ব্র্যাডম্যানকে আটকাতে কেন বেছে নেওয়া হয়েছিল ‘বডিলাইন’
ক্রিকেটকে বলা হয় ভদ্রলোকের খেলা। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, কিন্তু প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মানও থাকে সমানভাবে। তবে ইতিহাসে এমন একটি সিরিজ আছে, যেখানে জয়ের নেশা খেলাটির চিরচেনা সৌন্দর্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। ব্যাট-বলের সেই লড়াই শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল সংবাদপত্র, সংসদ, এমনকি ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কেও। ক্রিকেট ইতিহাসে সেই অধ্যায়টি পরিচিত বডিলাইন সিরিজ নামে।
১৯৩০ সালের অ্যাশেজ সিরিজে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং বিস্ময় ডন ব্র্যাডম্যান এমন এক কীর্তি গড়েছিলেন, যা আজও অটুট। পাঁচ টেস্টে তিনি করেছিলেন ৯৭৪ রান, একটি অ্যাশেজ সিরিজে যা এখনো সর্বোচ্চ। তাঁর ব্যাটিং ছিল এতটাই প্রভাবশালী যে ইংল্যান্ডের বোলাররা যেন কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছিলেন না। মাঠে তিনি যতক্ষণ থাকতেন, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও যেন অস্ট্রেলিয়ার হাতেই থাকত।
ইংল্যান্ডে ফিরে সেই পরাজয় মেনে নিতে পারেননি অনেকেই। বিশেষ করে দলের অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্র্যাডম্যানকে থামানো না গেলে অ্যাশেজ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। তাই পরবর্তী অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে তিনি এমন একটি পরিকল্পনা করেন, যা পরে ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত কৌশল হিসেবে পরিচিতি পায়। জার্ডিনের পরিকল্পনার মূল অস্ত্র ছিলেন ইংল্যান্ডের দ্রুতগতির বোলার হ্যারল্ড লারউড। তাঁর কাজ ছিল বারবার ব্যাটসম্যানের শরীর লক্ষ্য করে শর্ট পিচ বল করা। একই সময়ে লেগ সাইডে দাঁড় করানো হয় একাধিক ফিল্ডার। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট, ব্যাটসম্যান আত্মরক্ষার জন্য ব্যাট তুললে বল গিয়ে ফিল্ডারের হাতে ধরা পড়বে। সেই সময় এই কৌশলকে বলা হতো লেগ থিওরি, কিন্তু পরে এটি সবার কাছে পরিচিত হয়ে যায় বডিলাইন নামে।
আজকের ক্রিকেটে হেলমেট, আর্মগার্ড, চেস্ট গার্ড কিংবা আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম রয়েছে। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকের ক্রিকেট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্যাটসম্যানদের মাথায় কোনো হেলমেট ছিল না। ফলে শরীর লক্ষ্য করে দ্রুতগতির বল করা শুধু কৌশল নয়, অনেকের কাছে ছিল প্রাণঘাতী ঝুঁকি।
১৯৩২ সালের শেষ দিকে শুরু হয় ইংল্যান্ডের অস্ট্রেলিয়া সফর। সিরিজের প্রথম টেস্ট ব্রিসবেনে। ডন ব্র্যাডম্যান অসুস্থ থাকায় ম্যাচটি খেলেননি। সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগায় ইংল্যান্ড। লারউডের বডিলাইন বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ভেঙে পড়ে এবং ইংল্যান্ড সহজেই ম্যাচ জিতে এগিয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় টেস্টে ব্র্যাডম্যান দলে ফিরলেন। সবাই ভেবেছিল তাঁর ব্যাটেই থেমে যাবে ইংল্যান্ডের নতুন পরিকল্পনা। কিন্তু বাস্তবতা ছিল আরও কঠিন। যদিও ব্র্যাডম্যান এই ম্যাচে শতক হাঁকান, তবু বডিলাইন কৌশল অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য ব্যাটসম্যানকে ভীষণ চাপে ফেলে দেয়। ইংল্যান্ড বুঝে যায়, তাদের পরিকল্পনা কাজ করছে।
সিরিজের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত আসে তৃতীয় টেস্টে, অ্যাডিলেডে। ইংল্যান্ডের একের পর এক শর্ট পিচ বল অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের শরীরে আঘাত করতে থাকে। দর্শকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। হঠাৎ একটি বল অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক বিল উডফুলের বুকে সজোরে আঘাত করে। তিনি ব্যথায় কুঁকড়ে গেলেও খেলা চালিয়ে যান। পুরো স্টেডিয়াম মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় যখন অস্ট্রেলিয়ার উইকেটকিপার বার্ট ওল্ডফিল্ড মাথায় আঘাত পেয়ে গুরুতর আহত হন। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে মাঠ ছাড়তে হয়। যদিও পরে জানা যায়, তাঁর আঘাত সরাসরি বডিলাইন ডেলিভারিতে নয়, বরং নিজের ব্যাটে লেগে বল উঠে আসায় হয়েছিল। তবু জনমনে এর প্রভাব ছিল প্রবল। সংবাদপত্রের পাতায় তখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এটি কি সত্যিই ক্রিকেট, নাকি খেলার নামে অতিরিক্ত আগ্রাসন?
অস্ট্রেলিয়ার সংবাদপত্রগুলো সরাসরি ‘নট ক্রিকেট!’ শিরোনামে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে। অস্ট্রেলিয়ার দর্শকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ড দলের বিরুদ্ধে স্লোগান শুরু হয়। সংবাদমাধ্যম প্রতিদিন বডিলাইন নিয়ে তীব্র সমালোচনা করতে থাকে। বিষয়টি শুধু খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড ইংল্যান্ডের মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবকে (এমসিসি) কড়া ভাষায় টেলিগ্রাম পাঠিয়ে জানায়, এই কৌশল ক্রিকেটের চেতনার পরিপন্থী এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক। পাল্টা জবাবে এমসিসি জানায়, ইংল্যান্ড কোনো নিয়ম ভঙ্গ করেনি।
এই চিঠি ও পাল্টা চিঠি একসময় দুই দেশের রাজনৈতিক মহলেও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ সরকার এবং অস্ট্রেলিয়ান সরকার পর্যন্ত পরিস্থিতির দিকে নজর রাখে। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, যদি উত্তেজনা আরও বাড়ত, তাহলে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারত। একটি ক্রিকেট সিরিজ যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে, বডিলাইন তারই উদাহরণ। সমালোচনা যতই বাড়ুক, মাঠে ইংল্যান্ডের পরিকল্পনা সফল হয়েছিল। তারা সিরিজটি ৪–১ ব্যবধানে জিতে অ্যাশেজ পুনরুদ্ধার করে। কিন্তু এই জয়ের মূল্যও কম ছিল না।
ডগলাস জার্ডিনকে কেউ কৌশলী অধিনায়ক হিসেবে প্রশংসা করলেও অনেকেই তাঁকে ক্রিকেটের ভদ্রতা নষ্ট করার জন্য দায়ী করেন। অন্যদিকে হ্যারল্ড লারউড, যিনি অধিনায়কের নির্দেশ পালন করেছিলেন, তিনিই সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হন। পরে তাঁকে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হয়। কিন্তু তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি যা করেছেন, অধিনায়কের নির্দেশেই করেছেন, তাই ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এর ফলও তাঁকে ভোগ করতে হয়। এরপর আর কখনো ইংল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনি ফিরতে পারেননি। জীবনের শেষ দিকে তিনি অস্ট্রেলিয়াতেই বসবাস শুরু করেন, যে দেশ একসময় তাঁর বোলিংকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করেছিল।
বডিলাইন বিতর্কের পর ক্রিকেট বিশ্বও চুপ করে বসে থাকেনি। ধীরে নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়। লেগ সাইডে নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি ক্লোজ ফিল্ডার রাখার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। পরে বিপজ্জনক শর্ট পিচ বোলিং নিয়েও নতুন নির্দেশনা আসে। অর্থাৎ বলা যায়, বডিলাইন শুধু একটি বিতর্কিত সিরিজ নয়, এটি ক্রিকেটের আইন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিবর্তনেরও অন্যতম কারণ।
আজ প্রায় এক শতাব্দী পরে দাঁড়িয়ে বডিলাইন সিরিজকে শুধু ইংল্যান্ডের একটি অ্যাশেজ জয় হিসেবে দেখা হয় না। এটি খেলাধুলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে, জয়ের জন্য কত দূর যাওয়া উচিত? নিয়মের ভেতরে থাকলেই কি সবকিছু ন্যায্য হয়ে যায়, নাকি খেলাধুলারও একটি নৈতিক সীমা আছে? ক্রিকেটের ইতিহাসে অসংখ্য সিরিজ এসেছে, অসংখ্য রেকর্ড গড়েছে ও ভেঙেছে। কিন্তু খুব কম সিরিজই আছে, যেগুলো মাঠের ফলাফলের চেয়ে বিতর্কের জন্য বেশি স্মরণীয়। বডিলাইন তেমনই একটি অধ্যায়। এটি মনে করিয়ে দেয়, কখনো একটি কৌশল শুধু ম্যাচের ফল বদলায় না, বদলে দেয় পুরো খেলার ইতিহাসও।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা