জ্যোৎস্নায় হারানো কথা

ছবি: এআই/বন্ধুসভা

প্রেমে পড়ার পর সবচেয়ে ভয়াবহ স্টেপ হলো প্রেম লুকানো। প্রেমে পড়েছি বুঝতে দিব না আবার কথা বলাও বন্ধ করব না—এই দুই জিনিস ব্যালেন্স করার জন্য মোটামুটি প্রেম বিষয়ে পোস্টগ্র্যাজুয়েট করে ফেলতে হয়। ইরা সেই হিসেবে লেভেল থ্রিতে আছে। আমার কল্কে কাশির চোখে এ জিনিস এড়াবে—এটা যে ভাববে, তার চোখ অটোমেটিক্যালি খুলে যাওয়ার কথা। মানে, খুলে পড়ে যাওয়ার কথা আরকি।

টেস গেরিটসেনের ‘দ্য সিনার’ পড়তে পড়তে আড়চোখে ইরার দিকে তাকালাম। পাশের বিছানায় শুয়ে সে ঘুমের ভান করছে বটে; কিন্তু একটু পরপর ফোন উল্টিয়ে দেখছে কোনো মেসেজ এল কি না। এদিকে ডিটেকটিভ রিজোলি একটা মরদেহ পেয়েছে পরিত্যক্ত বাড়ির করিডরে। লাশের বেহাল অবস্থা। খুনি তার হাত-পা কেটে নিয়ে গেছে। ইরা আবার একটু কেশে ফোন চেক করে পাশ ফিরল। এভাবে একটা থ্রিলারে মনোযোগ দেওয়া যায় নাকি! আমি বই বন্ধ করে উঠে বসলাম।

‘ছেলেটা তোকে কোনো নাম দেয়নি?’
ইরা চমকে উঠে বলল, ‘কোন ছেলে!’
‘যার মেসেজ আসি আসি করেও আসছে না।’
‘সব সময় নিজেকে এত বিজ্ঞ ভাববি না। দুটো বই পড়ে নিজেকে এনএসআইয়ের লোক ভাবা বন্ধ কর।’
‘আচ্ছা যা, বন্ধ করলাম।’
‘তোর ধারণা প্রেম করা ছাড়া আমার আর কোনো কাজ নাই?’
‘বললাম তো, ভুল হয়ে গেছে, সরি।’
‘ভুল যদি হয়, তাহলে বলিস কেন? তোর নাহয় গল্প করার এত মানুষ; আমি কারও সঙ্গে কথা বললেই কেন খোঁচা দিস?’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালাম। ইরার মন খারাপ অনেক দিন হলো। এ বয়সে মন খারাপ হওয়ার জন্য বিশেষ কোনো উপলক্ষের দরকার নেই। মানুষ কুকুর, বিড়াল পোষে আর ইরা পোষে মন খারাপ। এমন শীতের রাতে কম্বল মুড়ি দিয়ে চা খেতে খেতে বই পড়ার চাইতে সে কান্না করাকেই বেছে নেয়। আমি কখনো ওকে বকা দিই, কখনো ওর পাশে বসে থাকি। নীরবে, নিঃশব্দে। মাঝেমধ্যে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিই। সবাই ওকে ছেড়ে যায় ঠিক, নির্লজ্জ দুঃখগুলো ওকে ছাড়তেই চায় না!
‘বাইরে যাবি ইরা? খুব জ্যোৎস্না হয়েছে দেখ। ভেসে যাচ্ছে চারদিক।’
‘বাইরে যাব না। ঘুমাব।’
‘আয় না বাবা, চাদর গায়ে দে। ঠান্ডা বাতাস বইছে কিন্তু।’

আরও পড়ুন

ইরা চুপচাপ শুয়ে আছে। মাঝেমধ্যে ওর জেদ দেখলে আমার মায়া লাগে। চাদর জড়িয়ে ওকে টেনে তুললাম।
‘রাগ করেছিস খুব?’
‘না।’
‘রাগ কেন করিস বলত? আমি কী এমন বলেছি? এত দিন ধরে চিনিস, তবু কেন ভুল বুঝিস?’
ইরা অন্য দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল। ঘরের বাতি নিভিয়ে বেলকনিতে আলো জ্বালিয়ে ওকে নিয়ে বের হলাম। আমার বাসার সামনের জায়গাটা এত সুন্দর। সামনে হাইরোড। দু’পাশে পলাশ, জারুল, শিমুল আর রোড ডিভাইডারে কৃষ্ণচূড়া আর সোনালু। দূরপাল্লার বাস ছাড়া অন্য গাড়ি তেমন চোখে পড়ে না। আমার বেলকনি থেকে দেখলে মনে হয় যেন সবুজের মেঘ। বাতাস উঠলে বুকের ভিতর হু হু করে উঠে।

এই পথ ধরে হেঁটে যেতে যেতে নেশা লেগে যায়। মাঝেমধ্যে মনে হয়, চলন্ত কোনো গাড়ির সামনে ঝাপ দিই। আমার মন ভালো থাকলেই যদি এমন চিন্তা আসে, ইরার আর দোষ কী!
‘একটা গান ধর তো ইরা।’
‘গান গাইতে পারি না।’
‘আহা, ধর না একটা গান।’
‘তোর মন খারাপ হয় না?’
‘কেন হবে না?’
‘সারাক্ষণ-ই তো দেখি, বই পড়িস আর চা খাস।’
‘মন খারাপ হলে কী খেতে হয়? বিষ?’
‘আহ। বল না?’
‘আমার মন খারাপের কথা শুনে তোর কী লাভ বল?’
‘কোনো লাভ নাই। কেন আমার এত পাগল পাগল লাগে?’
‘তাহলে তো তোর নিজেকে ভাগ্যবান ভাবার কথা। পাগল পাগল লাগার পরেও দিব্যি আমার সঙ্গে হেঁটে বেড়াচ্ছিস। অথচ কত মানুষ নিজেকে সুস্থ ভেবেও ডাক্তারের বদৌলতে এখন আছে পাগলা গারদে।’
ইরা হো হো করে হেসে ফেলল। ওর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললাম, ‘এত রাতে ভূতের মতো হাসবি না। চুপচাপ হাঁটতে থাক।’
ইরা হাসি হাসি মুখে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তুই ক্লান্ত হলে আমার কাছে কেন বলিস না?’
‘কারণ, তুই বুঝবি না ইরা।’
‘কী বুঝব না?’
‘আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দেয় ক্যান?/ ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,/ ঘরের বিছন নিয়া ক্যান অন্য ধান খ্যাত রোয়?’
‘আহা, এটা তো শামসুল হকের কবিতা!’
‘কবিতাই যদি মনের কথা বলে, তাহলে আর বাড়তি কিছু কি বলার থাকে?’

ইরা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ফোন বের করলাম। কবির সুমন ছাড়া এই জ্যোৎস্না প্রাণ পাচ্ছে না।
আমি আর ইরা হাঁটছি। মাথার ওপরে ভরা জ্যোৎস্না, আর কবির সুমন ব্যাকগ্রাউন্ডে গেয়ে যাচ্ছে—
‘ও গানওয়ালা, আর একটা গান গাও
আমার কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই!’

নতুন বাজার, গাইবান্ধা