ফুটবল তাঁকে সবকিছু দিয়েছিল, সুখের সমাপ্তি ছাড়া
ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের নাম শুধু ট্রফির তালিকায় লেখা থাকে না; থাকে মানুষের মনে। কেভিন কিগান ছিলেন তেমনই একজন। তিনি ছিলেন একাধারে বিশ্বসেরা ফুটবলার, অনুপ্রেরণাদায়ী অধিনায়ক, স্বপ্নবান কোচ এবং এমন এক চরিত্র, যিনি মাঠের বাইরেও কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।
গত ২০ জুলাই ৭৫ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন ইংল্যান্ডের এই কিংবদন্তি। তাঁর বিদায়ে শেষ হলো ইংলিশ ফুটবলের এক বর্ণিল অধ্যায়।
কেভিন কিগান ছিলেন একমাত্র ব্রিটিশ ফুটবলার, যিনি দুইবার ব্যালন ডি’অর জয়ের গৌরব অর্জন করেন। লিভারপুলের হয়ে ক্লাবটির প্রথম ইউরোপিয়ান কাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরে জার্মানির হামবুর্গে গিয়ে জিতেছেন বুন্দেসলিগা। ইংল্যান্ডের হয়ে ছিলেন জাতীয় দলের অধিনায়ক ও পরবর্তী সময়ে প্রধান কোচ।
তবু আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর অসাধারণ অর্জনের চেয়ে অনেকের স্মৃতিতে সবচেয়ে বেশি জায়গা করে নিয়েছে ১৯৯৬ সালের সেই বিখ্যাত টেলিভিশন সাক্ষাৎকার—‘আই উড লাভ ইট!’
নিউক্যাসল ইউনাইটেডের কোচ হিসেবে শিরোপা লড়াইয়ের উত্তেজনার মধ্যে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের মন্তব্যের জবাবে আবেগভরা প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন কিগান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগ তখনো আসেনি। কিন্তু সেই মুহূর্ত পরিণত হয়েছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ভিডিও ক্লিপগুলোর একটিতে।
কিগান নিজেও পরে লিখেছিলেন, মানুষ তাঁকে প্রায়ই ‘লাভ ইট’ বলে ডাকত। অটোগ্রাফ চাইতে এসে সেই বিখ্যাত মুহূর্তের ছবিই এগিয়ে দিত। অথচ তাঁর আক্ষেপ ছিল—মানুষ যেন তাঁর ফুটবল জীবনের বিশাল সাফল্যের চেয়ে ওই কয়েক সেকেন্ডের আবেগকেই বেশি মনে রেখেছে।
কেভিন কিগানের গল্প শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পৃথিবী থেকে।
ইংল্যান্ডের ডনকাস্টারের আর্মথর্পে জন্ম নেওয়া কিগানের শৈশব কেটেছে দারিদ্র্যের মধ্যে। বাড়িতে দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ ছিল না। বাইরে ছিল টয়লেট, পুরোনো জিংকের টবে গোসল করতে হতো। যুদ্ধফেরত খনিশ্রমিক বাবার সংসারে বিলাসিতা তো দূরের কথা, স্বপ্ন দেখাটাও ছিল কঠিন।
অনেকেই বলতেন, খাটো গড়নের এই ছেলেটি বড় ফুটবলার হতে পারবে না। ডনকাস্টার রোভার্সও তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পিতলের কারখানায় কাজ শুরু করেন। খেলতেন কারখানার দল ও স্থানীয় একটি পাব দলের হয়ে। সেখানেই ভাগ্য বদলে যায়। স্কানথর্প ইউনাইটেডের এক স্কাউট তাঁর খেলা দেখে ট্রায়ালের সুযোগ করে দেন।
সেখান থেকেই তাঁর জীবনে আসেন কিংবদন্তি কোচ বিল শ্যাঙ্কলি। লিভারপুলে নিয়ে গিয়ে শ্যাঙ্কলি তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুমি শুধু একজন ভালো খেলোয়াড় নও, তুমি হবে মহানদের একজন।’
ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়েছিল। লিভারপুলে অভিষেক ম্যাচেই গোল করেন কিগান। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনটি লিগ শিরোপা, দুটি উয়েফা কাপ, একটি এফএ কাপ এবং ক্লাবের ইতিহাসের প্রথম ইউরোপিয়ান কাপ—সবকিছুরই অংশ ছিলেন তিনি।
এরপর সবাইকে অবাক করে লিভারপুল ছেড়ে জার্মানির হামবুর্গে যোগ দেন। শুরুটা সহজ ছিল না। সতীর্থদের বিরূপ আচরণ, মাঠে অবহেলা, এমনকি এক প্রতিপক্ষকে ঘুষি মেরে আট সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞাও পেয়েছিলেন। কিন্তু হার মানেননি। এক বছরের মধ্যেই জিতে নেন প্রথম ব্যালন ডি’অর, পরে দ্বিতীয়বারও। হামবুর্গকে এনে দেন দীর্ঘদিনের অপেক্ষার বুন্দেসলিগা শিরোপা। জার্মান সমর্থকেরা তাঁকে ডাকতেন ‘মাইটি মাউস’ নামে।
খেলোয়াড় হিসেবে ক্যারিয়ারের শেষ বড় সিদ্ধান্তও ছিল অপ্রত্যাশিত। সাউদাম্পটন ছেড়ে যোগ দেন দ্বিতীয় বিভাগের নিউক্যাসল ইউনাইটেডে। তাঁর আগমনে ক্লাবের দর্শকসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই দলকে প্রথম বিভাগে তুলে এনে মাত্র ৩৩ বছর বয়সেই বুটজোড়া তুলে রাখেন।
কিন্তু ফুটবল তাঁকে বেশি দিন দূরে থাকতে দেয়নি।
১৯৯২ সালে প্রায় ভেঙে পড়া নিউক্যাসল ইউনাইটেডের দায়িত্ব নেন কোচ হিসেবে। ক্লাব তখন অবনমনের মুখে। কিগান শুধু দলকে বাঁচাননি, কয়েক বছরের মধ্যে ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম শক্তিতে পরিণত করেন। অ্যান্ডি কোল, রব লি, পিটার বিয়ার্ডসলি, পরে ডেভিড জিনোলা ও লেস ফার্দিনান্দদের নিয়ে গড়ে ওঠে আক্রমণাত্মক, রোমাঞ্চকর এক দল।
১৯৯৫-৯৬ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা প্রায় হাতের মুঠোয় ছিল নিউক্যাসলের। জানুয়ারিতে ১২ পয়েন্ট এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে শিরোপা হারাতে হয়। সেই ব্যর্থতার মধ্যেই জন্ম নেয় ফুটবল ইতিহাসের বিখ্যাত ‘আই উড লাভ ইট!’ মুহূর্ত।
এরপরও হাল ছাড়েননি। বিশ্ব রেকর্ড ১৫ মিলিয়ন পাউন্ডে অ্যালান শিয়ারারকে দলে আনেন। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের করপোরেট বাস্তবতার সঙ্গে তাঁর আদর্শের সংঘাত শুরু হয়ে যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই নিউক্যাসল ছেড়ে দেন।
পরে ফুলহামের দায়িত্ব নেন। ইংল্যান্ড জাতীয় দলের কোচ হন। কিন্তু ইউরো ২০০০-এ ব্যর্থতার পর ওয়েম্বলিতে জার্মানির কাছে হারের পর পদত্যাগ করেন। নিজের ভাষায়, এই দায়িত্ব তাঁর সামর্থ্যের বাইরে ছিল।
এরপর ম্যানচেস্টার সিটিকে প্রথম বিভাগ থেকে প্রিমিয়ার লিগে তুলেছিলেন ৯৯ পয়েন্ট নিয়ে। পরে আবার নিউক্যাসলে ফিরলেও মাইক অ্যাশলির মালিকানাধীন ক্লাবে সেই অধ্যায় সুখের হয়নি। আইনি লড়াই শেষে বিদায় নেন, যা হয়ে থাকে তাঁর ফুটবল জীবনের শেষ অধ্যায়।
কিগান ছিলেন মাঠের বাইরেও ব্যতিক্রম। বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন, গান গেয়েছেন, টপ অব দ্য পপস-এ অংশ নিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত কোঁকড়ানো চুল একসময় অসংখ্য ফুটবলারের অনুকরণের বিষয় ছিল। নিজেকে সব সময় শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান হিসেবেই পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন। রাজনৈতিকভাবে লেবারপন্থী ছিলেন এবং খনিশ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে সব সময় স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন।
২০২৬ সালে একাধিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি প্রকাশ করেন, তিনি স্টেজ-৪ ক্যানসারে আক্রান্ত। নিউক্যাসলের সমর্থকদের সামনে দেওয়া সেই আবেগঘন বক্তব্যই পরে হয়ে ওঠে তাঁর শেষ বিদায়।
ফুটবল তাঁকে দিয়েছিল বিশ্বজোড়া খ্যাতি, অগণিত ভালোবাসা, অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে কিগান নিজেই বলেছিলেন—ফুটবল তাঁকে সবকিছু দিয়েছে, শুধু একটি সুখের সমাপ্তি দিতে পারেনি।
‘মানুষ চলে যায়, থেকে যায় তার স্বপ্ন,
থেকে যায় তার সাহসের গল্প।
যে আলো একদিন মাঠ আলোকিত করেছিল,
সে আলো নিভে গেলেও পথ দেখিয়ে যায় বহু দূর।’
কেভিন কিগানও তেমনই। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর সাহস, আবেগ, নেতৃত্ব আর ফুটবলের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেই যাবে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—
‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান,
তাপবিমোচন করুণ করুণ।’
কেভিন কিগানের শরীর হয়তো আজ মাটির কাছে সমর্পিত। কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে, নিউক্যাসলের গ্যালারিতে, লিভারপুলের স্মৃতিতে, হামবুর্গের গর্বে এবং কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে তিনি থেকে যাবেন একজন মানুষ হিসেবে, যিনি বিশ্বাস করতেন আবেগ দুর্বলতা নয়; আবেগই মানুষকে কিংবদন্তি বানায়।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা