হারের আড়ালে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিবর্তন

টেস্টে বড় দলকে হারানোর সক্ষমতা বাংলাদেশ দেখিয়েছে। এবার সেই সক্ষমতাকেই নিয়মিত পারফরম্যান্সে রূপ দিতে হবেশামসুল হক

অস্ট্রেলিয়ার কাছে দ্বিতীয় টেস্টে দুই দিনের মধ্যেই ইনিংস ও ৫১ রানে হার। দুই ইনিংসে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৬৪ ও ৯৫ রান—ফলাফলটি নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। এমন একটি ম্যাচের পর ব্যর্থতার কারণ খোঁজা স্বাভাবিক। তবে শুধু দ্বিতীয় টেস্টের ফল দিয়ে অস্ট্রেলিয়া সফর কিংবা বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে বিচার করলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কারণ, একই সিরিজে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়েছে এবং সিরিজ শেষে প্রথমবারের মতো টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে উঠে এসেছে ষষ্ঠ স্থানে।

এই বৈপরীত্যই বাংলাদেশের বর্তমান টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। দলটি এখনো ধারাবাহিকতার জায়গায় পৌঁছায়নি, কিন্তু বড় দলের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সামর্থ্য যে তৈরি হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়া সফর তার স্পষ্ট প্রমাণ। বিশেষ করে বোলিংয়ে যে পরিবর্তনের আভাস মিলছে, সেটি টাইগারদের টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক।

বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘদিনের দুর্বলতাগুলোর একটি ছিল বিদেশের মাটিতে পেস বোলিংয়ের কার্যকারিতা। উপমহাদেশের তুলনামূলক ধীর উইকেটে সফল হওয়া বোলারদের জন্য অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার গতি ও বাউন্সের কন্ডিশনে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। অস্ট্রেলিয়া সফর সেই জায়গায় পরিবর্তনের বড় ইঙ্গিত দিয়েছে।

টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি। তানজিদের উদ্‌যাপন
শামসুল হক

দ্বিতীয় টেস্টে শরীফুল ইসলামের ৪৮ রানে ৭ উইকেট সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো বোলারের এটিই সেরা ইনিংস বোলিং। তবে রেকর্ডের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো পারফরম্যান্সটির পটভূমি। অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপকে তাদের নিজেদের কন্ডিশনে চাপে ফেলার সক্ষমতা বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে।

প্রথম টেস্টে হাসান মাহমুদের কার্যকর বোলিং এবং পরের ম্যাচে শরীফুলের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—পেস আক্রমণে এখন শুধু একজনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। ভিন্ন ভিন্ন ম্যাচে ভিন্ন পেসার দায়িত্ব নিতে পারছেন। টেস্ট ক্রিকেটে এই গভীরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচ দিনের ক্রিকেটে একজন বোলারের অসাধারণ পারফরম্যান্সের চেয়েও জরুরি পুরো বোলিং ইউনিটের ধারাবাহিক চাপ। বাংলাদেশের পেস আক্রমণে সেই সমন্বয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন এই পেসারদের নিয়মিত টেস্ট খেলার সুযোগ দেওয়া, বিদেশি কন্ডিশনে আরও অভিজ্ঞ করে তোলা এবং ইনজুরি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাঁদের দীর্ঘ মেয়াদে প্রস্তুত রাখা।

আরেকটি ইতিবাচক পরিবর্তন হলো, দলটি ধীরে ধীরে একক তারকার ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। অতীতে দলের সাফল্যের সঙ্গে কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটারের পারফরম্যান্স ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকত। একজন ব্যাটসম্যান বড় রান করলে কিংবা একজন বোলার ম্যাচ ঘুরিয়ে দিলে বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফিরত।
কিন্তু একটি পরিণত টেস্ট দলের জন্য এই নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর নয়। অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অন্তত বিকল্প নেতৃত্বের কিছু নমুনা দেখা গেছে। এক ম্যাচে হাসান মাহমুদ, অন্য ম্যাচে শরীফুল ইসলাম—ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ক্রিকেটার সামনে এসেছেন। মেহেদী হাসান মিরাজের মতো অলরাউন্ডারও দলের ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

বাংলাদেশের পেস বোলিং এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা
শামসুল হক

এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ পুরোপুরি তারকা-নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে গেছে। বলা যায়, সেই নির্ভরতা কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। একজন ক্রিকেটার ব্যর্থ হলে অন্য কেউ দায়িত্ব নেওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হওয়াই একটি দলের পরিণত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এই বৈচিত্র্য যত বাড়বে, দলের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও তত বাড়বে।

ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি দ্বিতীয় টেস্ট বাংলাদেশের একটি পুরোনো সমস্যাকেও নতুন করে সামনে এনেছে—বিদেশের মাটিতে ব্যাটিংয়ের ভঙ্গুরতা। দুই ইনিংসে ৬৪ ও ৯৫ রানে অলআউট হওয়া দেখিয়েছে, প্রতিকূল কন্ডিশনে দীর্ঘ সময় ব্যাট করার সক্ষমতা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়নি। দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর ছিল নাজমুল হোসেন শান্তর ৩১ রান। মুশফিকুর রহিম করেন ২৯। কোনো ব্যাটসম্যানই ৪০ রানে পৌঁছাতে পারেননি। এই পরিসংখ্যান তাই খুব বেশি ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখে না।

তবে এটিকে অস্ট্রেলিয়া সফরের সব ইতিবাচক দিককে ম্লান করে দেওয়া ব্যর্থতা হিসেবে দেখার চেয়ে ভবিষ্যতের করণীয় হিসেবে দেখা বেশি জরুরি। বোলিং ইউনিট যদি বিদেশের মাটিতে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারে, তাহলে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যাটিং ইউনিটকেও দীর্ঘ সময় ক্রিজে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বিশেষ করে নতুন বল সামলানো, প্রথম সেশনে উইকেট ধরে রাখা এবং বড় জুটি গড়ার দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। শুধু প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান থাকলেই হবে না, কঠিন কন্ডিশনে মানসিক ও কৌশলগত প্রস্তুতিও বাড়াতে হবে। এখানে ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের মান, বিদেশ সফরের প্রস্তুতি এবং কন্ডিশনভিত্তিক অনুশীলন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আরও পড়ুন
সবাই শান্ত থাকো—নাজমুল কি এটাই সবাইকে বলছেন!
শামসুল হক

অস্ট্রেলিয়া সিরিজ শেষে বাংলাদেশের টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে ষষ্ঠ স্থানে ওঠা তাই আলাদা গুরুত্ব বহন করে। এটি বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ অবস্থান।

র‍্যাঙ্কিং অবশ্যই একটি দলের সামর্থ্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া একটি দলের জন্য সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানো নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু একটি সংখ্যার পরিবর্তন নয়; বড় দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সক্ষমতার একটি স্বীকৃতি। তবে এই অর্জনের সঙ্গে প্রত্যাশাও বেড়ে গেছে। ছয়ে ওঠার পর বাংলাদেশের কাছ থেকে এখন আর শুধু বিচ্ছিন্ন জয় প্রত্যাশা করা হবে না; বরং নিয়মিত ভালো পারফরম্যান্সের প্রত্যাশা থাকবে। র‍্যাঙ্কিংয়ের এই অবস্থান ধরে রাখাই হবে পরবর্তী চ্যালেঞ্জ।

বিদেশের মাটিতে পেসারদের কার্যকারিতা, একাধিক ক্রিকেটারের কাছ থেকে অবদান পাওয়ার সম্ভাবনা এবং টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে সর্বোচ্চ অবস্থানে ওঠা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে পরিবর্তনের রেখাটি স্পষ্ট। এখন প্রশ্ন সামর্থ্য আছে কি না, সেটি নয়; প্রশ্ন হলো, সেই সামর্থ্য কতটা ধারাবাহিক করা যায়। বড় দলকে হারানোর সক্ষমতা বাংলাদেশ দেখিয়েছে। এবার সেই সক্ষমতাকেই নিয়মিত পারফরম্যান্সে রূপ দিতে হবে।

হারের আড়ালে তাই বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের যে ছবিটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, সেটি হতাশার নয়—পরিবর্তনের। পরিবর্তনটি এখনো অসম্পূর্ণ, তবে পথটা আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার।

সাধারণ সম্পাদক, সাতক্ষীরা বন্ধুসভা