রোনালদোর শেষ নৃত্যে কি পূরণ হবে পর্তুগালের বিশ্বকাপ স্বপ্ন

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপে পর্তুগাল বেশ সম্ভাবনা জাগাচ্ছেছবি: রয়টার্স

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে কিছু দল থাকে যারা প্রতিভা, স্টাইল এবং ধারাবাহিকতার মাধ্যমে নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করে। পর্তুগাল সেই তালিকায় অন্যতম। ইউরোপের এই দেশটি দীর্ঘ সময় ধরে ফুটবলে অসাধারণ সব তারকা উপহার দিলেও এখনো বিশ্বকাপ ট্রফি অধরা। ২০২৬ বিশ্বকাপ তাই তাদের জন্য শুধুই একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং একটি নতুন সুযোগের গল্প।

‘প্রতিভা’ এবং ‘অপূর্ণতা’ মূলত এই দুইটি শব্দে পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাস ব্যাখ্যা করা যায়। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ইউসেবিওর নেতৃত্বে পর্তুগাল বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল, সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে তারা তৃতীয় স্থান অর্জন করে। ২০০৬ সালেও দলটি সেমিফাইনালে উঠেছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তারা ইউরোপের শক্তিশালী দল হলেও ট্রফিহীন। তবে ২০১৬ ইউরো এবং ২০১৯ ও ২০২৪ নেশনস লিগ জয় প্রমাণ করেছে—পর্তুগাল বড় শিরোপা জিততে জানে।

এবার বিশ্বকাপে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দলগুলোর অন্যতম পর্তুগাল
ছবি: রয়টার্স

২০০০-এর দশক থেকে শুরু হয় নতুন যুগ—যেখানে আসে লুইস ফিগো, রুই কস্তা এবং পরে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। কিন্তু এত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বকাপ জয় এখনো অধরা।

২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য পর্তুগালের স্কোয়াডকে অনেক বিশেষজ্ঞ দেশটির গোল্ডেন জেনারেশন হিসেবে দেখছে। সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দলগুলোর অন্যতম। ব্রুনো ফার্নান্দেসের নেতৃত্বে মিডফিল্ড ক্রিয়েটিভিটি। বার্নার্দো সিলভা ও ভিটিনহার মতো টেকনিক্যাল মাস্টার। রুবেন দিয়াসের মতো বিশ্বমানের ডিফেন্ডার। রাফায়েল লেও, জোয়াও ফেলিক্স, গনসালো রামোস ও অভিজ্ঞ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নেতৃত্বে আক্রমণভাগ। এই দলটি শুধু নামের দিক থেকেই নয়, বরং গতি, স্কিল এবং ট্যাকটিক্যাল গভীরতায় অত্যন্ত শক্তিশালী।

২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের সবচেয়ে শক্তির দিক হলো বিশ্বমানের মিডফিল্ড। ভিটিনহা, ব্রুনো ফার্নান্দেস, বার্নার্দো সিলভা এবং জোয়াও নেভেস—এই লাইনআপ বল নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণ গঠনে বিশ্বের সেরা পর্যায়ের। রাফায়েল লেওর গতি, ফেলিক্সের ক্রিয়েটিভিটি এবং রামোসের ফিনিশিং—সব মিলিয়ে আক্রমণভাগেও রয়েছে বৈচিত্র। রুবেন দিয়াসের নেতৃত্বে ডিফেন্স লাইন স্থিতিশীল এবং অভিজ্ঞ।

আরও পড়ুন
পর্তুগাল এখন পজেশন ফুটবল, কাউন্টার অ্যাটাক এবং হাই প্রেস—সব ধরনের খেলায় মানিয়ে নিতে সক্ষম
এএফপি

পর্তুগাল এখন পজেশন ফুটবল, কাউন্টার অ্যাটাক এবং হাই প্রেস—সব ধরনের খেলায় মানিয়ে নিতে সক্ষম। অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ডিওগো কোস্তা বর্তমানে পর্তুগালের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়দের একজন। দুর্দান্ত সেভ, আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি এবং চাপের মুহূর্তে ঠান্ডা মাথায় খেলার ক্ষমতা তাঁকে দলের অন্যতম ভরসায় পরিণত করেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের শিরোপা স্বপ্ন বাস্তবায়নে এই তরুণ গোলরক্ষকের ভূমিকা হতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শক্তিশালী ও তারকাখচিত স্কোয়াড থাকা সত্ত্বেও পর্তুগালের কিছু দুর্বলতা রয়েছে, যা বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। দলটিতে আক্রমণাত্মক ও সৃজনশীল খেলোয়াড়ের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক সময় মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা দেখা যায়। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বল হারানোর পর দ্রুত রক্ষণে ফেরার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সুযোগ সৃষ্টি করলেও সব সময় তা গোলের রূপ দিতে না পারার প্রবণতা পর্তুগালের জন্য উদ্বেগের কারণ। দলটির অভিজ্ঞতা ও প্রতিভা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না থাকলেও বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে হলে কৌশলগত স্থিরতা, রক্ষণভাগের দৃঢ়তা এবং পুরো দলের সমন্বিত পারফরম্যান্স নিশ্চিত করতে হবে।

২০২৬ বিশ্বকাপ পর্তুগালের জন্য দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের এক সুবর্ণ সুযোগ
ছবি : রয়টার্স

সবচেয়ে বড় চমক হতে পারে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তিনি শুধু অধিনায়ক নন, একটি প্রজন্মের অনুপ্রেরণার নাম। বয়স চল্লিশ পেরোলেও তাঁর আত্মবিশ্বাস, পেশাদারত্ব, পরিশ্রম ও জয়ের ক্ষুধা এখনো তরুণ ফুটবলারদের জন্য উদাহরণ। মাঠে তাঁর উপস্থিতি শুধু গোল করার সম্ভাবনাই বাড়ায় না, দলের মনোবলও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। বড় ম্যাচের চাপ সামলানো, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দায়িত্ব নেওয়া এবং সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করার অসাধারণ ক্ষমতা রোনালদোকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ; কিন্তু অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং অদম্য মানসিকতার কারণে তিনি এখনো দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রগুলোর একটি।

সবকিছু মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ পর্তুগালের জন্য দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের এক সুবর্ণ সুযোগ। অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের অনন্য সমন্বয়ে গড়া এই দলটি যেমন প্রতিভায় সমৃদ্ধ, তেমনি বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার জন্যও প্রস্তুত। সামনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা, দলীয় ঐক্য এবং খেলোয়াড়দের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স পর্তুগালকে নিয়ে যেতে পারে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। আর যদি রোনালদোর নেতৃত্বে এই প্রজন্ম নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা মেলে ধরতে পারে, তবে ২০২৬ বিশ্বকাপ পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে উঠবে।

সাধারণ সম্পাদক, সাতক্ষীরা বন্ধুসভা