আজতেকা: মেক্সিকোর ভাগ্য পাল্টায় যার বদৌলতে!
ব্রাজিলের পাঁচ বিশ্বকাপ জয় থেকে শুরু করে পেলের তিন বিশ্বকাপ জয়, অথবা জ্যঁ ফন্তের এক বিশ্বকাপে ১৩ গোল—এমন সব বিশাল কীর্তির তালিকায় নাম আছে মেক্সিকোরও। বিশ্বকাপের ইতিহাসে গত ২২ সংস্করণে ১৭ বার অংশ নেওয়া দলটি সাতবারই খেলেছে আসরের উদ্বোধনী ম্যাচ, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চসংখ্যক। এবার ২৩তম আসরে নিজেদের ১৮তম অংশগ্রহণেও দলটি খেলল উদ্বোধনী ম্যাচ, অষ্টমবারের মতো।
কীর্তিটা এখানেই। বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে আর কোনো দলই এতবার আয়োজনের উদ্বোধনীর অংশ হতে পারেনি। তবে ব্রাজিল, পেলে কিংবা ফন্তের কীর্তি যেমন রঙে রাঙানো, সেখানে মেক্সিকোর কীর্তিটা বেশ অনেকখানিই বিবর্ণ। কারণ, গত সাতবারের কোনোবারেই যে দলটি জয়ের হাসি হেসে মাঠ ছাড়তে পারেনি! দুটি ড্রয়ের বিপরীতে পাঁচটি পরাজয়। মনে রাখার মতো নয় নিশ্চয়ই!
বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বপ্রথম ম্যাচে মেক্সিকো মাঠে নেমেছিল ফ্রান্সের বিপক্ষে, মন্টেভিডিওতে ম্যাজিক্যাল নাম্বার ৪৪৪৪ দর্শকের সামনে ৩-০ গোলে পিছিয়ে থেকে প্রথমার্ধের খেলা শেষ করার পর বিধ্বস্ত হতে হয়েছিল ৪-১ ব্যবধানে।
দুই আসরের বিরতি দিয়ে এর ঠিক ২০ বছর পর আবারও উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকো। দক্ষিণ আমেরিকার মাটিতে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ, স্বাগতিক ব্রাজিলের বিপক্ষে মুখোমুখি হলো উত্তর আমেরিকান দলটি। ফল অনেকটাই গেলোবারের মতো, ৪-০ গোলে হতে হলো পর্যদুস্ত।
এর পরের আসর সুইজারল্যান্ডে, এক আসর পর আবারও ইউরোপে ফিরল বিশ্বকাপ ফুটবল। উদ্বোধনী ম্যাচে এবারও সেই ব্রাজিল বনাম মেক্সিকো দ্বৈরথ। জেনেভায় ২০ মিনিটের ব্যবধানে চার গোল হজম করা মেক্সিকানরা সেদিন শেষ অবধি মাঠ ছাড়ল ৫-০ গোলে পরাজিত হয়ে।
পরের আসর তথা ১৯৫৮ সালে মেক্সিকো আবারও বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ খেলতে নামল, স্বাগতিক সুইডেনের বিপক্ষে। তবে প্রতিপক্ষ পাল্টালেও মেক্সিকানদের ভাগ্য রয়ে গেল অপরিবর্তিত। জুটল ভাগ্যে ৩-০ গোলের হার।
সাল ১৯৬২। আবারও দক্ষিণ আমেরিকায় বসল বিশ্বকাপ। চিলিতে সে আসরের উদ্বোধনী ম্যাচে আবারও মুখোমুখি ব্রাজিল ও মেক্সিকো। টানা চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ খেলতে নামল মেক্সিকো, তৃতীয়বারের মতো ব্রাজিলের বিপক্ষে। এবারও দলটিকে বরণ করে নিতে হলো গত দুবারেরই ভাগ্য। গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর মারিও জাগালো আর পেলের গোলে জয় নিশ্চিত হয় ব্রাজিলের, মাঠ ছাড়ল মেক্সিকো ২-০ গোলে পরাজিত হয়ে।
টানা পাঁচ পরাজয়ের পর অবশেষে ঘরের মাঠে ১৯৭০ সালে মেক্সিকো সর্বপ্রথম সমর্থ হলো ভাগ্য পরিবর্তন করতে, জয় তুলতে না পারলেও লক্ষাধিক দর্শকের সামনে দলটি গোলশূন্য ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে।
বিশ্বকাপের প্রথম নয় আসরে ছয়বার উদ্বোধনী ম্যাচ খেলে ফেলা মেক্সিকো এরপর আবারও বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ খেলতে নামে ৪০ বছর পর, ২০১০ সালে। স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার প্রায় সাড়ে ৮৫ হাজার দর্শকের সামনে গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর শাবালালার গোলে পিছিয়ে গিয়েও দলটি পরাজয় এড়ায় রাফায়েল মার্কুয়েজের গোলে।
টানা পাঁচ পরাজয়ের পর টানা দুই ড্র, সাত ম্যাচ শেষে তখনো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে জয় অধরা মেক্সিকোর কাছে। তবে ভাগ্যদেবী যেন অপেক্ষায় ছিলেন এবার। সেবার যেমন আজতেকায় ভাগ্যের বদল ঘটেছিল মেক্সিকোর, এবার ঠিক সেই আজতেকাতেই আবারও ভাগ্য পাল্টাল মেক্সিকোর।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে রেকর্ডসংখ্যকবারের মতো আসরের উদ্বোধনী ম্যাচ খেলতে নামল দেশটি, প্রতিপক্ষ ১৬ বছর আগের দক্ষিণ আফ্রিকা। পাল্টেছে শুধু স্বাগতিক পরিচয়টাই। ঘরের মাঠে প্রায় ৮১ হাজার দর্শকের সামনে এবার জয়ের হাসি হাসল মেক্সিকো, মাঠ ছাড়ল ২-০ গোলের দাপুটে জয় নিয়ে।
সেবার আজতেকা শিখিয়েছিল হার এড়াতে, এবার শেখাল জিততে। মেক্সিকোর খরা কাটল, অপেক্ষার ঘটল অবসান।
মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা