অকালপ্রয়াণে জার্সির অবসরের যত ঘটনা
কোনো কীর্তিমানের স্মরণে দলগুলোর জার্সি তুলে রাখার নজির আছে প্রচুর। তবে অকালপ্রয়াণে জার্সিকে অবসরে পাঠানোর নজির অনেকটাই কম। এ তালিকার সর্বশেষ সংযোজন, লিভারপুলের পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড ডিয়েগো জোতা; তাঁকে স্মরণ করে লিভারপুল আজীবনের জন্য অবসরে পাঠিয়েছে তাঁর ব্যবহৃত ২০ নম্বর জার্সিটিকে। ফুটবলে এমন নজির আছে আরও। আজ আলাপ করা যাক সেসব নিয়েই।
ফেদেরিকো পিসানি
ইতালিয়ান এই ফরোয়ার্ড ১৯৯৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর; জাতীয় দলের হয়েও হয়নি অভিষেক। তাঁর মৃত্যুর পর ইতালিয়ান ক্লাব আটলান্টা বারগামাস্কা ক্যালসিও তাঁর ব্যবহৃত ১৪ নম্বর জার্সিটিকে পাঠিয়ে দিয়েছে অবসরে।
রেমন্ড ব্যারি ব্যাঙ্কোট জোন্স
মূলত তিনি রে জোন্স নামেই ছিলেন পরিচিত। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তাঁরই জন্মশহর ইস্ট হ্যামে। ২০০৭ সালে তিনি নিজের ১৯তম জন্মদিনের মাত্র তিন দিন আগে মৃত্যুবরণ করেন। দুঃখজনক বিষয় হলো, নিজের মৃত্যুর মাত্র ২৩ দিন আগেই তিনি পেয়েছিলেন বাহন চালনার সনদটি। মৃত্যুর সময় তাঁর হয়েছিল সবে ইংল্যান্ড যুবদলের হয়ে অভিষেক। ক্লাব পর্যায়ে খেলতেন কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্সের হয়ে। নিজেদের যুবদল থেকে উঠে আসা জোন্সের মৃত্যুর পর তাঁর ব্যবহৃত ৩১ নম্বর জার্সিটি চিরতরে অবসরে পাঠিয়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ।
জুনিয়র মালান্দা
ব্রাসেলস, আন্ডারলেখট, লিঁলের মতো দলের যুবদলে খেলার পর জার্মান ক্লাব ভলফসবার্গের মূল দলের হয়েও খেলেছিলেন এই বেলজিয়ান ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। বেলজিয়ামের হয়ে খেলেছিলেন যুব পর্যায়ে। শিগগিরই হয়তো ডাক আসত মূল দল থেকেও। তবে এর আগেই সব হয়ে গেল শেষ। ২০ বছর বয়সে জার্মানিতে সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় তাঁর প্রাণ। বেলজিয়ান তারকা ডিফেন্ডার কেভিন ডি ব্রুইনারের সঙ্গে তাঁর ছিল ভীষণ বন্ধুত্ব। দুজন একসঙ্গে খেলতেন ভলফসবার্গে। তাঁর মৃত্যু বেশ নাড়া দিয়েছিল ডি ব্রুইনাকেও। মালান্দা চলে যাওয়ার পর তাঁর ব্যবহৃত ১৯ নম্বর জার্সিটিকে চিরদিনের জন্য অবসরে পাঠিয়ে দিয়েছে জার্মান ক্লাবটি।
এমিলিয়ানো সালা
সত্যি বলতে কি, বিশ্ববাসীকে প্রথম আক্ষরিকভাবেই স্তব্ধ করে দিয়েছিল সালার মৃত্যুটাই। ২০১৮-১৯ মৌসুমের শীতকালীন দলবদলে ফরাসি ক্লাব নঁতে থেকে ইংলিশ ক্লাব কার্ডিফ সিটিতে যোগদান করার কথা ছিল সালার। আকাশপথে যাচ্ছিলেন তিনি ইংল্যান্ডেই। কিন্তু মাঝআকাশে বিমান হয় বিধ্বস্ত, অতঃপর...
সালা কখনো খেলেননি আর্জেন্টিনার হয়ে যুব পর্যায়ে। সম্ভাবনা ছিল না মূল দলের হয়ে খেলারও। কিন্তু ২৮ বছর বয়সে বিদায় নেওয়ার পরও তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী ছিল অজস্র। তাঁকে স্মরণ করে তাঁর ব্যবহৃত ৯ নম্বর জার্সিটিকে চিরতরে অবসরে পাঠিয়েছে নঁতে।
হোসে অ্যান্টোনিও রেয়েস ক্যাল্ডেরন
৩৫ বছর বয়সে স্পেনে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। সঙ্গে ছিলেন তাঁর দুইজন কাজিন; যাঁদের মধ্যে একজন বেঁচে গিয়েছিলেন সৌভাগ্যক্রমে। স্পেনের হয়ে খেলেছিলেন তিনি বিশ্বকাপ, ছিলেন দলটির ২০০৬ বিশ্বকাপের দলে। এ ছাড়া ধারে খেলেছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে, খেলেছিলেন আর্সেনাল এবং অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে। সেভিয়ার যুবদল থেকে উঠে আসা এই উইঙ্গার সেভিয়ার হয়ে জিতেছিলেন উয়েফা ইউরোপা লিগ শিরোপাও।
মৃত্যুর সময় রেয়েস খেলছিলেন স্প্যানিশ ক্লাব এক্সট্রেমাদুরার হয়ে। তাঁর স্মরণে ক্লাবটি তাঁর ব্যবহৃত ১৯ নম্বর জার্সিটিকে পাঠিয়েছে অবসরে।
ডিয়েগো জোতা
স্পেনের জামোরায় সড়ক দুর্ঘটনায় সহোদর আন্দ্রে সিলভা সমেত মৃত্যুবরণ করা ২৮ বছর বয়সী পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড ডিয়োগো জোতার স্মৃতি এখনো তরতাজা ফুটবলপ্রেমীদের মনে। লিভারপুলের খেলোয়াড় থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা জোতার স্মরণে ক্লাবটি তাঁর ব্যবহৃত ২০ নম্বর জার্সিকে পাঠিয়েছে আমৃত্যু অবসরে; বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে ক্লাবটির এ উদ্যোগটিও।
একটুখানি কাকতাল
শেষপাতে একটি কাকতালীয় বিষয় নিয়ে বলা যাক। ফুটবলারদের অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনাই ঘটেছে স্পেনে; এখানেই বললাম জোতা আর রেয়েসের কথা। স্পেনে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে লরি কানিংহামেরও। যাঁরা কানিংহামের ব্যাপারে জানেন না, তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলে রাখি; কানিংহাম ছিলেন স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে খেলা প্রথম কোনো ইংলিশ ফুটবলার। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে প্রায় পাঁচ মৌসুম খেলার পর তিনি খেলেছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়েও। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইংলিশদের প্রতিনিধিত্ব করা কানিংহাম মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮৯ সালে, মাদ্রিদে। তখন তিনি খেলতেন স্প্যানিশ ক্লাব রায়ো ভ্যাল্লেকানোর হয়ে, তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৩ বছর।
সড়ক দুর্ঘটনায় ফুটবলারদের মৃত্যুর হার স্পেনে বেশি হওয়াটা নেহাতই কাকতালীয় হয়তো। তবে এ আলাপে মুখ্য বিষয় তা নয়। এখানে মুখ্য আলাপ হলো দলগুলো তাদের খেলোয়াড়দের সম্মানিত করার সৌন্দর্যটা। ফুটবলটা আসলেই ভদ্রলোকেরই খেলা!
মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা