গণতন্ত্রের অপূর্ণতার উত্তর ‘নেতা জনতা ও রাজনীতি’ বইয়ে আছে কী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘নেতা জনতা ও রাজনীতি’

রাজার নীতিই হলো রাজনীতি, কিংবা বলা যায় সব নীতির ওপরে হলো রাজনীতি। যে সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা হোক না কেন, এ বিষয়টাই জটিল। রাজনীতির নির্দিষ্ট কোনো সীমারেখা নেই। তবু এটির আলাদা একটা জগৎ আছে, আলোচনা–সমালোচনা আছে, ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, সামাজিক, জাতীয়, আন্তর্জাতিকসহ নানা বিষয় এখানে যুক্ত থাকে।

রাজনীতির নানা চুলচেরা বিশ্লেষণ নিয়ে লেখক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন ‘নেতা জনতা ও রাজনীতি’ বইটি। বইয়ের লেখা বর্তমান সময় থেকে অনেক আগে ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে হলেও রাজনীতির মৌলিক পাঠ্য কিংবা বিষয়বস্তু বিবেচনা করলে আলোচ্য বিষয়গুলো বর্তমান সময়ের সঙ্গে একই গতানুগতিক ধারায় মনে হবে। প্রচলিত কথায় যেমন বলা হয়, ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হয়, তেমনি রাজনীতির নীতিও পুনরাবৃত্তি হয়। কেউ বিশ্বাস করে আবার কেউ করে না, তবু রাজনীতি আর আপন বৈশিষ্ট্যে রাজ্যের নীতি মেনে নিজস্ব পরিবেশ তৈরি করে নেয়।

এ বইয়ে লেখক রাজনৈতিক কোনো ঘটনা, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক জীবন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার গুণকীর্তন করেননি; যা করেছেন, তা হলো ইতিবাচক ও নেতিবাচক মিলিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা। একজন সাধারণ নাগরিক থেকে সমাজের সব স্তরের লোকের যা করা সাধারণ ব্যাপার ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু পরিবেশ–পরিস্থিতির কারণে কিংবা অন্য যেকোনো কারণেই হোক, সব দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক আলোচনা–সমালোচনা করার মতো মনমানসিকতা আর ইচ্ছা, আগ্রহ সমানভাবে সবার মনে জায়গা করে নেয় না। যেকোনো দেশের শাসনব্যবস্থা, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, বিচারব্যবস্থা, ন্যায়নীতি, জাতিগত বৈশিষ্ট্য দেখে বোঝা যায়, সে দেশের জনগণ ঠিক কতটা উন্মুক্ত রাজনৈতিক আলোচনায় যুক্ত থাকতে পারে।

লেখক তাঁর লেখায় সেই বর্তমান সময়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ের উল্লেখযোগ্য নেতার নেতৃত্ব, চিন্তা, কার্যক্রম নিয়ে নিরপেক্ষ আলোচনা করেছেন। ওনার আলোচনায় স্থান পেয়েছে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জিয়াউর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, মেজর ডালিম, ইয়াহিয়া খান, টিক্কা খান, জিন্না হক, কর্নেল আবু তাহের, খন্দকার আহমেদ প্রমুখ ব্যক্তির রাজনৈতিক আলোচনা। এ ছাড়া বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ–পরবর্তী শাসনব্যবস্থা, সেনাশাসন, স্বৈরশাসন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ইস্যুও সমালোচনায় আলোচিত হয়েছে।

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সৃষ্টিতে আসলে নামের সঙ্গে বাস্তবতার ঠিক কোন কোন জায়গায় খুঁত রয়ে গেছে, কোথায় নেতার অবহেলার দৃশ্য লক্ষ করা যায়—সেসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে বিশ্লেষণ করে এ বইয়ের পাতায় পাতায় বিস্তারিত উঠে এসেছে। লেখকের আলোচনার বিষয়বস্তু পড়লে বোঝা যায়, হয়তো বেশির ভাগ নেতা নিজ নেতৃত্বে আর্থিকভাবে লাভ হয়—এমন পুঁজিবাদ বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জনগণের চাপে, তাদের চিন্তা, আগ্রহ, আত্মত্যাগ আর মনমানসিকতার কারণে গণতান্ত্রিক পরিবেশ–ব্যবস্থা চালু রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। সে কারণে দেশে বারবার সরকার, নেতা, শাসনকর্তা এসেছে আর গেছে; কিন্তু গণতন্ত্র পুরোপুরি স্থাপিত হয়নি। গণতন্ত্র আর উন্নত সমাজব্যবস্থা, যেখানে সমাজের প্রতিটি মানুষ সমান অধিকার আর সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারবে, এমন নীতি বাস্তবায়ন ও প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক যুদ্ধ, বিদ্রোহ ও কোটি মানুষের প্রাণ গেছে এবং এখনো যাচ্ছে। দিন শেষে মানুষ স্বাধীনভাবে স্বাধীনতা পাওয়ার আশায় জন্ম থেকে জীবন যাপন করে মৃত্যুবরণ করে ফেলছে, তবু সে প্রকৃত স্বাধীন হতে পারছে না।

এত এত লোকজনের মধ্যে যদি এক-দুজন সম্পর্কে কিছুটা বলি, যাঁদের নেতৃত্ব, কাজ, চিন্তা নিয়ে লেখক আলোচনা ও সমালোচনা করেছেন। তাহলে বলতে হয় মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জিয়াউর রহমান আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে। মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সাধারণ জীবন যাপন করতেন, সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতেন, সর্বসাধারণের ওপর থেকে সব ধরনের জুলুম–অত্যাচার দূর করার জন্য আমৃত্যু আন্দোলন আর লড়াই করে গেছেন। নির্দিষ্ট ধর্ম নিয়ে ওনার সঙ্গে যুক্ত করে সব সময় আলোচনা হলেও বলা যায় তিনি মানুষের ধর্মকে সর্বদা গুরুত্ব দিয়েছেন। মানুষের মুক্তির জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।

জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকা একজন ব্যক্তি, যিনি হয়তো নিজে রাজনীতিতে আসবেন বলে ঠিক করেননি। কিন্তু পরিবেশ আর পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে তাঁকে রাজনীতিতে প্রবেশ করতে হয়েছে এবং তিনি সাহসের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মোকাবিলা করেছেন। ওনার বিভিন্ন কার্য নিয়ে পক্ষে–বিপক্ষে নানা আলোচনা–সমালোচনা থাকলেও সাহসিকতার জন্য রাজনৈতিক ইতিহাস তাঁকে মনে রেখেছে এবং রাখবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও দীর্ঘদিন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরিবেশ–পরিস্থিতি, জনগণের চাওয়া আর ইতিহাসের প্রভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ওনার উপস্থিতি দীর্ঘদিন থেকে গেছে। ওনার কর্মকাণ্ড, নেতৃত্ব, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা–সমালোচনা থাকতে পারে, পক্ষে–বিপক্ষে বলার মতো মতামতও আছে; তবু এই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বীকার করার মতো বাক্যও ওনার জীবনে রয়েছে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের জনগণের দুঃখ–দুর্দশা আর পূর্ণ মুক্তির জন্য কোনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই উল্লেখযোগ্যভাবে পুরোপুরি কাজ করেনি, কিংবা করার পরিবেশ ছিল না। জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট থেকে নানা বাধা সৃষ্টি করে তা হয়তো রুখে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন কিংবা পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের সাহায্য–সহায়তা আর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, কোথাও ইতিবাচক আর কোথাও নেতিবাচক আলোচনা আসবে। তবু দিন শেষে বলতে হবে বাংলাদেশের জনগণ তার স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ এখনো পায়নি। বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশের মতো এ দেশের জনগণও বারবার নানা আন্দোলন–সংগ্রাম আর লড়াই করে গেছে, যাচ্ছে ও ভবিষ্যতেও হয়তো যাবে, নিজের প্রকৃত অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে।

স্বরবৃত্ত প্রকাশনীর এ বইয়ের ৪৪ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখক ‘একুশের রাজনীতি’ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘ইতিহাস ভূগোলের চেয়ে শক্তিশালী, সে পুরাতন ভূগোল কেটে নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি করে দিয়েছে। তাই ভূগোলকে নয়, মানতে হবে ইতিহাসকে।’ তাঁর লেখা পড়েই বলতে হয় যে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়। তাই সঠিক ইতিহাস জানতে হয়, মানতে হয়, সম্মান করতে হয়। যেকোনো উপায় অবলম্বন করে হলেও ইতিহাস নষ্ট করা যাবে না। প্রকৃতির তীব্র শক্তি ঠিক সময়ে সঠিক ইতিহাস বের করে আনে। রাজনীতির যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা এখনো বিশ্বে চলমান। সে যুদ্ধের জয়–পরাজয় নিয়ে যেকোনো দেশের ভৌগোলিক রেখার পরিবর্তন হয়, যা অতীত থেকে এখন আছে আর ভবিষ্যতেও থাকবে। ভূগোল ঠিক না হলেও ইতিহাস অবশ্যই ঠিক হয়। সমস্যা শুধু সব সময় চেষ্টা থাকে প্রকৃত ইতিহাস ধামাচাপা দেওয়ার।

‘মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি’ প্রসঙ্গে বইয়ের ৫৪ পৃষ্ঠায় লেখক বলেছেন, ‘যখন আঘাত আসে তখন দেশের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত যে কতটা সামান্য, কতটা অসহায় তা ধরা পড়ে গেছে একাত্তরে।’

এ থেকে বোঝা যায়, যখন জাতীয় সমস্যা দেখা দেয়, তখন স্বাভাবিক জীবনে সুখে থাকা ধনী, মধ্যবিত্তরাও অসহায় হয়ে পড়ে। তখন গরিব, সাধারণ মানুষেরাই সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসে। যেমন মুক্তিযুদ্ধের সময় শহরের অনেক লোকজন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপত্তার জন্য গ্রামে গরিব পরিবারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পেছনে সাধারণ খেটে খাওয়া গরিব লোকদের অবদান অনেক রয়েছে। যদিও স্বাধীন হওয়ার পর সেসব ইতিহাস বেশির ভাগ সময় অবহেলা করা হয়। তবু ইতিহাস তার নিজের মতো বারবার প্রকাশিত হয়।

রাজনৈতিক আলোচনা নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে, এ বইটা তাঁদের জন্য। পক্ষে–বিপক্ষের চিন্তা বাদ দিয়ে যাঁরা নিরপেক্ষ আলোচনা করতে পছন্দ করেন, এ বইটি অবশ্যই পড়া উচিত। কোনো ব্যক্তির সমালোচনা করা মানেই যে তাঁর সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তা করা, নেতিবাচক মানুষরূপে তাঁকে সমাজে উপস্থাপন করা, বিষয়টা আসলেই সে রকম নয়। সমাজ, দেশ আর প্রকৃতির স্বার্থে যাঁরা কাজ করে তাঁরা আলোচিত, সমালোচিত হবেন, এটাই স্বাভাবিক। তবে কোনো ব্যক্তির কিংবা ঘটনার সমালোচনা করতে গেলে ঠিক কোন বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হয়, কোন বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন করে উত্তর বের করতে হয়, বিশেষ করে রাজনীতিতে জড়িত কোনো ব্যক্তির বা ঘটনায় নিজের মতামত নেওয়ার ক্ষেত্রে আসলে কী কী বিষয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কোন কোন প্রেক্ষাপট জড়িত থাকতে পারে ও থাকে ইত্যাদি সম্পর্কে লেখক এ বইয়ে প্রতিটি পাতায় নানা তথ্য–উপাত্ত আর বিশ্লেষণ করেছেন।

দিন শুরু হয় সূর্যের আলো দিয়ে আর রাত শুরু হয় সূর্য ডোবার মাধ্যমে। সূর্য ডুবে আলো চলে গেলেও এই জগতের অনেক কাজ অন্ধকারেও চলমান থাকে। মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্ব—এই শৃঙ্খলা নানাভাবে টিকে আছে, টিকে থাকবে। মানুষের বসবাস নিয়ে গড়ে ওঠে সমাজ, সে সমাজ থাকে দেশের অভ্যন্তরে, আর দেশ হলো জাতীয় বিষয়। বিভিন্ন জাতির জাতীয়তা নিয়ে গড়ে ওঠে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। এত কিছুর মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে রাজনীতি। যে নীতির কারণেই যুগ যুগ ধরে নানা ইতিহাস রচিত হয়ে আসছে, যার মূল প্রেক্ষাপট মানুষ, আর মানুষেরাই ইতিহাস ধরে রাখে। রাজনীতি শুধু দৃশ্য–অদৃশ্য কৌশল প্রয়োগ করে খেলা করে যায়, যে খেলায় নেতা থাকে, জনতা থাকে, রাজনৈতিক পরিবেশও থাকে; কিন্তু খেলা শেষ না হয়ে চলমান থাকে।

একনজরে
প্রকাশনী: স্বরবৃত্ত
প্রকাশক: মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭
প্রচ্ছদ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি
মূল্য: ২৫০ টাকা মাত্র

হাজীপুর, নরসিংদী