শহরের দেয়ালে পোস্টার লাগানোর কাজটা আমার বাবা করতেন।
কোন দলের পোস্টার, সেটা নিয়ে তাঁর খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না। যিনি টাকা দিতেন, তাঁর পোস্টারই লাগাতেন। কখনো লাল, কখনো সবুজ আবার কখনো নীল। কোনো পোস্টারে মুষ্টিবদ্ধ হাত, কোনো পোস্টারে ধানের শীষ, কোনো পোস্টারে দাঁড়িপাল্লা আর কোনো কোনো পোস্টারে শুধু একটা বড় মুখ।
বাবা বলতেন, ‘দেয়াল কারও না। যে আগে লাগায়, দেয়াল তার।’
আমি তখন কথাটার রাজনৈতিক মানে বুঝতাম না।
শুধু বুঝতাম, রাত হলে বাবার সাইকেলের পেছনে আঠার বালতি ঝুলত, হাতে থাকত পুরোনো ব্রাশ। আমি মাঝেমধ্যে সঙ্গে যেতাম।
শহরের অলিগলিতে রাতের একটা আলাদা গন্ধ আছে। স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, ড্রেনের পানি, চায়ের দোকানের শেষ ধোঁয়া আর পোস্টারের আঠা—সব মিলে অদ্ভুত একটা গন্ধ।
বাবা দেয়ালে পোস্টার লাগাতেন।
আমি নিচে দাঁড়িয়ে থাকতাম।
কখনো বলতাম, ‘বাবা, এই লোকটা কে?’
তিনি পোস্টারের দিকে তাকিয়ে বলতেন, ‘নেতা।’
‘কী করেন?’
‘রাজনীতি করেন।’
‘রাজনীতি কী?’
বাবা একটু হেসে বলতেন, ‘বড় হইলে বুঝবি।’
বড় হয়ে আমি সত্যিই বুঝেছিলাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর রাজনীতি আমার কাছে আর বাবার আঠার বালতির মতো নিরীহ ছিল না। রাজনীতি তখন মিছিল, স্লোগান, কমিটি, পদ, বিরোধ, রাতের ফোন, ফেসবুক পোস্ট, প্রেস রিলিজ আর ক্যাম্পাসের চায়ের দোকানের টেবিল হয়ে গেছে।
আমি একটা ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম। প্রথম দিকে খুব ভালো লাগত। মনে হতো, আমরা ইতিহাসের অংশ হয়ে যাচ্ছি।
দেশ বদলাব। অন্যায় ঠেকাব। মানুষের কথা বলব।
প্রথম মিছিলে হাঁটার সময় আমার বুক কাঁপছিল। সামনে বড় ভাইয়েরা স্লোগান দিচ্ছিলেন, আমরা পেছন থেকে গলা মেলাচ্ছিলাম।
সেদিন বাসায় ফিরে বাবা শুধু জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘খাইছিস?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’
তিনি আর কিছু বলেননি।
কয়েক দিন পর এক রাতে পোস্টার লাগাতে গিয়ে দেখি, একটা দেয়ালে আমাদের সংগঠনের পোস্টার লাগানো। তার ওপর আরেকটা সংগঠনের পোস্টার। তার ওপর আবার কারও হাতে লেখা, ‘এই দেয়ালটা কি মানুষের নয়?’
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে লেখাটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বাবা পেছন থেকে বললেন, ‘লাগা।’
আমি বললাম, ‘কী?’
‘তোদের পোস্টার।’
‘ওপরেই তো লেখা আছে।’
‘লেখা থাকলে কী হইছে?’
আমি ব্রাশে আঠা লাগালাম। কিন্তু পোস্টারটা লাগাতে পারলাম না। বাবা আমার হাত থেকে ব্রাশটা নিয়ে নিজেই লাগিয়ে দিলেন।
কয়েক মাস পর আমাদের সংগঠনের বড় একটা সমাবেশ হলো। আমি দায়িত্ব পেলাম ব্যানার আর পোস্টারের। সারা দিন দৌড়াদৌড়ি করে রাতের দিকে যখন বাসায় ফিরছি, ফোন এল। আমার এক বন্ধু বলল, ‘শুনছিস? তোর বাবার দোকানের সামনে ঝামেলা হইছে।’
বাবার নিজের কোনো দোকান ছিল না। তিনি একটা ছোট্ট স্টেশনারি দোকানের সামনে বসে মাঝেমধ্যে পোস্টার, ব্যানার আর সাইনবোর্ডের কাজ করতেন।
আমি দৌড়ে গেলাম। দেখলাম, দোকানের শাটার নামানো। সামনে বাবা বসে আছেন। মুখে রক্ত। আমি কিছু না বলে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম।
পরে জানতে পারলাম, স্থানীয় দুই পক্ষের পোস্টার নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল। বাবা মাঝখানে পড়ে গিয়েছিলেন।
ডাক্তার সেলাই দিতে দিতে বলেছিলেন, ‘বয়স হয়েছে। এসব ঝামেলায় থাকেন কেন?’ বাবা হেসেছিলেন।
‘স্যার, আমি ঝামেলায় থাকি না। ঝামেলা আমার কাছে আসে।’
সেদিন প্রথমবার বাবার ওপর রাগ করেছিলাম। হাসপাতাল থেকে বের হয়ে বলেছিলাম, ‘আর পোস্টারের কাজ করবেন না।’
তিনি চুপ করে ছিলেন।
আমি আবার বললাম, ‘শুনছেন?’
বাবা বললেন, ‘তুই রাজনীতি ছাড়বি?’
আমি বললাম, ‘না।’
‘তাহলে আমি কেন ছাড়ব?’
কোনো উত্তর দিতে পারিনি।
তারপর শহরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল। একটা আন্দোলন হলো। তারপর আরেকটা। ফেসবুকে সবাই বিপ্লবী। চায়ের দোকানে সবাই বিশ্লেষক। রাস্তায় সবাই নেতা। কেউ বলল, ‘এইবার সব বদলে যাবে।’ কেউ বলল, ‘কিছুই বদলাবে না।’
আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
আমাদের সংগঠনের কিছু ছেলে আন্দোলনে গেল। কিছু ছেলে আবার দূরে থাকল। কেউ বলল, সময় বুঝে চলতে হয়।
এক রাতে আমাদের গ্রুপে মেসেজ এল—
‘সকাল থেকে সবাই সাবধানে থাকবেন। পরিস্থিতি খারাপ।’
আরেকটা মেসেজ এল—
‘যাঁরা মাঠে থাকবেন, তাঁদের নাম লিখে পাঠান।’
আমি নিজের নাম লিখলাম।
বাবা তখন ঘুমাচ্ছিলেন।
ভোরে বের হওয়ার সময় দেখলাম তিনি জেগে আছেন। বললেন,
‘কোথায়?’
‘ক্যাম্পাসে।’
‘আজ যাস না।’
আমি হেসে বললাম, ‘কেন?’
‘ভালো লাগতেছে না।’
‘রাজনীতি করতে গেলে ভয় পেলে হয়?’
বাবা কিছু বললেন না। আমি বের হয়ে গেলাম।
সেদিন দুপুরে শহরের রাস্তায় অনেক মানুষ ছিল। স্লোগান ছিল। পুলিশ ছিল। দৌড়াদৌড়ি ছিল। কেউ পাথর ছুড়ছিল, কেউ পালাচ্ছিল, কেউ ভিডিও করছিল। আমি একটা গলিতে ঢুকে পড়েছিলাম। পেছনে কয়েকজন দৌড়ে আসছিল। আমি একটা বন্ধ দোকানের শাটারের পাশে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছিলাম। ঠিক তখন ফোন বেজে উঠল। বাবা।
আমি ধরিনি।
আবার ফোন।
তারপর আবার।
তৃতীয়বার ফোন ধরলাম।
ওপাশ থেকে বাবা শুধু বললেন, ‘তুই ঠিক আছিস?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’
‘মিথ্যা কইস না।’
আমি চুপ করে রইলাম।
তিনি বললেন, ‘বাসায় আয়।’
আমি বললাম, ‘পারব না।’
‘কেন?’
‘রাস্তা বন্ধ।’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বাবা বললেন, ‘তুই যে রাজনীতি করস, তাতে আমি কিছু বুঝি না। কিন্তু একটা কথা বুঝি—জীবিত মানুষ ছাড়া কোনো রাজনীতি হয় না।’
ফোন কেটে গেল।
সেদিন বিকেলে আমি আর মিছিলে ফিরিনি। কয়েক দিন পর পরিস্থিতি শান্ত হলো। আমাদের সংগঠনের কয়েকজন নতুন করে দায়িত্ব পেল। কেউ পদ পেল। কেউ পেল না। যারা আগে সামনে ছিল, তাদের কেউ কেউ হঠাৎ খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল। আমার নামও একটা তালিকায় ছিল।
ভেবেছিলাম, এবার হয়তো সত্যিই কিছু করার সুযোগ পাব। সন্ধ্যায় বাবা তালিকাটা দেখে বললেন,
‘তুই নেতা হইছিস?’
আমি বললাম, ‘এখনো না।’
‘তাহলে?’
‘দায়িত্ব পাইছি।’
বাবা মাথা নেড়ে বললেন, ‘দায়িত্ব আর নেতা—দুইটা আলাদা জিনিস।’
আমি হাসলাম।
‘আপনি এসব বোঝেন?’
বাবা বললেন, ‘দেয়ালে অনেক নেতার মুখ লাগাইছি।’
তারপর একটু থেমে যোগ করলেন, ‘কয়জন মানুষ ছিল, আর কয়জন শুধু পোস্টারে ছিল—এইটা বুঝতে আমার বেশি পড়াশোনা লাগে নাই।’
কয়েক মাস পর বাবার শরীর খারাপ হলো। ডাক্তার বললেন, বেশি কাজ করা যাবে না।
আমি তখন ব্যস্ত। সভা আছে। মিটিং আছে। একটা নতুন কমিটি হবে। একজন বড় ভাইকে নিয়ে পোস্ট লিখতে হবে। একটা প্রেস রিলিজ দিতে হবে। ফেসবুকে একটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, তার জবাব দিতে হবে। বাবা একদিন বললেন, ‘কাল আমারে হাসপাতালে নিয়ে যাবি?’
আমি বললাম, ‘কাল পারব না। পরশু যাই?’
তিনি বললেন, ‘আচ্ছা।’
পরশুদিনও আমি পারিনি। তার পরের দিনও না। চতুর্থ দিন সকালে মা ফোন করে বললেন, ‘তোর বাবা হাসপাতালে ভর্তি।’
আমি ছুটে গেলাম।
বাবা তখন খুব দুর্বল। আমাকে দেখে বললেন, ‘এত দেরি করলি কেন?’
আমি বললাম, ‘কাজ ছিল।’
তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘রাজনীতি?’
আমি মাথা নিচু করলাম। তিনি আর কিছু বললেন না।
বাবা মারা গেলেন তিন দিন পর।
কোনো নেতা এলেন না। কোনো সংগঠন বড় ব্যানার লাগল না। কোনো প্রেস রিলিজ হলো না। শুধু পাশের দোকানের রহিম চাচা এলেন। যে রিকশাওয়ালা বাবার কাছ থেকে মাঝেমধ্যে বাকিতে চা খেতেন, তিনি এলেন। আর এলেন কয়েকজন মানুষ, যাঁদের নাম আমি কোনো দিন জানতাম না।
একজন বৃদ্ধ এসে আমাকে বললেন, ‘তোর বাবা আমার মেয়ের বিয়ের ব্যানার বানাইছিল। টাকা কম ছিল। পরে দিতে কইছিল। উনি আর টাকা নেন নাই।’
আমি কিছু বলতে পারিনি।
বাবার মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর তাঁর পুরোনো ঘর পরিষ্কার করছিলাম। এক কোণে একটা কাঠের বাক্স। ভেতরে পুরোনো ব্রাশ, আঠার শুকনা পাত্র, কিছু ছেঁড়া পোস্টার। সবচেয়ে নিচে একটা পোস্টার পেলাম। পোস্টারটা বহু পুরোনো। কাগজ হলুদ হয়ে গেছে। মাঝখানে একজন নেতার ছবি। নিচে বড় অক্ষরে লেখা—‘মানুষের জন্য রাজনীতি।’
আমি পোস্টারটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকলাম। তারপর উল্টে দেখি, পেছনে বাবার হাতের লেখা। মাত্র একটা লাইন।
‘মানুষটা কোথায়?’
আমি জানি না, বাবা কখন লিখেছিলেন। কোন নেতার পোস্টারের পেছনে লিখেছিলেন। কেন লিখেছিলেন। হয়তো কোনো এক গভীর রাতে, আঠা শুকানোর অপেক্ষায় বসে। হয়তো তখন আমি ছোট। হয়তো তখনো আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করতাম—
‘বাবা, রাজনীতি কী?’
পরদিন বিকেলে শহরের একটা দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেয়ালটা নতুন করে রং করা হয়েছে। কেউ এখনো কোনো পোস্টার লাগায়নি। আমার ব্যাগে কয়েকটা পোস্টার ছিল। আমাদের সংগঠনের। নতুন কর্মসূচির। নতুন স্লোগানের। আমি একটা পোস্টার বের করলাম। দেয়ালের দিকে তাকালাম। তারপর ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেললাম।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছেলে বলল,
‘ভাই, লাগাবেন না?’
আমি বললাম, ‘আজ না।’
‘কেন?’
আমি দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘দেয়ালটা একটু খালি থাক।’
ছেলেটা কিছু বুঝল না।
আমি হাঁটতে শুরু করলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি, দেয়ালের একেবারে নিচে পুরোনো আঠার দাগ। তার ওপর বহু বছরের পোস্টারের ছেঁড়া কাগজ। কোনো এক সময় সেখানে অনেক বড় একজন নেতার মুখ ছিল। এখন মুখটা নেই। শুধু চোখের একটা অংশ দেখা যায়। আমার মনে হলো—
রাজনীতিতে সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিস হয়তো নেতার পতন নয়। নেতার পোস্টার ছিঁড়ে যাওয়ার পরও দেয়ালে থেকে যাওয়া সেই চোখ। কারণ, দেয়াল ভুলে যায় না। মানুষও না। শুধু আমরা নতুন পোস্টার লাগিয়ে ভাবি, পুরোনো গল্পটা শেষ হয়ে গেছে।