কেন মেসি নয়, রদ্রির হাতে উঠল গোল্ডেন বল
বিশ্বকাপের ট্রফি জয়ের উচ্ছ্বাস তখনো থামেনি। স্পেনের খেলোয়াড়েরা যখন সোনালি ট্রফি হাতে উৎসব করছেন, ঠিক তখনই ঘটল আরেক ঘটনা। টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল উঠল স্পেনের অধিনায়ক রদ্রির হাতে। মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন স্টুডিও আর ফুটবল আড্ডায় ঘুরতে শুরু করল একটাই প্রশ্ন—‘মেসি নয় কেন?’
প্রশ্নটি অযৌক্তিক নয়। লিওনেল মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি একটি প্রজন্মের আবেগ। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি আর্জেন্টিনাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছেন এবং টানা দ্বিতীয়বারের মতো দলকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন। তাই গোল্ডেন বলের মঞ্চে তাঁর পরিবর্তে রদ্রির নাম ঘোষণার পর বিস্ময় ছড়ানো স্বাভাবিক।
কিন্তু গোল্ডেন বল জনপ্রিয়তার পুরস্কার নয়, এটি প্রভাবের স্বীকৃতি। এখানে শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট নয়, পুরো টুর্নামেন্টে একজন ফুটবলার কীভাবে নিজের দলকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন, ম্যাচের গতিপথ বদলেছেন এবং ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করেছেন, সেটিই বিবেচনায় আসে।
এই জায়গায় এসে রদ্রি অন্য সবার থেকে আলাদা। স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের অভিযানের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এই দলের প্রাণ ছিলেন না কোনো স্ট্রাইকার, না কোনো উইঙ্গার। দলের প্রকৃত চালিকাশক্তি ছিলেন মাঝমাঠের একজন ফুটবলার। তাঁর নাম রদ্রি।
বল পায়ে থাকুক বা প্রতিপক্ষের দখলে, ম্যাচের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাঁর উপস্থিতি ছিল স্পষ্ট। কখন আক্রমণ গড়ে তুলতে হবে, কখন খেলার গতি কমাতে হবে, কখন ঝুঁকি নেওয়া যাবে আর কখন নিরাপদ পাস খেলতে হবে, এসব সিদ্ধান্ত যেন মুহূর্তেই নিয়ে ফেলতেন স্পেনের অধিনায়ক। অনেকেই ফুটবলকে গোলের খেলা বলেন। কিন্তু আধুনিক ফুটবল আরও অনেক বেশি কিছু। এখানে ম্যাচ জেতার আগে ম্যাচকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আর সেই নিয়ন্ত্রণই ছিল রদ্রির সবচেয়ে বড় শক্তি।
রদ্রির এই স্বীকৃতি অবশ্য হঠাৎ করে আসেনি। ২০২৪ সালে ব্যালন ডি’অর জয়ের মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, আধুনিক ফুটবলে একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারও বিশ্বের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি পেতে পারেন। দুই বছর পর বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল যেন সেই ধারাবাহিকতারই স্বাভাবিক পরিণতি।
বিশ্বকাপজুড়ে তাঁর পাসিং ছিল অসাধারণ। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি ৯৩ দশমিক ২ শতাংশ পাস সফল করেছেন, যা আসরের সেরাদের মধ্যে অন্যতম। প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে ৯৪টি সফল পাস করেছেন। প্রতিপক্ষের শেষ তৃতীয়াংশেও তাঁর পাস সফলতার হার ছিল প্রায় ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ শুধু নিজের অর্ধে নিরাপদ পাস নয়, আক্রমণাত্মক এলাকাতেও সমান কার্যকর ছিলেন রদ্রি।
ফাইনালেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তিনি ১০৬টি পাস খেলেন এবং ম্যাচের অন্যতম প্রভাবশালী ফুটবলার ছিলেন। বলের নিয়ন্ত্রণ, খেলার গতি নির্ধারণ এবং চাপের মুহূর্তে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন স্পেনের সবচেয়ে বড় ভরসা।
শুধু পাসিং নয়, রক্ষণেও ছিলেন অনন্য। পুরো বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২৬টি সফল ট্যাকল করেছেন তিনি। গ্রাউন্ড ডুয়েলে তাঁর সাফল্যের হার ছিল ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ফাইনালে বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ শতাংশে। মাঝমাঠে তাঁর উপস্থিতিই যেন ছিল স্পেনের রক্ষণব্যূহের প্রথম প্রাচীর।
তবে রদ্রির শ্রেষ্ঠত্ব শুধু পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ ছিল না। স্পেনের অধিনায়ক হিসেবে পুরো টুর্নামেন্টে তিনি ছিলেন অসাধারণ শান্ত, পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী। দল যখন চাপে পড়েছে, তখন তিনি খেলার গতি কমিয়ে সতীর্থদের সংগঠিত করেছেন। আবার সুযোগ তৈরি হলে দ্রুত পাসের আদান-প্রদানে আক্রমণের ছন্দ বাড়িয়েছেন। তরুণদের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছেন, অভিজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয় করে পুরো দলকে একটি সুসংগঠিত ইউনিটে পরিণত করেছেন।
ফাইনালে সেই নেতৃত্বই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে। মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা বারবার আক্রমণ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু স্পেনের মাঝমাঠ খুব কমই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। কারণ, মাঝমাঠে ছিলেন এমন একজন অধিনায়ক, যিনি শুধু নিজের অবস্থানই সামলাননি, পুরো দলের ছন্দও নিয়ন্ত্রণ করেছেন। রদ্রির এই শান্ত উপস্থিতিই হয়তো স্পেনকে কঠিন মুহূর্তগুলো পার করে দিয়েছে। আর সেখানেই তিনি হয়ে উঠেছেন এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলার।
ফুটবল নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা আছে, যে বেশি গোল করবে, সেরাও সে-ই। কিন্তু আধুনিক ফুটবল অনেক আগেই সেই ধারণার গণ্ডি পেরিয়ে গেছে। আজকের দিনে একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার শুধু বল কেড়ে নেন না, তিনিই দলের খেলার গতি নির্ধারণ করেন, রক্ষণ ও আক্রমণের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেন, প্রয়োজনে প্রতিপক্ষের ছন্দ ভেঙে দেন এবং নিজের দলকে ছন্দে ফেরান। স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী অভিযানে রদ্রি ঠিক সেই ভূমিকাই পালন করেছেন।
তিনি হয়তো টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা নন, সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতাও নন। কিন্তু প্রতিটি ম্যাচে তিনি এমন একটি কাজ করেছেন, যা পরিসংখ্যানের বাইরেও স্পষ্ট—তিনি ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
একজন স্ট্রাইকার হয়তো পুরো ম্যাচে ২০ থেকে ৩০ বার বল স্পর্শ করেন। একজন উইঙ্গার কয়েকটি সফল ড্রিবল দিয়ে আলোচনায় চলে আসেন। কিন্তু রদ্রি ছিলেন স্পেনের প্রায় প্রতিটি আক্রমণের সূচনাবিন্দু। বল তাঁর পা ছুঁয়েই এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। কখন ছোট পাস খেলতে হবে, কখন লম্বা পাসে খেলা ঘোরাতে হবে, কখন ঝুঁকি না নিয়ে বলের দখল ধরে রাখতে হবে—এসব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনিই। এ কারণেই ইউরোপীয় ফুটবলে তাঁকে অনেক বিশ্লেষক ‘মেট্রোনোম’ বলে অভিহিত করেন। কারণ, তিনি শুধু খেলেন না, পুরো দলের খেলার ছন্দও ঠিক করে দেন।
তাহলে কি মেসি কম ভালো খেলেছেন? একেবারেই তা নয়। ৩৯ বছর বয়সেও মেসি আবারও প্রমাণ করেছেন, বড় মঞ্চে তাঁর প্রভাব এখনো কতটা গভীর। গ্রুপ পর্ব থেকে নকআউট—প্রতিটি ধাপেই তিনি আর্জেন্টিনার আক্রমণের প্রধান ভরসা ছিলেন। তাঁর সৃজনশীলতা, নিখুঁত পাস, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব ছাড়া আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠা কল্পনা করাও কঠিন।
তবে ফাইনালে স্পেনের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। রদ্রির নেতৃত্বে স্পেনের মাঝমাঠ এমনভাবে নিজেদের অবস্থান সাজিয়েছিল, যাতে মেসি বল পেলেও সহজে সামনে এগোতে না পারেন। তাঁকে সব সময় চাপের মধ্যে রাখা হয়েছে, পাসের পথ সংকুচিত করা হয়েছে এবং আক্রমণ গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা দেওয়া হয়নি। লক্ষ্য ছিল মেসিকে পুরোপুরি থামিয়ে দেওয়া নয়, তাঁর প্রভাব যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। স্পেন সেই পরিকল্পনায় সফল হয়েছে।
গোল্ডেন বল কোনো এক ম্যাচের পুরস্কার নয়, এটি পুরো টুর্নামেন্টের মূল্যায়ন। সেই মূল্যায়নে রদ্রি ছিলেন ধারাবাহিকতার প্রতীক। ৯৩ দশমিক ২ শতাংশ সফল পাস, টুর্নামেন্টজুড়ে অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রণ, সর্বোচ্চ সফল ট্যাকল, ফাইনালে মাঝমাঠের পূর্ণ কর্তৃত্ব এবং প্রতিটি ম্যাচে একই মানের পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন স্পেনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফুটবলার।
এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু সংখ্যা নয়, এগুলো স্পেনের খেলার দর্শনের প্রতিচ্ছবি। কারণ, এই দল বিশ্বকাপ জিতেছে শুধু গোল করে নয়, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে।
ফাইনালের পর স্পেনের ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়াকে যখন রদ্রির গোল্ডেন বল নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তাঁর উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু গভীর। ‘ফুটবল শুধু গোল করা বা অ্যাসিস্ট করার খেলা নয়। একজন খেলোয়াড়ের সামগ্রিক প্রভাবই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ এই একটি বাক্যই যেন পুরো বিতর্কের উত্তর।
রদ্রি এমন একজন ফুটবলার, যাঁর সেরা কাজগুলো অনেক সময় হাইলাইটসে ধরা পড়ে না। কিন্তু কোচ, সতীর্থ, বিশ্লেষক কিংবা প্রতিপক্ষ—সবাই জানেন, তিনি মাঠে থাকলে পুরো দলের খেলাই বদলে যায়। এ কারণেই ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর যখন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়ের নাম ঘোষণা করা হলো, তখন মঞ্চে উঠলেন শুধু একজন ভালো মিডফিল্ডার নয়, পুরো বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলার।
ফুটবলে মতভেদ থাকবেই। অনেকেই বিশ্বাস করবেন, গোল্ডেন বলটি মেসির হাতে উঠলে সেটিও অন্যায় হতো না। কারণ, টুর্নামেন্টজুড়েই তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা, অনুপ্রেরণা ও ফাইনালে ওঠার অন্যতম প্রধান কারিগর। তবু গোল্ডেন বল কোনো ক্যারিয়ারের সম্মাননা নয়, এটি একটি নির্দিষ্ট টুর্নামেন্টে সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলারের স্বীকৃতি। সেই বিচারে রদ্রি ছিলেন অনন্য। তিনি শুধু পাস দেননি, স্পেনের খেলার ছন্দ তৈরি করেছেন। শুধু ট্যাকল করেননি, প্রতিপক্ষের পরিকল্পনাও ভেঙে দিয়েছেন। শুধু অধিনায়কত্ব করেননি, সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেও দলকে স্থির রেখেছেন। গোল বা অ্যাসিস্টের খাতায় হয়তো তাঁর নাম সবচেয়ে ওপরে নেই, কিন্তু স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী যাত্রার প্রতিটি অধ্যায়ে তাঁর প্রভাব ছিল স্পষ্ট।
তাই ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অরের পর ২০২৬ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বলও উঠল তাঁর হাতেই। দুটি পুরস্কারের মাঝখানে রয়েছে একই বার্তা—আধুনিক ফুটবলে সবচেয়ে বড় নায়ক সব সময় গোলদাতা নন, অনেক সময় তিনিই, যিনি নীরবে পুরো ম্যাচের গল্পটা লিখে দেন।
তাই ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষে যখন গোল্ডেন বলের নাম ঘোষণা হলো, তখন মঞ্চে উঠলেন গোলের নায়ক নন, পুরো টুর্নামেন্টের ছন্দের কারিগর—রদ্রি। হয়তো এটাই আধুনিক ফুটবলের নতুন সংজ্ঞা—গোল নয়, প্রভাবই শেষ পর্যন্ত ইতিহাস লেখে।
সাধারণ সম্পাদক, সাতক্ষীরা বন্ধুসভা