প্রতিভা যথেষ্ট থাকার পরও নেইমারের গল্পটা অসম্পূর্ণ কেন
কিছু খেলোয়াড় আছেন যাঁদের ক্যারিয়ারকে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যায় না। নেইমার জুনিয়র সেই বিরল তালিকার অন্যতম নাম। গোল, ট্রফি কিংবা ব্যক্তিগত সাফল্যের বাইরেও তাঁর গল্পটি প্রত্যাশা, চাপ, প্রতিভা, বিতর্ক ও অপূর্ণতার এক জটিল মিশ্রণ।
২০১০ বিশ্বকাপের হতাশার পর ব্রাজিল যখন নতুন পথ খুঁজছিল, তখন মাত্র ১৮ বছর বয়সে জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে নেইমারের। সে সময় বিশ্ব ফুটবলে লিওনেল মেসি ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত এক সুপারস্টার। ব্রাজিলও যেন নিজেদের জন্য একজন ‘মেসি’ খুঁজে পেয়েছিল নেইমারের মধ্যে। সেখান থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ যাত্রা—নিজেকে প্রমাণ করার পাশাপাশি অন্য কারও সঙ্গে তুলনার বোঝা বহনের যাত্রা।
নেইমার এমন একজন ফুটবলার, যিনি একই সঙ্গে মুগ্ধতা ও বিরক্তির জন্ম দিয়েছেন। তাঁর অসাধারণ দক্ষতা যেমন দর্শকদের বিমোহিত করেছে, তেমনি মাঠে তাঁর আচরণ নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। কিন্তু দর্শকেরা প্রায়ই ভুলে যায়, তিনি এমন একজন মানুষ, যাঁর ওপর আরোপিত প্রত্যাশার ভার হয়তো তাঁর প্রকৃত সত্তাকে আড়াল করে দিয়েছে।
২০১৮ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে পরাজয়ের পর কাজানের স্টেডিয়ামের বাইরে একা দাঁড়িয়ে থাকা নেইমারের ছবি আজও অনেকের মনে গেঁথে আছে। মাথা নিচু, কাঁধ নুয়ে থাকা সেই দৃশ্য যেন একজন খেলোয়াড়ের নয়; বরং একটি দেশের অপূর্ণ স্বপ্নের প্রতীক। মাত্র ২৬ বছর বয়সেই তখন মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপ জয়ের সবচেয়ে বড় সুযোগটি হয়তো হাতছাড়া হয়ে গেছে।
সেই ম্যাচে ব্রাজিলের হার পুরোপুরি নেইমারের কারণে না হলেও, তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠা কৌশলগত ভারসাম্যহীনতা বেলজিয়াম দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছিল। তাঁর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে দলকে যে সমন্বয় করতে হতো, সেটিই শেষ পর্যন্ত দুর্বলতায় পরিণত হয়।
আসলে সমস্যার শুরু আরও আগে। ২০১১ সালের কোপা আমেরিকায় সান্তোসের হয়ে কোপা লিবার্তাদোরেস জয়ের নায়ক হিসেবে আর্জেন্টিনায় পৌঁছেছিলেন নেইমার। কিন্তু ভেনেজুয়েলার রবার্তো রোসালেস এবং পরে প্যারাগুয়ের দারিও ভেরনের কঠোর মার্কিংয়ের সামনে তিনি অস্বস্তিতে পড়েন। সেখান থেকেই প্রতিপক্ষরা একটি বিষয় বুঝে যায়—শারীরিক চাপে নেইমারকে বিচলিত করা সম্ভব।
পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁকে নিয়মিত কঠিন ট্যাকলের মুখে পড়তে হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি প্রায়ই ফাউল বাড়িয়ে দেখানো, সংস্পর্শের আগেই পড়ে যাওয়া কিংবা নাটকীয় প্রতিক্রিয়া দেখানোর অভিযোগে সমালোচিত হন। একসময় এটি যেন ফুটবলের সবচেয়ে বিরক্তিকর দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছিল—প্রতিপক্ষের আক্রমণাত্মক খেলা বনাম নেইমারের অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া।
এই দ্বন্দ্বের চরম পরিণতি দেখা যায় ২০১৪ বিশ্বকাপে। কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে হুয়ান কামিলো জুনিগার হাঁটুর আঘাতে তাঁর মেরুদণ্ডে চিড় ধরে। ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ব্রাজিলে এর প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ফোরক। পরদিন রিও ডি জেনেইরোর পরিবেশ ছিল যেন জাতীয় শোকের।
সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে মাঠে নামার আগে ব্রাজিলের আবেগ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেন, নেইমার ছাড়া জয় অসম্ভব। ডিফেন্ডার ডেভিড লুইজ জাতীয় সংগীতের সময় তাঁর জার্সি হাতে তুলে ধরেন। কিন্তু আবেগের সেই উন্মাদনার মধ্যেই জার্মানি ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ফলাফল উপহার দেয়—৭-১ ব্যবধানে জয়।
ব্রাজিল যেন নেইমারকে এমন এক ত্রাণকর্তার আসনে বসিয়েছিল, যেখানে পৌঁছানোর ক্ষমতা কোনো ফুটবলারের পক্ষেই বাস্তবসম্মত নয়।
২০১৫ সালে চিলিতে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকায় কলম্বিয়ার উসকানিতে মাথা গরম করে লাল কার্ড দেখেন নেইমার এবং পরে চার ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পান। অথচ ঠিক এক মাস আগেই বার্সেলোনার হয়ে তিনি ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মৌসুম শেষ করেছিলেন। লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেজকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দলকে ট্রেবল জয়ে নেতৃত্ব দেন এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে জুভেন্টাসকে হারানোর পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
২০১৭ সালে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনের বিপক্ষে বার্সেলোনার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের অন্যতম নায়ক ছিলেন নেইমার। এরপরই রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে তিনি পিএসজিতে যোগ দেন। অনেকের ধারণা, মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে নিজেকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে পিএসজিতে গিয়ে তিনি ক্লাবটির বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ হয়ে ওঠেন, নিজের স্বপ্নের পূর্ণতা খুঁজে পাননি।
পরবর্তী সময়ে মেসিও পিএসজিতে যোগ দেন। কিন্তু সেখানে বার্সেলোনার সেই জাদুকরি আক্রমণভাগ আর তৈরি হয়নি। অন্যদিকে মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জিতে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শূন্যতা পূরণ করেন।
২০২২ বিশ্বকাপেও একঝলক দেখা গিয়েছিল নেইমারের। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে তাঁর দুর্দান্ত গোল ব্রাজিলকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্রোয়াটদের দৃঢ়তা আবারও সেই পথ রুদ্ধ করে।
নেইমারের ক্যারিয়ারকে ব্যর্থ বলা অন্যায় হবে। কিন্তু এটাও সত্য যে তাঁর জন্য যে উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেখানে পৌঁছানো কঠিন হলেও অসম্ভব ছিল না। তবে নিয়তি যে ভিন্ন কিছু লিখে রেখেছে। একের পর এক ইনজুরি সেই প্রত্যাশার চাপকে গল্পের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিতে পরিণত করেছে।
এখন, ৩৪ বছর বয়সে, নতুন করে আলোচনায় এসেছেন নেইমার। ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাঁকে বিশ্বকাপ দলে রেখেছেন। অনেকেই এটিকে শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন—একটি অসমাপ্ত গল্পের শেষ অধ্যায় লেখার সুযোগ।
তবে বাস্তবতা কঠিন। ইনজুরির কারণে গত তিন বছরে নেইমার খুব বেশি ম্যাচ খেলতে পারেননি। জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পেরেছেন মাত্র দুটি ম্যাচ। তাও ২০২৩ সালে। এর মধ্যে আবারও চোটে পড়েছেন। সেই চোট নিয়েই তাঁকে বিশ্বকাপের ২৬ সদস্যের দলে রাখা হয়েছে। তাই তাঁর নির্বাচনকে অনেকেই বর্তমান পারফরম্যান্সের পুরস্কার নয়; বরং সম্ভাবনার ওপর বাজি হিসেবে দেখছেন।
প্রশ্ন হলো, এটি আনচেলত্তির সাহসী বিশ্বাস নাকি ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের সেই মানসিকতারই আরেকটি প্রতিফলন—যেখানে তারা এখনো এমন একজন নায়ক খুঁজছে, যিনি তাদের নিজস্ব মেসি হয়ে উঠবেন?
উত্তর এখনো অজানা। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, নেইমারের গল্প শুধু ট্রফি বা ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি এমন এক প্রতিভার গল্প, যিনি সারা জীবন নিজের পরিচয় খুঁজেছেন, অথচ পৃথিবী তাঁকে অন্য কারও প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখতে চেয়েছে।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা