তেইশে শ্রাবণ

হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়ে আমার মহাপণ্ডিত বন্ধু লিয়াকত বেশ নাক সিটকাত। বিশেষত হিমু সিরিজ পড়ার পর একদিন বিরক্ত মুখে বলেছিল,
—ধুর ভাই, কী ছাতার মাথা লেখে এই লোক!

যাহোক, সেই হিমু সিরিজ এখন কাল্ট ক্ল্যাসিক। ‘মিসির আলী সিরিজ’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘নন্দিত নরকে’ ইত্যাদি পড়ার পর আমার সেই বন্ধুর কাছে হুমায়ূন আহমেদ এখন প্রায় কাফকা লেভেলে চলে গেছেন।
তেমনি আমিও যখন লিখতাম, সাহিত্য পাতার সম্পাদক মহাশয় আমার লেখা পড়ে বলত,
—ধুর ভাই, কী ছাতার মাথা লেখে এই ছেলে!
কিন্তু জানি, আমার লেখাও একদিন কাল্ট ক্ল্যাসিক হবে। চাল-ডাল সেদ্ধ, ধোঁয়া ওঠা ভাতের পর্ব পেরিয়ে একদিন আমার লেখাও বিরিয়ানির যুগে প্রবেশ করবে। আমিও জন স্টেইনবেক, হারুকি মুরাকামি কিংবা পাওলো কোয়েলহোর মতো হয়ে উঠব।
হুমায়ূন আহমেদ যেমন এক বইয়ের উৎসর্গপত্রে লিখেছিলেন—
‘গুলতেকিনকে’।
আমিও একদিন লিখব—
‘মৃণালিনী, নতুবা আর কাকে?’

কিন্তু একটা বিস্তর সমস্যা হয়ে গেছে। আমি প্রায় নব্বই শতাংশ মারা গেছি। প্রায় তিন বছর হলো। বিষয়টা ভয়ংকর হওয়ার কথা। অথচ বেশ উপভোগ করছি। মরে যাওয়ার কারণে আমার মনে কোনো ব্যথা হয় না। হোস্টেলের খাবার সামনে দিলে শরীরে ক্ষুধা জাগে না। আয়নার সামনে দাঁড়ালে মুখে দাড়ি বাড়ে না। কেউ আমাকে দেখে না। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, আমি নিজেকে দিব্যি দেখতে পাই।

যখন বেঁচে ছিলাম, ছোটবেলায় নিয়মিত স্কুলে যেতাম। কলেজে ওঠার পর নাম ডাকার সময় সর্বোচ্চ ফ্রিকোয়েন্সিতে ‘ইয়েস স্যার’ বলে নিজের অস্তিত্বের জানান দিতাম। কোনো অ্যাবসেন্ট ফি আসত না।
এখনো প্রতিদিন হাজিরা দিই। তবু কেন যেন অ্যাবসেন্ট ফি আসে। আমি বোধ হয় বেঁচে নেই। তাই আমায় ওরা দেখতে পায় না।
ওরা হয়তো দেখতে পায় না বৃষ্টি, লোডশেডিং, সাত মাথার ভিড়—অথবা একটা মানুষ ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে তাকে।

আমার প্রথম মরতে ইচ্ছে হয়েছিল যখন বয়স মাত্র বিশ। নির্বিষ জীবনযাপনের মাঝখানে একদিন দেখলাম ‘দ্য ট্রুম্যান শো’। দাঁড়ান। মুভিটার গল্পটা একটু বুঝিয়ে বলি।
ট্রুম্যান বারব্যাংকের জীবন দেখতে একেবারে সাধারণ। সে থাকে সুন্দর, শান্ত একটা শহরে, সিহ্যাভেন। বাড়ি আছে, স্ত্রী আছে, চাকরি আছে, বন্ধু আছে, প্রতিবেশী আছে। প্রতিদিন একই রুটিন—ঘুম থেকে ওঠা, অফিসে যাওয়া, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, বাড়ি ফেরা। কিন্তু একটা ভয়ংকর ব্যাপার আছে। ট্রুম্যান ছাড়া পৃথিবীর সবাই জানে, তার জীবন আসলে একটা টেলিভিশন শো। জন্মের পর থেকেই তার প্রতিটি মুহূর্ত গোপনে ক্যামেরায় ধারণ করা হচ্ছে। স্ত্রী, বন্ধু, বাবা-মা, প্রতিবেশী—প্রায় সবাই অভিনেতা। আর সিহ্যাভেন আসলে একটা বিশাল স্টুডিও সেট। ট্রুম্যান জানে না, তার প্রতিটি মুহূর্ত পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ দেখছে। মুভিটা দেখে আমার মনে হলো—
জীবনটা যদি একটা ট্রুম্যান শো হয়, মন্দ কী?

তাই একটা চমৎকার কাজ করলাম। মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম। প্রতিটি আইটেম গেল। কার্ড গেল। টার্ম গেল। প্রফ এল। সাগরের মতো বিশাল একটা সিলেবাস সামনে রেখে আমি সিহ্যাভেনের বাসিন্দা হয়ে গেলাম। সবকিছু সাজানো। সবকিছু নির্দিষ্ট। রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার। একই রাস্তা। একই ক্লাস। একই মুখ। একই হাজিরা। একই অ্যাবসেন্ট ফি। আমি একটু একটু করে পড়ছি। আর তারও বেশি সব ভুলে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে, রবিবার থেকে বৃহস্পতিবারের একটা লুপে আটকে আছি। সেই লুপে প্রতিদিন একটু একটু করে মারা যাচ্ছি। শরীরের ভেতর যেন মাইক্রোগ্রাম করে আর্সেনিক বাড়ছে। নাকি সায়ানাইড? ঠিক বুঝতে পারছি না।
তারপর এল সেই রাত। সারা রাত অ্যানাটমি পড়লাম। সকালে ভাইভা বোর্ডে গিয়ে বুঝলাম, মানুষের শরীর সম্পর্কে আমার যথেষ্ট ধারণা হয়নি। কিছুই পারলাম না। হোস্টেল রুমে ফিরে নিজেকে মনে হলো ভিয়েতনাম যুদ্ধে হারা এক সৈনিক। রাতে ঘুম হলো না। তাই সে রাতে আরেকটা মুভি দেখলাম, ‘টেক্সি ড্রাইভার’।

ট্রাভিস বাইকেল, ছাব্বিশ বছর বয়সী এক ভিয়েতনাম যুদ্ধের সৈনিক। নিউইয়র্কে থাকে। ঘুম হয় না। ভয়াবহ ইনসমনিয়া। তাই রাতে ট্যাক্সি চালায়। অন্ধকার রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। দিনে একা থাকে। কিন্তু আসল ব্যাপারটা অন্য জায়গায়। ট্রাভিস ভীষণ একা।
সে মানুষের মধ্যে আছে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে নেই। মুভিটা শেষ হওয়ার পর ল্যাপটপের স্ক্রিনে নিজের মুখ দেখলাম। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। মনে হলো, ট্রাভিস বাইকেল আর আমার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। শুধু সে ট্যাক্সি চালায়। আমি মেডিক্যাল কলেজে পড়ি। যে কখনো লেখক, কখনো সিনেমার ডিরেক্টর হতে চায়। হতে চায় মার্টিন স্কোরসেস, স্টিভেন স্পিলবার্গ, আকিরা কুরোসাওয়া কিংবা এই উপমহাদেশের সত্যজিৎ রায়, জহির রায়হান।

এই পর্যন্ত লিখে বোর্ড থেকে আঙুল সরিয়ে নিলাম। লেখাটা কলেজ ম্যাগাজিনের জন্য একটু বেশি সেন্টিমেন্টাল হয়ে যাচ্ছে না? মাথায় আর কিছু আসছে না। শেষবার লিখেছিলাম মেডিক্যালে ভর্তি হওয়ার আগে। প্রায়ই পত্রিকায় লিখতাম। এখন আর কলমে কিংবা কি–বোর্ডে—কোথাও লেখা হয়ে ওঠে না। কিন্তু ডেডলাইন কাল। কিছু একটা লিখতেই হবে। ভালো লাগছে না। হাত বাড়িয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা নামিয়ে দিলাম। সটান হয়ে ফোন হাতে শুয়ে পড়লাম বিছানায়। তারপর ঢুকে গেলাম রিলসের জগতে।
একটা রিলস। তারপর আরেকটা। তারপর আরও একটা। একসময় মনে হলো, আমি আর রিলস দেখছি না। রিলস আমাকে দেখছে। একই মুখ। একই হাসি। একই ধরনের মানুষ। একই ধরনের জীবন। একই ধরনের মৃত্যু। আমি স্ক্রল করছি। কিন্তু কোথাও পৌঁছাতে পারছি না। তাও স্ক্রল করতেই থাকলাম। হঠাৎ বুঝতে পারলাম, আমি আটকে গেছি। একটা লুপে। রিলসের লুপে। না, রবিবার থেকে বৃহস্পতিবারের সকাল সাতটার ক্লাসের লুপে। নাকি দুটো একই জিনিস? একই রাস্তা। একই সকাল। সকালে ক্লাস নিচ্ছেন ডেড পয়েট সোসাইটি থেকে উঠে আসা একজন প্রফেসর। শুধু প্রতিবার মনে হয়, কিছু একটা বদলে গেছে। এই জগৎটা সত্যি তো? নাকি কেউ আমার চোখের সামনে একটা বাস্তবতা চালিয়ে দিচ্ছে? আমি ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’-এর কোনো এক চরিত্র। অথবা ‘শাটার আইসল্যান্ড’-এর কোনো একজন রোগী নাকি ‘আমেরিকান সাইকো’-এর কোনো একজন মানুষ, যে এখনো বুঝতে পারেনি সে কতটা পাগল। মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমাকে কেউ ধরতে আসছে।
কে জানি না। কেন জানি না। শুধু বুঝতে পারি, আমাকে পালাতে হবে।
পালাতে পালাতে চিৎকার করে বললাম, ‘না! আমি “পথের পাঁচালী”র অপু নই। আমি অপুর সংসারের অপু। আমার অপর্ণা মারা গেছে।’

আরও পড়ুন

অদ্ভুত ব্যাপার, আমি তাও কাঁদছি না। বরং খুশি। অনেক দিন ধরে আমার টেবিলের ড্রয়ারে একটা উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি পড়ে ছিল। গল্পটা এগোচ্ছিল না। কারণ, নায়িকা বেঁচে ছিল। তাই তাকে মেরে ফেলেছি। গল্পের নায়িকা অপর্ণা মারা গেছে। গল্পটা জীবিত। নায়িকা মৃত। গল্পটা এবার এগোবে। কিন্তু সমস্যা হলো, নায়িকাকে মেরে ফেলার পর থেকেই আমি নিজেই যেন গল্পের একটা চরিত্র হয়ে গেছি। আর এখন মনে হচ্ছে, কেউ একজন আমার গল্পটা লিখছে। হয়তো সে-ই আমাকে ধরতে আসছে। দরজার বাইরে সে। দরজায় ঢমঢম শব্দ হচ্ছে। আমি চমকে উঠলাম। আবার শব্দ। এবার আরও জোরে।
ঢম।
ঢম।
ঢম।
আমার ঘর কাঁপছে। কেউ যেন দরজায় লাথি মারছে। আমি চিৎকার করে বললাম,
—আমি কিছু করিনি। আমাকে ছেড়ে দিন।
ওপাশ থেকে কেউ বলল,
—না। তুমি পাবলিক হেলথের সংজ্ঞা পারোনি।
আমি চুপ।
—এই ছেলে, দরজা খোলো।
আরেকটা শব্দ।
—নিউপ্লাসিয়ার সংজ্ঞা বলো।
কেউ আমাকে ঝাঁকাচ্ছে। পৃথিবী দুলছে। দেয়াল দুলছে। বিছানা দুলছে। আমি চোখ খুললাম।
আমার রুমমেট আমার কাঁধ ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
—এই! উঠ।
আমি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
—কী হয়েছে?
—ডাইনিংয়ে খাবার শেষ হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি আয়।
আমি উঠে বসলাম। ঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত অনেক হয়েছে। টাইমলি না গেলে খাবার শেষ হয়ে যায় ডাইনিংয়ের।

ফোনে রিলসের ভিডিও থেমে আছে। রিলস দেখতে দেখতে কখন চোখ লেগে এসেছিল বুঝতেই পারিনি। রুমমেট বের হয়ে গেছে। বারান্দা দিয়ে দেখলাম বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। শ্রাবণ মাসের হেঁয়ালি বৃষ্টি। মুখ ধুতে গেলাম। আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ নিজের দিকে তাকিয়ে রইলাম। দাড়ি একটু বেড়েছে। অবাক হলাম। আমি তো ভেবেছিলাম, মারা গেছি।

ডাইনিংয়ে বসে ভাত খেতে খেতে ভাবতে লাগলাম, কলেজ ম্যাগাজিনের জন্য কী লেখা যায়? হঠাৎ মাথায় একটা গল্প এল। একজন ছেলে। সে মনে করে নিজে মারা গেছে। মনে করে একটা লুপের মধ্যে আটকে আছে। মনে করে কেউ তাকে অনুসরণ করছে। মনে করে তার নিজের লেখা গল্পের একটা চরিত্র তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সৃজিত মুখার্জির ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর মতো। প্রবীর রয় খুনিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে থাকবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে, খুনি প্রবীর রয় নিজেই।
মনে মনে হাসলাম। গল্পটা মন্দ না। ভাতের শেষ লোকমাটা মুখে দিলাম। মনে হলো, গল্পটার নাম দেওয়া যায়—‘লুপ’।
না।
‘তেইশে শ্রাবণ’।
ঠিক তখন পাশের টেবিল থেকে কেউ বলল, ‘নাইন জিরো ফাইভ, তোমার অ্যাবসেন্ট ফি এসেছে।’
আমি মাথা তুললাম। লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে নেই। অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলছে।
আমি চুপ করে রইলাম। হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করলাম, আমি হোস্টেলের ডাইনিং হলে নেই। আমি শশাঙ্ক জেলখানার ডাইনিংয়ে খাবার খাচ্ছি। খাবারে মৃত তেলাপোকার পা। চারপাশে কয়েদি। আর আমি মেডিক্যাল ক্যাডেট নাইন জিরো ফাইভ নই। আমি..... আমি। আমি কে? আমি ‘শশাঙ্ক রেডাম্পশন’ মুভির একজন কয়েদি।
অথবা—
হয়তো আমি এখনো ঘুমিয়ে আছি। স্বপ্ন দেখছি। নাকি মেডিক্যালের তাড়নায় পাগল হয়ে গেছি। হয়তো আমি কোনো গল্পের ভেতরে। হয়তো কেউ একজন এই মুহূর্তে আমার গল্পটা লিখছে। আর হয়তো—সে আমার চেয়েও আগে জানে, পরের লাইনে কী লেখা হবে।

শিক্ষার্থী, আর্মি মেডিক্যাল কলেজ, বগুড়া