ইরা ফোনের দিকে তাকাল। এই যে এ মানুষটার ছবি সে গত বছর ফটো ল্যাবে গিয়ে ওয়াশ করে এনেছে। প্রোপিকের ছবিটা।
চুলায় আরেক দফায় চা উঠেছে। ইরা আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে কাপ রেডি করছে। আট কাপ চা। তাড়াহুড়ায় কী করে যেন একটা কাপ ভেঙে গেল। কপালের ঘাম পড়ল ওই কাপ ভাঙার টেনশনেই।
ইরা আট কাপে চা ঢেলে ঘরে রেখে এসে নিজের কাপ নিয়ে বেলকনিতে বসল। বেলকনির সামনেই বিশাল উঠান। উঠানের এক পাশে গোলাপগাছ। তার পাশেই কসমস। শিউলী কৃষ্ণচূড়া উঠানের আরেক পাশে। এই প্রথম কৃষ্ণচূড়ায় ফুল ধরেছে।
ইরার হাতের ফোনটায় টুং করে ম্যাসেজ এল।
‘কী করছ?’
ঘরে হাসির রোল পড়েছে। বহুদিন পর ফুফু এসেছে, সবাই মিলে বাসাটায় প্রাণ এনে দিয়েছে। আব্বুর হার্টের অপারেশনের পর থেকেই বাসায় কেমন পিনপতন নীরবতা। এই নীরবতা আজ রাতের বেলা পুরোপুরি কেটে গিয়েছে।
এর মধ্যেই ইরা যখনি ঘরে ঢুকছে, সবাই কেমন চুপ হয়ে যাচ্ছে। ভাইয়া গলা খাকারি দিয়ে বলছে, ‘দে তো দ্রুত আরেক কাপ চা।’ মূলত এ জন্যই ইরা আর ওদিকে যাচ্ছে না।
ওই ঘরে কী আলাপ হচ্ছে ইরা জানে। গত রাতে বাবা ডেকে জানতে চেয়েছিল, ‘পছন্দের কেউ আছে? একটা ভালো পাত্রের সন্ধান পেয়েছি মা।’
ইরা বহুদিন পর বাবার মুখে মা ডাক শুনেছে। ঘটনায় এতটাই হতভম্ব যে কিছু বলতে পারেনি। বাবা হাসিমুখে বলেছে, ‘আচ্ছা আচ্ছা তুই যা, আমি বুঝেছি।’
সে জানে বাবা কিছুই বুঝেনি। বোঝার কথা নয়। যাকে ভালোবাসে, সে-ই কখনো বোঝেনি; বাবা বুঝবে কীভাবে?
‘ব্যস্ত নাকি? পড়ছ?’
ইরা ফোনের দিকে তাকাল। এই যে এ মানুষটার ছবি সে গত বছর ফটো ল্যাবে গিয়ে ওয়াশ করে এনেছে। প্রোপিকের ছবিটা। কেমন আকাশের দিকে চেয়ে বিষণ্নভাবে বসে আছে। ইরা ওটা ওর পার্সের ভেতরে রেখে দিয়েছে।
‘পড়ছি। কাল ক্লাস হবে। আবোলতাবোল পড়াশোনার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝি না। মন চায় বিয়ে করে ফেলি।’
‘আইডিয়া কিন্তু মোটেও খারাপ নয়। আছে নাকি কেউ?’
‘এটা তো সিক্রেট, বলাটা কি ঠিক হবে? আপনার কথা বলুন তার চেয়ে ভাইয়া। বিয়ে করছেন কবে?’
‘হা হা। সবে একটা মাথার ওপর ছাতা জুটল, ভালো করে ধরতে শিখি, আগেই যদি সঙ্গী–সাথী জোগাড় করি, তাহলে তো দুজনই ভিজব।’
‘আমার মতো পাতলাপুতলা সঙ্গী–সাথী পেলে কিন্তু আর ভিজবেন না।’
‘তোমার মতো খাদক পেলে ভিজলেই কি আর না ভিজলেই কি। না খেয়ে মরব সবাই।’
‘আচ্ছা আচ্ছা, একটু না হয় কম-ই খাব।’
‘এই স্যালারি তে তো মেয়ে জুটবে না ইরা।’
‘কেন জুটবে না? যদি হও সুজন তেঁতুল পাতায় ন জন।’
‘এসব পুঁথিগত বিদ্যা নিয়ে চলে না জীবন। বাস্তবে টাকা লাগে, থাকার জন্য ছাদ লাগে, খাওয়ার জন্য ভালো ভালো খাবার লাগে। সপ্তাহে একবার চায়নিজ ডিস লাগে। ও তুমি বুঝবে না।’
‘এটাই তো ভালো। এসব যে বুঝে না, সে তো বিয়ে করার জন্য একদম পারফেক্ট।’
‘হা হা। আচ্ছা ঘুমাও। কাল অফিস আছে।’
ইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরও কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। অ্যাকটিভ না–উ এর সবুজ বাতিটা দিব্যি জ্বল জ্বল করছে। ও জানে এই বাতি ঠিক রাত তিনটার দিকে নিভে যাবে। ঠান্ডা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ও ম্যাসেজ দিল সবচাইতে প্রিয় বান্ধবীকে;
—আছিস?
সাইলেন্স অব দ্য ল্যাম্বস এ ডুবে আছে এমন সময় ইরার ম্যাসেজ দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকাল বান্ধবী। গল্পের ভিকটিম এখন কুয়োর ভেতরে। তাকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। খুনি কুয়ার পাশে তার কুকুরটাকে আদর করছে আর কী করে খুন করবে, সেই পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। এমন সিরিয়াস মুহূর্তে কারও ম্যাসেজের উত্তর দিতে ভালো লাগে?
খুব বিরক্তি নিয়ে উত্তর দিল
—না মরছি।
—আচ্ছা একটা চমৎকার কবিতা শুনবি?
—কবিতা–টবিতা ভালো লাগে না ইরা। পড়ছি আমি। পরে নক দেব।
—একটা সিরিয়াস কথা বলতাম
—কী সিরিয়াস কথা? তোর সিরিয়াস কথা মানেই তো ওই, গাছে পোকা হয়েছে, মাথার চুল পড়ছে। বিরক্তিকর।
—না না, এটা আসলেই সিরিয়াস।
—বল
—আমার বিয়ের সময় তুই খুব নাচবি আচ্ছা? আর সুন্দর করে সাজবি, যাতে আমাকে কেউ না দেখে।
—আর তুই কী করবি? পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাবি?
—আরে ধ্যাৎ। না না, তা কেন! আমি একটু কাঁদব।
—কাঁদবি তো কাঁদবি। বিয়ের দিন মানুষ কাঁদেই। তার পর থেকেই তো দাঁত ক্যালায় ছবি দিবি আর আমাকে দিয়ে জোর করে লাভ রিঅ্যাক্ট দেওয়াবি। যত্তসব।
—দিন আনে দিন ফুরায়—এমন লোককে বিয়ে করলেও দাঁত ক্যালাব?
—কেন? গরিবের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে তোর?
—আরে নাহ্। বিশাল বড় লোক। পাজেরোতে করে ঘুরে।
—আলহামদুলিল্লাহ।
—কেন?
—আমার বাসার গলিতে পাজেরো ঢোকে না। তোর অত্যাচার থেকে মুক্তি পাব। ভাবতেই ভালো লাগছে।
—যাদের বাসায় পাজেরো ঢোকে না, মনটা তাদের বাসাতেই কেন পড়ে থাকে জানিস?
বান্ধবী হুট করে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দিল। এত রাতে আজগুবি প্রশ্নের উত্তর দিতে ইচ্ছা করছে না তার।
ইরা অনেকক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর ঠান্ডা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ডায়েরিতে লিখল,
‘কিছু মানুষ চড়ুই পাখির মতো। ভাত ছিটালেই কোত্থেকে যেন উড়ে আসে। আর কিছু মানুষ পাড়ার কুকুরগুলোর মতো। জানে ঢুকতে পারবে না, তবু রোজ একবার করে প্রভুর বাড়ির দরজার সামনে ক্লান্ত মুখে বসে থাকে। একবার যদি দেখা দেয়!’
নতুন বাজার, গাইবান্ধা