রোনালদো ছাড়াই কি পর্তুগাল বেশি ভারসাম্যপূর্ণ দল
দুই দশকের বেশি সময় ধরে পর্তুগাল ফুটবলের পরিচয় যেন একটি নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ—ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। গোলের প্রয়োজন হোক কিংবা নেতৃত্বের, পর্তুগালের বড় মুহূর্তগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে তিনি শুধু ম্যাচ জেতাননি, বদলে দিয়েছেন একটি দেশের ফুটবল–মানসিকতাও। কিন্তু সময়ের নিজস্ব নিয়ম আছে। নতুন প্রজন্ম উঠে আসে, দলের কাঠামো বদলায়, আর ফুটবলও ধীরে ধীরে একজন তারকার দল থেকে একটি সমষ্টিগত সিস্টেমে রূপ নেয়। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে—রোনালদো ছাড়াই কি পর্তুগাল ভারসাম্যপূর্ণ দল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু একটি ম্যাচের দিকে তাকালে হবে না। দেখতে হবে গত কয়েক বছরে পর্তুগালের খেলার ধরন কীভাবে বদলেছে এবং সেই পরিবর্তনের মধ্যে রোনালদোর বর্তমান ভূমিকা কোথায় দাঁড়িয়ে। রোনালদো ছাড়া ম্যাচে পর্তুগাল গড়ে ২.৮টি গোল করেছে, যেখানে রোনালদো থাকলে গোল করার গড় ২.২। রোনালদোর উপস্থিতি যে পর্তুগালকে দুর্বল করে দেয়, এমন সিদ্ধান্ত অবশ্য এই পরিসংখ্যান থেকে টানা যায় না। তবে এটি ইঙ্গিত দেয় যে তাঁর অনুপস্থিতিতে আক্রমণের দায়িত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি খেলোয়াড়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচে বলের দখল, পাসিং এবং আক্রমণাত্মক উদ্যোগ—সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিল পর্তুগাল। ম্যাচের ছয় মিনিটেই পেদ্রো নেতোর নিখুঁত ক্রসে হেডে গোল করেন জোয়াও নেভেস। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে খেলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছেই রাখে ইউরোপীয় দলটি। ম্যাচে তাদের বল দখল ছিল ৭৫ শতাংশ, পাস ৭৬৯টি, যার সফলতার হার ৯৩ শতাংশ। শট নিয়েছে ৯টি, যার মধ্যে ৩টি ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে ডিআর কঙ্গোর শট ছিল ৮টি, অন-টার্গেট মাত্র ২টি। কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই—সব সময় পরিসংখ্যান ফলাফল নির্ধারণ করে না। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে আর্থার মাসুয়াকুর ক্রস থেকে ইয়োয়ান উইসার হেডে সমতায় ফেরে কঙ্গো। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে একাধিক আক্রমণ করেও জয়ের গোল খুঁজে পায়নি পর্তুগাল।
ম্যাচটি দেখিয়েছে, বর্তমান পর্তুগাল এখনো খেলার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, বলের দখল রাখতে পারে এবং সুযোগও তৈরি করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি আরেকটি প্রশ্নও সামনে এনেছে—ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণের মুহূর্তে দলটি কতটা কার্যকর?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রোনালদোর বর্তমান অবস্থানকে বাস্তবতার আলোয় দেখতে হবে। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হলেও রোনালদো এখন ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছেন। একসময় তিনি একাই ম্যাচের গতি বদলে দিতে ডিফেন্ডারদের পেছনে ফেলে ছুটে যেতেন। তাঁর ভূমিকা এখন অনেক বেশি বক্সের ভেতরের ফিনিশার এবং অভিজ্ঞ নেতা হিসেবে। ফলে আক্রমণের গতি, প্রেসিং এবং ট্রানজিশনের দায়িত্ব এখন আগের চেয়ে বেশি বহন করছে ভিটিনিয়া, জোয়াও নেভেস, ব্রুনো ফার্নান্দেস ও বার্নার্দো সিলভার মতো ফুটবলাররা। এটি কোনো সমালোচনা নয়; বরং সময়ের স্বাভাবিক বাস্তবতা। আর এই পরিবর্তনই বর্তমান পর্তুগালকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও সমষ্টিনির্ভর করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন কিছু ম্যাচও দেখা গেছে, যেখানে রোনালদোর অনুপস্থিতিতে পর্তুগাল আক্রমণে আরও সমষ্টিগত চেহারা দেখিয়েছে। ২০২৩ সালে ইউরো বাছাইপর্বে লুক্সেমবার্গের বিপক্ষে ৯-০ গোলের জয়ে রোনালদো ছিলেন না। সেই ম্যাচে ছয়জন ভিন্ন খেলোয়াড় গোল করেন। গনসালো ইনাসিও, গনসালো রামোস, ব্রুনো ফার্নান্দেস, জোয়াও ফেলিক্স ও রিকার্দো হোর্তা—সবার অবদান ছিল স্কোরশিটে। আবার ২০২৫ সালে আর্মেনিয়ার বিপক্ষে ৯-১ গোলের জয়েও রোনালদো ছিলেন অনুপস্থিত। সেই ম্যাচে জোয়াও নেভেস ও ব্রুনো ফার্নান্দেস হ্যাটট্রিক করেন, গোল আসে একাধিক উৎস থেকে। অবশ্য এই ফলগুলো প্রমাণ করে না যে রোনালদো না থাকলেই পর্তুগাল ভালো খেলে। তবে এগুলো অন্তত দেখায় যে বর্তমান পর্তুগালে আক্রমণ আর একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরশীল নয়।
বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পর্তুগাল এখন রোনালদো-পরবর্তী সময়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। অর্থাৎ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আর রোনালদোর বিকল্প খোঁজা নয়; বরং এমন একটি দল গড়ে তোলা, যা রোনালদো থাকুক বা না থাকুক—একই মানের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলতে পারে। যদিও সেই পরিবর্তনকে তারা কোনো নাটকীয় ঘটনা হিসেবে দেখছে না। পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েঙ্কাও বলেছেন, ‘রোনালদো সব সময় পর্তুগালের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকবেন, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনাও সমানভাবে এগিয়ে চলছে।’
এ বক্তব্যই বর্তমান পর্তুগালের বাস্তবতাকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে। তারা একদিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়কে সম্মান জানাচ্ছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের জন্য জায়গাও তৈরি করছে।
আসলে বর্তমান বিতর্কটি ‘রোনালদো ভালো নাকি খারাপ’—এই প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হলো আধুনিক পর্তুগালের সবচেয়ে কার্যকর রূপ কোনটি?
তারা এমন একটি দল, যেখানে সবকিছু একজন কিংবদন্তির ওপর নির্ভর করে, নাকি এমন একটি দল, যেখানে দায়িত্ব ভাগ করে নেন একাধিক খেলোয়াড়?
ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচ সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—পর্তুগাল এখন আর শুধু রোনালদোর দল নয়। তারা ধীরে ধীরে এমন একটি দলে পরিণত হচ্ছে, যেখানে জোয়াও নেভেস, ভিটিনিয়া, ব্রুনো ফার্নান্দেস, নুনো মেন্দেস কিংবা বার্নার্দো সিলভারাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রোনালদো পর্তুগালের ইতিহাস বদলে দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান পর্তুগালের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো তারা এমন একটি দল হয়ে উঠছে, যেখানে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নায়ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাঁর অনুপস্থিতিতেও দল নিজেদের পরিচয় ও প্রতিযোগিতামূলক মান ধরে রাখতে সক্ষম। আর সে কারণেই আজকের প্রশ্নটি রোনালদোর উত্তরসূরি কে—সেটি নয়; বরং রোনালদো-পরবর্তী যুগে পর্তুগাল কতটা সফলভাবে নিজেদের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারে—সেটিই।
সাধারণ সম্পাদক, সাতক্ষীরা বন্ধুসভা