লিওনেল মেসি—একটি প্রেমের দীর্ঘ উপাখ্যান

ফাইনাল শেষে লিওনেল মেসিরয়টার্স

প্রথম প্রেমের মতো কিছু অনুভূতির কোনো বিকল্প হয় না। মানুষ বদলায়, সময় বদলায়, কিন্তু প্রথম ভালোবাসা থেকে যায় হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর কোণে। ফুটবলের কাছে লিওনেল মেসি তেমনই এক প্রথম প্রেম।

ফুটবল খেলায় নব্বই মিনিটের লড়াইয়ের বাইরে আরেকটি পৃথিবী আছে; যেখানে আবেগ আছে, অপেক্ষা আছে, কান্না আছে, আবার সীমাহীন ভালোবাসাও আছে। সেই পৃথিবীর সবচেয়ে উজ্জ্বল নামগুলোর একটি লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।

বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে স্টেডিয়ামের আলো তখনো নেভেনি। গ্যালারিতে উল্লাস আর হতাশার দুই বিপরীত স্রোত বইছে। সেই ভিড়ের মধ্যেই এক মানুষ নীরবে চোখ মুছছিলেন। ৩৯ বছর বয়সী সেই মানুষটির কান্না হয়তো শুধুই একটি ম্যাচ হারার কান্না ছিল না। সেটি ছিল এক দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি, হাজারো স্বপ্নের ভার, আর বিদায়ের সম্ভাব্য পূর্বাভাস। মেসিকে কাঁদতে দেখে কেঁদেছে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ, এমনকি চির প্রতিপক্ষ দলগুলোর সমর্থকেরাও। কারণ, মানুষ সব সময় একজন ফুটবলারকে ভালোবাসে না, কখনো সে ভালোবাসে নিজের শৈশবকে, নিজের স্মৃতিকে, নিজের বেড়ে ওঠাকে। সেই স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙের নাম যদি হয় মেসি, তবে তাঁর চোখের জল তো নিজের চোখেও এসে জমবে।

শৈশবে লিওনেল আন্দ্রেস মেসি
ছবি: সংগৃহীত

রোজারিও শহরের ছোট্ট একটি ছেলে। জন্মগত প্রতিভা ছিল, কিন্তু শরীর ছিল দুর্বল। গ্রোথ হরমোনের সমস্যায় একসময় তাঁর স্বপ্নটাই থমকে যেতে বসেছিল। অর্থের অভাবে চিকিৎসাও ঠিকমতো হচ্ছিল না। ঠিক তখনই বার্সেলোনা ক্লাব সেই ছেলেটির হাত ধরেছিল। একটি ন্যাপকিন কাগজে লেখা চুক্তি বদলে দিয়েছিল ফুটবলের ইতিহাস।

সেই ছোট্ট ছেলেটিই একদিন হয়ে উঠলেন বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবলার। বার্সেলোনার জার্সিতে একের পর এক শিরোপা, অগণিত গোল, অসংখ্য রেকর্ড, ব্যালন ডি’অর—সবকিছু যেন নিজে থেকেই তাঁর পায়ের কাছে এসে ধরা দিয়েছিল। ফুটবল যেন তাঁর পায়ে এসে অন্য এক শিল্পে রূপ নিত।

কিন্তু মেসির জীবনের সবচেয়ে বড় গল্পগুলো কখনো সহজ ছিল না। ক্লাব ফুটবলে সবকিছু জিতেও জাতীয় দলের হয়ে বারবার ব্যর্থতার মুখ দেখতে হয়েছে তাঁকে। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে হৃদয়ভাঙা পরাজয়। সমালোচনা, ব্যঙ্গ, অপমান কিছুই বাকি ছিল না। এমনকি একসময় জাতীয় দল থেকেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
সেদিন অনেকেই বলেছিল, মেসি দেশের জন্য কিছুই করেনি।

২০২১ সালের কোপা আমেরিকার ট্রফি হাতে মেসিদের উচ্ছ্বাস

কিন্তু ভালোবাসা কখনো এত সহজে হার মানে না। তিনি ফিরেছিলেন। আবার লড়েছিলেন। নিজের জন্য নয়, দেশের জন্য। সেই ফিরে আসার গল্পটাই ইতিহাস হয়ে আছে। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপা, ২০২২ সালে কাতারের বিশ্বকাপ—যে ট্রফির জন্য সারা জীবন অপেক্ষা করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেটিও তুলে নিয়েছিলেন দুই হাতে। সেদিন শুধু আর্জেন্টিনা নয় বরং পুরো ফুটবলই হাসছিল।

কিন্তু সময় কারও জন্য থেমে থাকে না। আবারও চার বছর পর এল ফিফা বিশকাপ, আবারও আর্জেন্টিনা, আবারও মেসি।
ফাইনাল ম্যাচটি হয়তো ফুটবলীয় দিক থেকে আর্জেন্টিনার সেরা ম্যাচ ছিল না, বরং বলা যায় অকল্পনীয় বাজে। দল হিসেবেও তারা নিজেদের সেরা ছন্দে ছিল না। তবু ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন একজনই—লিওনেল মেসি। কারণ, মানুষ ফলাফলের চেয়েও বেশি মনে রাখে অনুভূতিকে। একটি ট্রফি হারানোর স্মৃতি হয়তো একদিন মুছে যাবে, কিন্তু একজন কিংবদন্তির নীরব কান্না বহুদিন বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে।

আরও পড়ুন
২০১০ বিশ্বকাপ। বিশ্বের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু তখন লিওনেল মেসি। আকাশচুম্বী প্রত্যাশা আর দায়িত্বের ভার তখন তাঁর তরুণ কাঁধে।

মেসি আসলে কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি একটি প্রজন্মের বেড়ে ওঠার গল্প।
২০১০ সালে যে ছোট্ট ছেলেটি প্রথমবার মেসির খেলা দেখে ফুটবল ভালোবাসতে শিখেছিল, আজ সে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কেউ চাকরি করছে, কেউ সংসার করছে। কিন্তু ম্যাচের দিন এখনো সেই মানুষটি শিশুর মতো টিভির সামনে বসে পড়ে। কারণ, মেসি খেলছেন। কেউ ভোর চারটায় উঠে খেলা দেখেছে। কেউ পরীক্ষার আগের রাতেও ঘুমায়নি। কেউ পরিবারের বকুনি খেয়েছে। কেউ নিজের প্রথম জার্সির জন্য সারা বছর টাকা জমিয়েছে। কেউ ভালোবাসার মানুষকে প্রথম উপহার দিয়েছে আর্জেন্টিনার একটি দশ নম্বর জার্সি। এসবই তো প্রেম।
এই প্রেমে কোনো পরিচয় লাগে না। ধর্ম লাগে না। ভাষা লাগে না। একটি বল, একটি জার্সি আর একজন মানুষ—এতেই গড়ে ওঠে কোটি মানুষের অনুভূতির পৃথিবী।

হয়তো আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই, কিংবা কয়েক মাস পরে, মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাবেন। হয়তো আরেকটি সূর্যাস্তের মতোই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। কিন্তু এই বিদায়ের অভিঘাত কেবল আর্জেন্টিনার ওপরই পড়বে না, পড়বে পুরো ফুটবল বিশ্বের ওপর।

আর্জেন্টিনা আবারও বিশ্বকাপ জিতবে। নতুন তারকা আসবে। নতুন দশ নম্বর জার্সি তৈরি হবে। নতুন ইতিহাস লেখা হবে। কিন্তু মেসির মতো একজন মানুষ কি আবার আসবেন? হয়তো আসবেন।

ফাইনালে হারের পর কান্না দমিয়ে রাখতে পারেননি লিওনেল মেসি
রয়টার্স

কিন্তু প্রথম প্রেম কি দ্বিতীয়বার ফিরে আসে?
যে শিশু মেসিকে দেখে ফুটবল ভালোবাসতে শিখেছে, তার কাছে পৃথিবীর সব মহান ফুটবলারেরও একটি সীমা থাকবে। কারণ, তার হৃদয়ে দশ নম্বর জার্সির জায়গা ইতিমধ্যেই পূর্ণ। একদিন স্টেডিয়ামে আর দেখা যাবে না সেই পরিচিত দৌড়। দেখা যাবে না বাঁ পায়ের জাদু। ধারাভাষ্যকার হয়তো আর বলবেন না ‘বলটি এখন মেসির কাছে।’ তবু তিনি থাকবেন।
থাকবেন ইউটিউবের পুরোনো হাইলাইটসে। থাকবেন শিশুদের স্বপ্নে। থাকবেন বাবার মুখে শোনা গল্পে। থাকবেন বন্ধুদের আড্ডায়। থাকবেন কোটি মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে নরম জায়গাটিতে। কারণ, কিংবদন্তিরা মাঠ ছাড়েন, কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে চলে যান না।

এটাই ফুটবলের নিয়ম। একদিন সবাইকে বিদায় নিতে হয়। পেলের হয়েছে, ম্যারাডোনার হয়েছে, ক্রুইফের হয়েছে। আজ সেই বিদায়ের ছায়া এসে পড়েছে লিওনেল মেসির দরজাতেও। তবু এই গল্পের শেষ লাইনে কোনো দুঃখ নেই। কারণ, কিছু মানুষের জীবন পরাজয়ে শেষ হয় না; তাঁরা শেষ পর্যন্ত ভালোবাসায় বেঁচে থাকেন।

লিওনেল মেসি হয়তো খুব শিগগিরই বুটজোড়া তুলে রাখবেন। কিন্তু কোটি মানুষের হৃদয়ে তাঁর নামের পাশে লেখা থাকবে একটি শব্দই ‘প্রেম’। সেই প্রেমের কাহিনি হয়তো একদিন মাঠে শেষ বাঁশি শুনবে। আর তখনই নতুন এক অর্থে, নতুন এক প্রেক্ষাপটে পূর্ণতা পাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কালজয়ী পঙ্‌ক্তি—
‘প্রেমের কাহিনি গান, হয়ে গেলো অবসান।’

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা