বা অথবা কিংবা: না–বলা সব গল্প যেখানে কথা বলে

আশান উজ জামানের ‘বা অথবা কিংবা’ছবি: লেখকের সৌজন্যে

আমাদের জীবন আসলে ভীষণ একঘেয়ে—অন্তত বাইরে থেকে দেখে তা–ই মনে হয়। প্রতিদিনের একই রকম যাওয়া-আসা, বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াই, অসংখ্য আপস আর অগণিত বলা এবং না-বলা গল্পের ভেতর দিয়েই কেটে যায় দিন। দিন থেকে মাস, মাস পেরিয়ে বছর।

অথচ এই একঘেয়েমির আড়ালেই জমে থাকে মানুষের সবচেয়ে জটিল সত্তাগুলো। আশান উজ জামানের ‘বা অথবা কিংবা’ সেই আড়াল সরিয়ে দিয়ে এমন সব গল্প সামনে এনে দাঁড় করায়, এমন ঘটনার মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেগুলো আমরা প্রতিদিন দেখি, জানি, অনুভব করি—কিন্তু স্বীকার করতে চাই না। সেই খরগোশের মতো, মনে করি, চোখ বুজে থাকলেই মুক্তি!

এই গল্পগুলোর চরিত্রদের কখনো আধা বাস্তব, আধা-কল্পনা বলে মনে হয়; কখনো মনে হয় সম্পূর্ণ কাল্পনিক আবার সম্পূর্ণ কাকতালীয়। কিন্তু গল্প শেষ হওয়ার পর বুঝতে পারি, এরা হয়তো আমরা অথবা আমাদেরই চারপাশের মানুষ। কিংবা হয়তো আমাদের প্রতিবেশী, সহকর্মী, আত্মীয় বা নিজেরই আরেকটি সত্তা। কখনো মনে হয়, এই সবকিছু ঘটেছে; আবার কোথাও মনে হয়, হয়তো এসবের কিছুই ঘটেনি। অথচ সত্য ও কল্পনার মানচিত্রের কাঁটাতারের বেড়া মুছে দেওয়ার মধ্যেই লেখকের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

বইয়ের গল্পের মানুষগুলো কাল্পনিক কি না! এদের স্বভাব-চরিত্র কাল্পনিক কি না!
মানুষের কামনা, লোভ, ভণ্ডামি, ক্ষমতার লালসা, অসহায়ত্ব—সবকিছুকেই নির্মোহ চোখে তুলে ধরে। মর্গের হিম অন্ধকারেও যেমন মানুষের লালসা জেগে উঠতে পারে, তেমনি একজন শিক্ষকও সব সময় ভরসার প্রতীক হয়ে ওঠেন না। আবার ‘যুদ্ধ করেছি’—এই কয়েকটি শব্দ কিংবা একটি কাগজের টুকরা কীভাবে কারও সমগ্র ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে, সেই নির্মম বাস্তবতাও গল্পগুলো আমাদের সামনে উন্মোচন করে। আচ্ছা একটা কাগজের ওপর সব সময় এত কিছু কেন নির্ভর করে বলুন তো?

গল্পে গল্পে যুদ্ধ আছে, রাষ্ট্র আছে, দেশের কথা আছে, দশের কথা আছে, সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার কথা আছে; কিন্তু সেই বেড়া শুধু দুই দেশের মানচিত্রকে আলাদা করে না, মানুষের ভেতরেও তৈরি করে অদৃশ্য বিভাজন। এমনকি এক দিঘির এপাড়-ওপাড়কেও যদি বেড়া দিয়ে ভাগ করা হয়, তবে শুধু মানুষ নয়, একটি মাছও আর স্বাধীনভাবে সাঁতরে যেতে পারে না। দুই ভাইকে এই বেড়া আলাদা করতে পারলে, পানির মাছ কি আর এমন বড় কিছু? এগুলো আদতেই কি রূপক, যদি ধরেও নিই তা রূপক—এই রূপকগুলো গল্পের ভেতর নিঃশব্দে ঢুকে আমাদের সময়, সমাজ ও মানবিকতার গভীর সংকটকে স্পর্শ করে।

আরও পড়ুন

মানব কী চায়, ইনসান কী পায়—এই প্রশ্নগুলোও বারবার ফিরে আসে। কেউ মসজিদ চায়, কেউ মন্দির। কাজী নজরুল ইসলামের ‘মানুষ’ কবিতার মতো ভিখারি ফিরে চলে, কিন্তু পূজার ঠাকুর আর ইমামের কোনো অভাব হয় না।

মানুষের চাওয়া-পাওয়া কতটা ন্যায্য, কতটা অন্যায্য? বেঁচে থাকার জন্য, নিজের স্বার্থে আমরা কত দূর যেতে পারি? অন্যের ত্রাণকর্তা হওয়ার আগে নিজের আত্মাকে বাঁচানোর জন্যই–বা আমরা কী করি? বইটি কোনো উত্তর দেয় না; বরং প্রশ্নগুলো পাঠকের হাতে তুলে দেয়। একঘেয়ে কাঠঠোকরা জানালার গ্লাসে কিংবা গাছের গায়ে ঠুকে ঠুকেই জীবন পার করে দেয়। ঠিক আমাদের মতো, মাথা কুটে মরি, বেঁচে থাকার জন্য। পেটের ভাত জোগাতে কত কী বিসর্জন দিতে হয়! হারাতে হয়!

সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে বইটির গদ্যশৈলী। প্রচলিত খুলনার কথ্য ভাষায় গল্পগুলো লিখেছেন লেখক, অথচ কোথাও এতটুকু কৃত্রিমতা নেই, নেই বিন্দুমাত্র আড়ষ্টতা। পড়তে গিয়ে কোনো সমস্যা তো হয়নিই; বরং এই আঞ্চলিক উচ্চারণই যেন গল্পগুলোকে আরও জীবন্ত, আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। মনে হয়েছে, যেন পাশের বাড়ির কেউ নিজের জীবনের গল্প নিঃসংকোচে বলে যাচ্ছে। কোনো ভণিতা নেই, কোনো নাটুকেপনা নেই—শুধু জীবনের অনাড়ম্বর সত্য।

এই বইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই—এখানে এমন একটি গল্পও নেই, যা কাল্পনিক বা অবাস্তব বলে ধরে নিতে পারেন, এসব শতভাগ সত্য ঘটনা কি না, সেই প্রশ্ন করা যাবে না। কারণ, উত্তর মিলবে না, প্রতিটি গল্পের সত্য আমরা নিজেরাই জানি। শুধু মন চাইলে ভুলে থাকি, অস্বীকার করি, কিংবা নিছকই গল্প বলে উড়িয়ে দিই। অথচ শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনের হিসাব তো নিজেকেই দিতে হবে। নিজের বিবেকের সামনে, নিজের আত্মার সামনে, সেই পুলসিরাত পার হওয়ার দায়ও আমাদেরই।

‘বা অথবা কিংবা’ আমাদের সময়ের, আমাদের সমাজের এবং সবচেয়ে বেশি আমাদের নিজেদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া এক নির্মম আয়না। যে আয়নায় তাকাতে অস্বস্তি লাগে, কিন্তু একবার তাকালে আর সহজে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না, আর কানে বাজবে কাঠঠোকরার ঠক ঠক ঠুক ঠুক শব্দ। একদিন সে শব্দ হারিয়ে যাবে, দিঘির মধ্যে পড়বে কাঁটাতারের বেড়া, বন্যার জলে ভেসে যাবে ত্রাণের শেষ আশা! শুধু পড়ে রইবে কিছু না–বলা কথা।

একনজরে
বই: বা অথবা কিংবা
লেখক: আশান উজ জামান
ধরন: ছোটগল্প সংকলন
প্রকাশনী: চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন