বড় পরিকল্পনা।

হাটের এক কোণে বসেন একজন বৃদ্ধ বই বিক্রেতা। নাম শশাঙ্কবাবু। পুরোনো, ছেঁড়া, মলাটহীন বই কিনে এনে খুব সামান্য দামে বিক্রি করেন। প্রতি হাটবারেই অলকা শশাঙ্কবাবুর দোকানে যায়। কখনো একটি বাংলা ব্যাকরণ, কখনো কবিতার বই, কখনো পুরোনো মানচিত্র, আবার কখনো শিশুদের গল্পের বই কেনে। একদিন শশাঙ্কবাবু হেসে বললেন, ‘মা, এত বই দিয়ে কী করবি?’
অলকা বইগুলোর মলাটে হাত বুলিয়ে শান্ত গলায় বলে, ‘মানুষের ঘরে ঘরে আলো জ্বালাতে তেল লাগে। আমার ঘরে তেল কেনার সাধ্য নেই। তাই ভাবছি অক্ষর জমাই। অক্ষরের আলো হয়তো একদিন অনেক দূর যাবে।’
বৃদ্ধ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর নিজের বাক্সের ভেতর থেকে একটি ছোট্ট কাঠের স্লেট আর কয়েকটা খড়ি বের করে অলকার হাতে দিলেন।
‘এটার দাম দিতে হবে না। যে মানুষ বই ভালোবাসে, তার কাছে বই বিক্রি করলে লাভের হিসাব রাখা পাপ।’

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে অলকার চোখে জল এসেছিল। ছাই তার মুখের দিকে তাকিয়ে লেজ নাড়ছিল, যেন সে বুঝতে পারছে আজকের আনন্দের কারণ।

সেই সন্ধ্যায় অলকা নদীর ধারে পুরোনো অশ্বত্থগাছের নিচে পাঁচজন ছেলেমেয়েকে বসিয়ে প্রথম অক্ষর শেখানোর অগ্রযাত্রা শুরু করে।
অনাবিল ফুলের মুখে মুখে নদীর স্রোতের সুরে শ্রুতিমধুর মন্ত্রমালা ‘অ’, ‘আ’...। কারও হাতে খাতা ছিল না। কারও পায়ে জুতা ছিল না। তবু সেদিন কুসুমতী নদীর পাড় যেন এক নতুন বিদ্যালয়ের জন্ম নিল। প্রথম দিন শেষে অলকা প্রত্যেককে একটি করে শিউলি ফুল দিয়ে বলেছিল, ‘অক্ষর আর ফুল, দুটোই যত ভাগ করবে, তত বাড়বে।’

সেই থেকে প্রতিদিন বিকেলে নদীর ধারে শিশুদের ভিড় বাড়তে শুরু হয়। কেউ গোপনে এসে বসে। কেউ দূর থেকে দাঁড়িয়ে শোনে। কেউ আবার বাড়ির লোকের ভয়ে লুকিয়ে পড়তে আসে। অথচ গ্রামের সবাই বিষয়টা ভালো চোখে দেখে না। কারও কারও মনে হতে লাগল, একটি অনাথ মেয়ে গ্রামের ছেলেমেয়েদের মাথা নষ্ট করছে।

এক সন্ধ্যায় হাট থেকে ফেরার সময় অলকা লক্ষ করল, তিনজন লোক রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করছে। সে কিছু বলল না। শুধু ছাইকে কাছে ডেকে সামনের পথে অবজ্ঞায় অগ্রসর…
অদূরে কুসুমতী নদীর ওপর তখন কুয়াশা নেমেছে। সেই কুয়াশার আড়ালেই, অদেখাভাবে, অলকার স্বপ্নের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল এক কঠিন পরীক্ষা।

তিন.
কুসুমতী নদীর পাড়ে সেই অশ্বত্থগাছটার নিচে এখন রোজ বিকেলে হাসির শব্দ শোনা যায়। কেউ ‘অ’ লিখতে শিখেছে। কেউ নিজের নাম। কেউ প্রথমবারের মতো বুঝেছে, বইয়ের পাতায়ও মানুষের জীবন লুকিয়ে থাকে। অলকা কখনো নিজেকে গুরু ভাবে না। সে বলে, ‘আমি তোদের পড়াই না রে। আমি শুধু দরজাটা খুলে দিচ্ছি। ভেতরে ঢুকবি কি না, সে পথ তোদের নিজের।’
ছাই একটু দূরে শুয়ে থাকে। শিশুরা তাকে নিয়ে খেলে। কেউ গলায় বুনো ফুলের মালা পরিয়ে দেয়, কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘তুইও আমাদের স্কুলের ছাত্র।’

আরও পড়ুন

দেখতে দেখতে নদীর ধারের সেই খোলা পাঠশালার কথা আশপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সুখের খবর যেমন বাতাসে উড়ে যায়, তেমনি সিংহের গর্জনের মতো মানুষের হিংসাও পথ চিনে নিতে দেরি করে না।
গ্রামের মোড়ল হরিপদ সরকার একদিন কয়েকজনকে নিয়ে এসে দাঁড়ালেন অশ্বত্থগাছের নিচে। কড়া গলায় বললেন, ‘এখানে এসব আর হবে না। অনুমতি ছাড়া স্কুল খোলা যায় না। গ্রামের ছেলেমেয়েদের মাথা ঘুরিয়ে দিচ্ছিস কেন?’
অলকা শান্ত স্বরে বলল, ‘আমি কোনো স্কুল খুলিনি কাকা। যারা পড়তে চায়, তারা এসে বসে।’
‘সে কথা শুনব না। কাল থেকে এখানে কাউকে যেন না দেখি।’
বাচ্চাগুলো ভয়ে একে অন্যের হাত চেপে ধরল। ছাই গর্জে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে জ্বলছে। অলকা তার মাথায় হাত রেখে বলল, ‘চুপ। রাগ করলে আলো নেভে…’
সেদিন আর কারও পড়া হলো না। সবাই মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে যায়। পরদিন বিকেলে অলকা তবু বই নিয়ে অশ্বত্থতলায় এসে বসেছিল। কেউ আসেনি। একজনও আসেনি।

তারপর আরও কয়েক দিন গেল। তবু কেউ এল না। তৃতীয় দিনের সন্ধ্যায় অলকা যখন বই গুছিয়ে ফিরবে, তখন হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে একে একে বেরিয়ে এল সাতটি ছোট্ট মুখ। কারও হাতে কলম। কারও হাতে খড়ি। একটি মেয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘বাড়িতে বলেছি, ছাগল চরাতে যাচ্ছি।’
আরেকজন বলল, ‘আমরা পড়ব দিদি। লুকিয়ে হলেও পড়ব।’
অলকার মুখে সেদিন যে হাসি ফুটেছিল, কুসুমতীর জলও যেন তা দেখে ঝিকমিক করে উঠেছিল। সেই থেকে পাঠশালা আবার শুরু হলো। তবে এবার গোপনে। সূর্য ডোবার পর। যখন মাঠ ফাঁকা হয়ে যায়, গরুগুলো গোয়ালে ফিরে আসে আর কুয়াশা ধীরে ধীরে নদীর বুক ঢেকে দেয়। অন্ধকারের ভেতর ছোট্ট একটি কেরোসিনের বাতি জ্বলে। সেই আলোয় অক্ষর ফোটে। স্বপ্নের বুনন জন্ম হয়।

এক রাতে পড়া শেষ করে অলকা বাড়ি ফিরল। হঠাৎ দূর থেকে ধোঁয়ার গন্ধ পেল। দৌড়ে এসে দেখে, তার কুঁড়েঘরের চালে আগুন লেগেছে। শুকনা খড়ের চাল মুহূর্তেই দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করেছে। গ্রামের মানুষ ছুটে এলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ঘরের ভেতরের প্রায় সবকিছুই পুড়ে ছাই। ভোরের দিকে, আগুন নিভে গেলে অলকা ছাইয়ের স্তূপে হাতড়াতে হাতড়াতে খুঁজে পেল সেই পুরোনো টিনের বাক্সটা। বাক্সের ঢাকনা অর্ধেক পুড়ে গেছে। ভেতরের টাকাগুলোও আগুনে কালো হয়ে গেছে। কিন্তু এক কোণে কাপড়ে মোড়ানো কয়েকটি বই এখনো অক্ষত। অলকা বইগুলো বুকে চেপে বসে আছে। তার চোখে থলথলে পোতাশ্রয়ের অথই। তবু হার মানেনি অবাধ্য সেই মেয়েটি। অসীমে তাকিয়ে অলকা আস্তে করে বলল, ‘ঘর পুড়েছে। স্বপ্ন তো নয়।’
ছাই এসে তার পাশে বসে মাথা রাখল। পূর্ব আকাশে তখন ভোরের প্রথম আলো ফুটছে। দূরে নদীর কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। আর সেই আলোয় ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে অলকাকে দেখে মনে হচ্ছিল, মানুষকে হারানো যায়, ঘরকে পোড়ানো যায়; কিন্তু যে স্বপ্ন অন্যের জীবনে আলো জ্বালাতে শেখায়, তাকে কোনো আগুন শেষ করতে পারে না। সেদিন গ্রামের কেউ জানত না, এই আগুনই একদিন অলকার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়ে থাকবে।

আগুনের ঘটনার পর কুসুমতী পাড় যেন আরও নীরব হয়ে গেল। অলকার পোড়া কুঁড়েঘরটা দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কেউ যেন অর্ধেক গল্প লিখে কলম থামিয়ে দিয়েছে। তবু ভোর হলে সে আগের মতোই নদী থেকে জল তুলে আনছে।
অলকা পোড়া উঠান ঝাঁট দেয়। তারপর অশ্বত্থগাছের নিচে বসে বই খুলে অপেক্ষা করে অনাবিল নক্ষত্রের। অপেক্ষারও যে একটা নিজস্ব বিশ্বাস আছে তা অলকার দিকে তাকালেই বোঝা যায়।

চার.
সেই সপ্তাহের এক সকালে অচেনা একজন বৃদ্ধ গ্রামে এলেন। ধবধবে সাদা ধুতি, কাঁধে পুরোনো ঝোলা, চোখে মোটা কাচের চশমা। তিনি সরাসরি অশ্বত্থগাছের নিচে এসে দাঁড়ালেন। দেখলেন, মাটির ওপর গোল হয়ে বসে কয়েকটি শিশু অক্ষর লিখছে, আর মাঝখানে বসে অলকা ধৈর্য নিয়ে তাদের ভুল শুধরে দিচ্ছে। বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। পড়া শেষ হলে তিনি মৃদু হেসে বলেন, ‘তুই কি অলকা?’
অলকা অবাক হয়ে মাথা নাড়ল।
বৃদ্ধ বললেন, ‘আমি অচিন্ত্য সেন। সারা জীবন শিক্ষকতা করেছি। এখন আর কেউ পড়তে ডাক পাড়ে না। শুনলুম, এই গাঁয়ে নাকি একটা মেয়ে গাছতলায় স্কুল খুলেছে। তাই দেখে যেতে এলুম।’

সেদিন বিকেলটা গল্পে কেটে গেল। অচিন্ত্যবাবু শিশুদের পড়া শুনলেন। অলকার স্বপ্নের কথা শুনলেন। পোড়া ঘরের গল্পও জানলেন। সব শুনে তিনি অনেকক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘যে আগুন ঘরকে পোড়ায়, সেই আগুন মানুষকেও পোড়ায়। কিন্তু তোর চোখে আমি ছাই দেখছি না, আগুন দেখতাছি। এই আগুন নিভতে দেওয়া যাইবে না।’
পরদিন থেকে অচিন্ত্যবাবু নিয়ম করে আসতে লাগলেন। কেউ বাংলা পড়ত তাঁর কাছে, কেউ অঙ্ক। অলকা ছোটদের হাতে অক্ষর তুলে দিত আর তিনি বড়দের স্বপ্ন দেখাতে শেখাতেন। ধীরে ধীরে আশপাশের গ্রামের মানুষও খবর পেল। কেউ একটা মাদুর এনে দিল। কেউ পুরোনো বেঞ্চ। কেউ বই। কেউ খাতা-কলম। একজন কাঠমিস্ত্রি এসে বিনা পয়সায় বাঁশের খুঁটি পুঁতে ছোট্ট চালা তুলে দিল।
যে মানুষগুলো একদিন বলেছিল, ‘এতে কিছু হবে না’; তাদেরই কয়েকজন এক বিকেলে এসে নীরবে কাজ করে চলে গেল। অলকা কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করল না। ক্ষমা কখনো কখনো কথায় নয়, আচরণেই দেওয়া হয়। ছাই আগের মতোই সবকিছুর মাঝখানে ঘুরে বেড়ায়, এদিক-সেদিক।
বাচ্চারা বলে, ‘এ আমাদের স্কুলের পাহারাদার।’

শীত পেরিয়ে বসন্ত এল। অশ্বত্থগাছের ডালে নতুন পাতা গজাল। সেই পাতার ফাঁক দিয়ে এক বিকেলে সূর্যের আলো এসে পড়েছিল শিশুদের খাতার ওপর। অচিন্ত্যবাবু ধীরে ধীরে বললেন, ‘বুঝলি অলকা মা, একটা গাছ নিজের জন্য ছায়া দেয় না। অন্যকে বাঁচায় বলেই সে বড় হয়।’
অলকা কিছুই বলল না। শুধু আকাশের দিকে তাকাল। হয়তো বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বাবা-মায়ের কথা মনে পড়েছিল। হয়তো মনে পড়েছিল, একদিন সেও ভেবেছিল পৃথিবীতে তার আর কেউ নেই। ঠিক তখনই গ্রামের ডাকপিয়ন হাঁপাতে হাঁপাতে এসে একটি খাম বাড়িয়ে দিল। খামের ওপরে বড় অক্ষরে লেখা, ‘জেলা শিক্ষা উন্নয়ন পরিষদ’।
অলকা কাঁপা হাতে খামটা খুলল। ভেতরের চিঠি পড়ে তার চোখ স্থির হয়ে গেল। অচিন্ত্যবাবু চশমা পরে চিঠিটা পড়লেন। তারপর ধীরে ধীরে মুখে এক গভীর হাসি ফুটে উঠল। তিনি শুধু বললেন, ‘মা, মনে হচ্ছে কুসুমতীপাড়ের এই ছোট্ট আলো এবার অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাবে...।’

অলকা চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরে আছে। দূরে নদীর ওপরে তখন বিকেলের সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়ছে। আর অশ্বত্থগাছের ডালে বসে এক জোড়া শালিক ডেকে উঠল, যেন তারা জানিয়ে দিল দীর্ঘ অন্ধকারের পর ভোর সত্যিই এসে গেছে।
চিঠিখানা পড়ে প্রথমে অলকা কিছুই বলতে পারল না। কাগজের ওপর সরকারি সিলমোহর। অচিন্ত্যবাবু আবার ধীরে ধীরে পড়ে শোনাতে লাগলেন। কুসুমতী নদীর পাড়ে অশ্বত্থগাছের নিচে চলা সেই অবৈতনিক পাঠশালার কথা জেলা শিক্ষা উন্নয়ন পরিষদের এক কর্মকর্তা জানতে পেরেছিলেন। তিনি কয়েক সপ্তাহ আগে ছদ্মবেশে এসে শিশুদের সঙ্গে বসে পড়া শুনে গিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত হয়েছে, পাঠশালাটিকে একটি স্থায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রূপ দেওয়া হবে। জমি, ভবন, বই, বেঞ্চ, শিক্ষক, সবকিছুর দায়িত্ব নেবে পরিষদ। চিঠির শেষ লাইনটি ছিল, ‘যে আলো নিজে জ্বলে অন্যের পথ আলোকিত করে তাকে রক্ষা করা সমাজের দায়িত্ব।’

অলকা অনেকক্ষণ চিঠিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আস্তে করে নদীর দিকে মুখ তুলে বলল, ‘বাবা...মা...তোমরা কি দেখছ?’
তার গলার স্বর বাতাসের সঙ্গে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।

পাঁচ.
কয়েক মাসের মধ্যেই নদীর পাড়ে ছোট্ট একটি একতলা বিদ্যালয় দাঁড়িয়ে গেল। লাল টালির ছাদ। সামনে কৃষ্ণচূড়ার চারা। পাশে একটি ঘণ্টা। ফটকের ওপর সাদা পাথরে কালো অক্ষরে লেখা হলো, ‘কুসুমতী মুক্ত পাঠশালা’। নামটি দেখে অলকা চোখ বন্ধ করে চুপ করে। তার মনে হচ্ছিল, এ যেন শুধু একটি বিদ্যালয় নয়, তার বাবা-মায়ের অসমাপ্ত জীবনের ওপর দাঁড়িয়ে জন্ম নেওয়া নতুন ভোর।
অচিন্ত্যবাবু বললেন, ‘আজ থেকে এই বিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষিকা তুই।’
অলকা মাথা নত করে। তার চোখে জল। তবে এ জল আর দুঃখের নয়।

বিদ্যালয় খোলার দিন আশপাশের পাঁচটি গ্রামের মানুষ এসেছে। যে হরিপদ সরকার একদিন বলেছিলেন, ‘এই সব বন্ধ কর’; তিনিও এসেছেন। সবার সামনে এসে কাঁপা গলায় বললেন, ‘মা, মানুষ ভুল করে। তুই যদি পারিস, আমাকে ক্ষমা করে দিস।’
অলকা তাঁর পায়ে হাত দিয়ে বলল, ‘ক্ষমা চাইবেন না কাকা। আপনি না থাকলে হয়তো আমি বুঝতেই পারতাম না, স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে কতটা শক্ত হতে হয়।’
হরিপদ সরকারের চোখ ভিজে উঠল। সেদিন ছাইকে নতুন লাল কাপড়ের একটি ফিতা পরিয়ে দিয়েছিল বাচ্চারা। সে সারা দিন বিদ্যালয়ের উঠানে ঘুরে বেড়াল। যে শিশুরা প্রথম দিন অক্ষর লিখেছিল, তারা এখন ছোটদের হাত ধরে শ্রেণিকক্ষে নিয়ে যাচ্ছে। অলকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একে একে সবাইকে ভেতরে ঢুকতে দেখছে। হঠাৎ তার মনে হলো, ‘মানুষের জীবন বুঝি নদীর মতোই। কেউ উৎস দেখে না। সবাই শুধু দেখে, সে কত দূর গিয়ে অন্যকে জল দিতে পেরেছে।’

ছয়.
বছর গড়িয়ে গেল। এখন কুসুমতী মুক্ত পাঠশালা থেকে পড়ে অনেক ছেলেমেয়ে শহরে গেছে। কেউ শিক্ষক হয়েছে। কেউ চিকিৎসক। কেউ কৃষিবিজ্ঞান শিখে আবার গ্রামে ফিরে এসেছে। তারা যখনই অলকার সঙ্গে দেখা করতে আসে, প্রথমে বিদ্যালয়ে ঢোকে, তারপর অশ্বত্থগাছটার নিচে কয়েক মুহূর্ত নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ, তারা জানে, ইটের ভবনের আগে এই গাছের ছায়াতেই তাদের ভবিষ্যতের জন্ম হয়েছিল।

অনেক বছর পরে, এক শীতের ভোরে অলকা আর ঘুম থেকে উঠল না। মুখে ছিল অদ্ভুত প্রশান্তি। মনে হচ্ছিল, বহুদিনের ক্লান্ত পথিক অবশেষে নিজের বাড়ির পথ খুঁজে পেয়েছে। অশ্বত্থগাছের নিচেই তাকে সমাধিস্থ করা হলো। তার ইচ্ছাতেই কোনো বড় স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হয়নি। শুধু একটি ছোট্ট পাথরে খোদাই করা হলো, ‘যে আলো ভাগ করে, সে কখনো নিভে যায় না।’
তবে অরূপ আজও মাঝেমধ্যে কুসুমতী নদীর পাড়ে যায়। বিদ্যালয়ের ঘণ্টা বাজে। শিশুরা দৌড়ে আসে। হাসির শব্দে ভরে ওঠে চারদিক। অশ্বত্থগাছটি এখন অনেক বড় হয়েছে। তার ছায়া পড়ে বিদ্যালয়ের অর্ধেক উঠানজুড়ে। ছাই অনেক আগেই চলে গেছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না! অচিন্ত্যবাবুও নেই। অলকাও নেই। তবু বিকেলের শেষ আলো যখন গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে শিশুদের খাতার ওপর এসে পড়ে, তখন মনে হয়, কেউ একজন এখনো খুব ধৈর্য নিয়ে তাদের অক্ষর ঠিক করে দিচ্ছে।

অরূপ ওরফে কৃষিবিশেষজ্ঞ ছেলেটি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে অশ্বত্থগাছের নিচে। বাতাসে কদম ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসে। কুসুমতী নদী নীরবে বয়ে চলে। আর ছেলেটির মনে হচ্ছে, পৃথিবীতে কিছু মানুষ জন্মায় নিজের জন্য নয়; তারা আসে অন্য মানুষের জীবনে একটু আলো রেখে যেতে। সেই আলোই হয়তো একদিন কুয়াশার ওপার থেকে আমাদের বাড়ি ফেরার পথ দেখায়।