‘মন আমার দেহঘড়ি’— যাঁর সুরে মাতোয়ারা বর্তমান প্রজন্মও
বাংলা লোকসংগীতের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম আবদুর রহমান বয়াতি। তাঁর ভরাট কণ্ঠ, সুরের বৈচিত্র্য এবং অসাধারণ পরিবেশনশৈলী এই দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছে খুব সহজেই। বাউল, মারফতি, মুর্শিদি এবং দেহতত্ত্বের গানকে তিনি লোকালয় থেকে তুলে এনে পৌঁছে দিয়েছেন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে।
১৯৩৯ সালে ঢাকার সূত্রাপুরের দোলাইপাড়ে জন্মগ্রহণ করেন আবদুর রহমান বয়াতি। শৈশব থেকেই সুর ও সংগীতের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। প্রথাগত শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি লোকসংগীতের সাধনায় নিজেকে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন। আলাউদ্দিন বয়াতি, কবি জসীমউদ্দীন এবং রজ্জব আলী বয়াতির মতো গুণীদের সান্নিধ্য তাঁর সংগীত ভাবনাকে সমৃদ্ধ করেছিল।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ জাতীয় বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে।
আবদুর রহমান বয়াতি কেবল একজন গায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার এবং বংশীবাদক। খঞ্জনি বাজিয়ে শরীর দুলিয়ে যখন তিনি মঞ্চে গান গাইতেন, তখন শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত।
তাঁর গাওয়া ‘মন আমার দেহঘড়ি সূক্ষ্ম তৈরি রুপার তারে’, ‘মা ফাতেমার কান্না’, ‘ছেড়ে দে নৌকা আমি যাব মদিনা’ কিংবা ‘আমি ভুলি ভুলি মনে করি’ গানগুলো এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। দেহতত্ত্বের জটিল দর্শনকে তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় শ্রোতাদের সামনে উপস্থাপন করতেন।
দেশ-বিদেশের বহু মঞ্চে তিনি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীতকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সামনে গান গেয়ে তিনি বাঙালি সংস্কৃতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
২০১৩ সালের ১৯ আগস্ট লোকসংগীতের এই মহান সাধক শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে না থাকলেও তাঁর সুর, গান ও বৈচিত্র্যময় পরিবেশনা চিরকাল বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।
বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম