ময়লার ভাগাড় থেকে বিশ্ব ফুটবলের সেরাদের মঞ্চে

নাইজেরিয়া জাতীয় ফুটবল দলের তারকা স্ট্রাইকার ভিক্টর ওসিমেন। তিনি এখন ইতালিয়ান ক্লাব নাপোলি থেকে ধারে তুর্কি ক্লাব গালাতাসারায়ে খেলছেন। তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল একটি ময়লার ভাগাড় থেকে। আর বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারদের একজন। সম্প্রতি নিজের জীবনের সেই গল্প তুলে ধরেছেন দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউনে। বন্ধুসভার পাঠকদের জন্য সেটির কিছু অংশ অনুবাদ করেছেন তাহসিন আহমেদ

আফ্রিকা মহাদেশের সেরা ফুটবলারের পুরস্কার হাতে ভিক্টর ওসিমেনছবি: এএফপি

আমার নাম কারোরই জানার কথা না। সত্য হলো আপনি এই লেখাটি পড়ছেন এবং তা সৃষ্টিকর্তার মহানুভবতার প্রমাণ।

আমার বয়স যখন ২ বা ৩, তখন মা মারা যান। এতই ছোট ছিলাম যে উনি আমার হাত ধরে আছেন, এই দৃশ্য ছাড়া আর কিছুই মনে নেই। আমি এবং আমার ছয় ভাইবোন নাইজেরিয়ার লাগোস শহরের একটি ময়লার ভাগাড়ের পাশে এক রুমের ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া থাকতাম। জায়গাটির নাম ওলোসোসুন। আফ্রিকার অন্যতম বড় ময়লার ভাগাড়। মানুষ বলে, সেখানে প্রতিদিন ১০ হাজার টন ময়লা ফেলা হয়। কেমিক্যাল বর্জ্য, ভাঙা টিভি—সবকিছু, যা আপনি কল্পনা করতে পারেন। এটাই ছিল আমার খেলার মাঠ।

যখন আমি ফুটবল খেলা শুরু করি এবং আমার জুতা লাগবে; বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাড়ে চলে যেতাম এবং জুতা খুঁজতাম।
‘আমি একটা ছেঁড়া নাইকি পেয়েছি। বাঁ পায়ের! সাইজ ৮!’
(ঘণ্টাখানেক পর)
‘আমি একটা পুমা পেয়েছি। ডান পায়ের! সাইজ ৯!’
ওই দিন হতো সৌভাগ্যের দিন। কারণ, আমাদের কাছে এক জোড়া জুতা আছে এবং সেটা সবাই পরতে পারব।

আফ্রিকার অন্যতম বড় ময়লার ভাগাড় ওলোসোসুন
ছবি: সংগৃহীত

আমাদের আশপাশের অধিকাংশ পরিবার ময়লার ভাগাড় থেকে ভাঙা জিনিস কুড়িয়ে সেগুলো আবার বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত। তবে আমার ছোটবেলায় বাবা ড্রাইভার ছিলেন। মা মারা যাওয়ার পরে তিনি চাকরি হারিয়ে ফেলেন এবং পুলিশ বিভাগের রান্নাঘরে হাঁড়িপাতিল ধোয়ার কাজ শুরু করেন। বাসাভাড়া দেওয়ার জন্য এই আয় যথেষ্ট ছিল না। এক রাতের কথা মনে আছে। তখন আমার বয়স ১২। বাড়িভাড়া বাকি ছিল অনেক, বাড়ির মালিক আমাদের বিদ্যুৎ–লাইন কেটে দেয়। আমরা সাতজন এক রুমের মধ্যে অন্ধকারে বসে আছি, কোনো টেলিভিশন নেই। আমি বাইরে গিয়ে ময়লার ভাগাড়ের পাশে বসে কান্না শুরু করে দিলাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘একজন শিশুর জন্য এটা কেমন জীবন?’

ওই সময় আমি ফুটবল খেলা পুরোপুরি ছেড়ে দিই। পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে সহায়তা করতে হতো। আমার বোনেরা রাস্তায় ঘুরে ঘুরে কমলালেবু বিক্রি করত। লাগোসে প্রচুর ট্রাফিক থাকত। আমি ভালো দৌড়াতে পারতাম বলে সিগন্যালে পানির বোতল বিক্রি করতাম। আমার বড় ভাই আন্দ্রে করত সবচেয়ে কঠিন কাজ। সে ভোর ৩টায় ঘুম থেকে উঠত এবং রাস্তায় ঘুরে ঘুরে সংবাদপত্র বিক্রি করত। মাঝেমধ্যে সে বাড়িতে পত্রিকা নিয়ে আসত। তখন পত্রিকার কাভারে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিস, দ্রগবাদের দেখতাম, আর মুগ্ধ হতাম। মনে হতো তারা অন্য একটি বিশ্বে বাস করে। আমার জন্য ফুটবল এমন কিছু ছিল, যেটা আমি কাজ না থাকলে খেলতাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি সব সময় কাজে ব্যস্ত থাকতাম।

কোথাও টাকা কামানোর সুযোগ আছে, আমি চলে যেতাম। এভাবে একটি টিভি শোতেও যাওয়ার সুযোগ হয়, পারিবারিক কুইজ শো। শোয়ের শেষ দিকে তারা দর্শক সারি থেকে মানুষদের মঞ্চে নিয়ে যেত। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, আমাকেও তারা ডাকে এবং খুবই ভালো করি। সেদিন কুইজে অংশ নিয়ে ১০ হাজার নাইরা (প্রায় ৮০০ টাকা) জিতি। তখন পর্যন্ত এটাই ছিল আমার উপার্জন করা সবচেয়ে বেশি অর্থ।

শৈশবে ভিক্টর ওসিমেন
ছবি: সংগৃহীত

পরের দিন স্কুলে বন্ধুরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। কিন্তু আমি পাত্তা দিতাম না। আমি একজন সংগ্রামী মানুষ। কয়েক বছর লাগোসের এক পাদরির জন্য কাজ করেছি। তাঁদের চার্চে একটা ল্যাপটপ ছিল, আমার কাজ ছিল লোকজনকে তাদের ই–মেইল ঠিকানায় নিউজ লেটার পাঠানোর অনুমতি দিতে রাজি করানো। প্রতি ১০টা ই–মেইলের জন্য ১০ সেন্টের মতো পেতাম। কিছুদিন পর পদোন্নতি হলো। রাস্তায় পাদরির বাইবেল স্টাডি বই বিক্রি শুরু করলাম। সহপাঠীরা আমাকে রাস্তায় দেখলেই হাসাহাসি করত।

যা আয় করতাম, সব ভাইবোনকে দিতাম খাবার কিনতে আর বাসাভাড়া দিতে। বেশির ভাগ রাত চার্চেই ঘুমাতাম। প্রায় দুই বছর শুধু চার্চের দলের সঙ্গেই ফুটবল খেলেছি। বয়স যখন ১৫, একদিন বন্ধুদের সঙ্গে খেলার সময় একজন বলল, ‘শুনেছিস, সুপার ইগলসরা আগামী সপ্তাহে ট্রায়াল নিতে লাগোসে আসছে?’
আমি বললাম, ‘কোথায়? ঠিকানা দে।’
বাসে করে ৯০ মিনিটের রাস্তা। আর আমার কাছে কোনো টাকাই ছিল না। লাগোসে হলুদ রঙের ভ্যান আছে, যাকে বলে ‘দানফো’। এগুলো কমিউনিটি বাস। ভাড়া না থাকায় ড্রাইভারকে বলায় সে আমাকে লিফট দিত।

স্টেডিয়ামে যাওয়ার পর দেখি সেখানে প্রায় ৩০০ ছেলে। সবাই অনূর্ধ্ব-১৭ দলের কোচের নজরে আসার চেষ্টা করছিল। এত বেশি ছিল যে তারা বলই পাচ্ছিল না। কোচ সবাইকে দৌড়াতে বলছিল এবং যারা ধীরগতির তাদের বাদ দিয়ে দিচ্ছিল।
আমি প্রাণপণে দৌড়ালাম। দিনের শেষে তারা আমাকে বলল, ‘কাল আবার এসো।’
পরের দিনও প্রাণপণে দৌড়ালাম। মাসখানেক এভাবেই চলল। শেষে বল নিয়ে খেলার সুযোগ পেলাম।

আরও পড়ুন
চ্যাম্পিয়নস লিগে ম্যাচসেরার পুরস্কার হাতে ওসিমেন
ছবি : উয়েফা

আমি দুর্দান্ত খেলছিলাম। মনে হতো আমি ভালো করছি। এভাবে তিন মাস পর আমরা শেষ পর্যন্ত ৩০ জন ছিলাম। কোচ বললেন, ‘কাল চূড়ান্ত ট্রায়ালের জন্য এসো।’
ট্রেনিং শেষে সবাইকে জড়ো করলেন। ৩০ জনের মধ্যে ২৭ জনকে সিলেক্ট করলেন। মাত্র ৩ জনকে বাদ দিলেন। আমি সেই ৩ জনের একজন। কোচের কাছে কারণ জানতে কাকুতি-মিনতি করলাম। তিনি বললেন, টেকনিক্যাল কারণে আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সেদিন বাসে করে বাড়ি ফেরার পথে অনেক কান্না করেছিলাম।

আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে হয়তো হাল ছেড়ে দিত। কিন্তু আমি ফুটবলকে এতই ভালোবাসি যে নিজে নিজে অনুশীলন করা শুরু করলাম। এভাবে কয়েক মাস পেরিয়ে গেল। একদিন কেউ একজন এসে বলল, ‘জাতীয় দল দুই সপ্তাহের মধ্যে আবার লাগোসে আসছে।’
আমি বললাম, ‘ওরা যখনই আসবে, আমাকে কল করিস।’
দিনটি এল। আমি কাজ থেকে দৌড়ে বাস ধরলাম, সরাসরি স্টেডিয়ামে গেলাম। পৌঁছে দেখি ৬০০ ছেলে। সবাই সুযোগ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। এত বেশি ছিল যে কোচ ইমানুয়েল আমুনিকে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বললেন, ‘আজ আমি তোমাদের সবাইকে দেখতে পারব না। এটা অসম্ভব। আমরা দুই সপ্তাহ পর আবুজা যাব। যদি মনে করো যে তুমি ভালো, সত্যিই ভালো, তাহলে আবুজা এসো এবং আমার সঙ্গে দেখা করো।’

আবুজা যেতে ৯ ঘণ্টার রাস্তা। আমার কোনো গাড়ি ছিল না। একটা লোককে চিনতাম, পাড়ার এজেন্ট। তাকে বললাম, ‘সব শেষ।’
দুই সপ্তাহ পর, সে আমাকে কল করে বলল, ‘আমি একটা গাড়ির ব্যবস্থা করেছি। চলো যাই।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘সেখানে গিয়ে কোথায় থাকব?’
বলল, ‘চিন্তা করিস না, আবুজায় আমার এক ভাই আছে।’
যাওয়ার আগে খুব নার্ভাস হয়ে পড়লাম। আগে কখনো নিজের শহর ছেড়ে যাইনি। চার ঘণ্টা বসে রইলাম। এজেন্টকে বললাম, ‘আমি কোথাও যাব না। এখানেই ঠিক আছি।’
তখনই আমার বাবা বললেন, ‘তোকে যেতেই হবে।’
তখন একটা ব্যাগ আর দুই সেট কাপড় নিয়ে বাড়ি ছাড়লাম। পুরোনো একটি গাড়িতে আবুজার দিকে রওনা হলাম, মধ্যরাতে পৌঁছাই।

ভিক্টর ওসিমেন
রয়টার্স

পরের দিন সকালে দেখলাম স্টেডিয়ামের বাইরে ৯০০ জনের মতো অপেক্ষা করছে। প্রথম দিন মাঠেই নামার সুযোগ পেলাম না। দ্বিতীয় দিন একজন কোচ আমার দিকে আঙুল তুললেন।
‘সবুজ শার্ট, তোমার কাছে ১৫ মিনিট আছে।’
জীবন বদলে দেওয়ার জন্য মাত্র ১৫ মিনিট। আমি জানতাম তাদের মুগ্ধ করার একমাত্র উপায় হলো দৌড়ানো। তাই আমি প্রচণ্ড জোরে দৌড়ালাম। ১৫ মিনিটে ২ গোল করলাম।
ভেবেছিলাম হয়তো এবার সুযোগ পাব। কিন্তু কোচেরা মাইক্রোফোনে যে কয়জনের নাম বলল, আমি তাদের মধ্যে ছিলাম না। তারপর পার্কিং লটের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। মনে হলো, আমার স্বপ্ন শেষ। গাড়িতে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে পেছন থেকে লোকজন চিৎকার করে বলছিল, ‘এই! এই! সবুজ শার্টের ছেলেটা!’
তারা বলল, ‘কোচ তোমাকে দেখতে চান। টিম ডাক্তার তাকে বলেছেন, তুমিই সেই ছেলে যে দুই গোল করেছে। তুমিই কি সেই ছেলে?’
বললাম, ‘আমিই সেই ছেলে! আমিই সেই ছেলে!’
আবার স্টেডিয়ামে গেলাম। ডাক্তার আমার দিকে আঙুল তুলে ইশারা করছেন। টিম ডাক্তার যদি সেটা না করতেন, তবে আজ আমি ফুটবলার হতাম না।

একের পর এক ট্রায়াল চলতেই থাকল। যারা টিকত তারা দলের সঙ্গে হোটেলে থাকত। আর আমি তখনো এজেন্টের ভাইয়ের বাড়িতে থাকতাম। তাদের সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া আর ঘরদোর পরিষ্কারে সাহায্য করতাম। আমি এতই লাজুক ছিলাম যে বুঝতেই পারিনি সেই ভাইয়ের স্ত্রী টেবিলে যে খাবার দিচ্ছে, তা আমার জন্যই। ট্রেনিং থেকে ফিরে খাবার দেখে ভাবতাম এগুলো আগের দিনের বেচে যাওয়া খাবার। আমি বাড়ির পেছনে গিয়ে লুকিয়ে খেতাম।
একদিন তার স্ত্রী রান্না করার সময় বললেন, ‘কী হয়েছে? তুমি আমার রান্না পছন্দ করছ না?’
বললাম, ‘এটা কি আমার জন্য?’
তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’

নাপোলির সাফল্যের অন্যতম নায়ক ভিক্টর ওসিমেন
এএফপি

একদিন সত্যিই দলে সুযোগ পেয়ে যাই।

আমার জীবন খুব দ্রুত বদলে গেল। পরের বছর আমরা চিলিতে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে খেলতে গেলাম এবং আমি দারুণ খেললাম। ৭ ম্যাচে ১০ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতলাম। আমরা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। কেউ আশা করেনি। এমনকি আমিও না। মনে আছে, বিশ্বকাপ থেকে ফেরার পর তারা আমাকে কিছু টাকা দিয়েছিল। আমি মিলিয়নিয়ার হয়ে গেলাম। বোনদের কল করে বললাম, ‘তোমাদের সবাইকে এক-রুমের বাড়ি থেকে দুই-রুমের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি। সব ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

কয়েক বছর পর, উলফসবার্গের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলাম। অনেক বেশি টাকা পেলাম, যতটা আমি স্বপ্নেও কখনো দেখিনি। আমি ফোনে থাকা ব্যাংকের অ্যাপস বারবার রিফ্রেশ দিয়ে চেক করছিলাম! অথচ এর ঠিক দুই বছর আগেও আমি ১০ সেন্টের পানির বোতল বিক্রি করতাম। ভালো দিনে হয়তো ২ ডলার আয় হতো। আর ঠিক দুই বছর পর আমি মিলিয়নিয়ার। অবিশ্বাস্য! আমি কি স্বপ্ন দেখছি? হাঁটু গেড়ে বসে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানালাম।
বাবাকে কল করে বললাম, ‘আপনাকে আর বাড়ির মালিকের ভাড়ার কথা চিন্তা করতে হবে না। আমি আপনাকেই বাড়ির মালিক বানাচ্ছি।’ একটা গাড়ি কিনে বাবার জন্য একজন ড্রাইভারও ঠিক করে দিলাম। তাঁর বয়স বাড়ছিল, হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ছিলেন। বললেন, ‘এটার দরকার কী? আমি নিজেই ড্রাইভার ছিলাম! তোর টাকা তুই রাখ!’ আমি বললাম, ‘এই লোকটারও তো কাজ দরকার।’
বললেন, ‘ঠিক আছে। তাকে আমার সঙ্গে রাখব, তুই বেতন দিবি। তবে আমি নিজেই গাড়ি চালাব।’

তারপর উলফসবার্গ থেকে ফ্রান্সের লিল-এ চলে গেলাম। বাবার শরীর আরও খারাপ হতে শুরু করল। কোভিড শুরু হলো, বাবা হাসপাতালে ভর্তি হলেন। আমি ফ্রান্সে একা আটকে গেলাম। ফুটবল বন্ধ, ফ্লাইট বন্ধ। এজেন্টের সঙ্গে কথা বলে নাইজেরিয়ায় যাওয়ার জন্য একটা প্রাইভেট ফ্লাইটের ব্যবস্থা এবং ল্যান্ডিং অনুমতিও পেয়েছিলাম। শুধু ক্লাব আর এজেন্টের হ্যাঁ-এর দরকার ছিল। অপেক্ষা বাড়তে থাকল। এর মধ্যে ক্লাব কর্তৃপক্ষ আমার ট্রান্সফার নিয়ে আলোচনা করছিল।

সতীর্থ ব্রুনো ওনিয়ামায়েচির (ডানে) সঙ্গে ভিক্টর ওসিমেন
এএফপি

টেনশনে আমার ঘুম হচ্ছিল না ঠিকভাবে। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন রেখে গোসল করতে গেলাম। আমার বিছানার পাশে সব সময় মায়ের একটা ছবি থাকত। সেদিন গোসল থেকে বের হয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে মনে একটু খটকা লাগল। কাঁদতে শুরু করলাম। মনে হলো কিছু একটা হয়েছে, খুব খারাপ হয়েছে। ফোন হাতে নিয়ে দেখি বাড়ি থেকে ২০টা মিসড কল। ফেসটাইমে ভাইকে কল করলাম। জানাল, বাবা আর নেই।

এই খবর শোনার পর এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে ফোনটা ছুড়ে মারলাম। ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙতে লাগলাম। নিজের মধ্যে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ভাঙার শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা এসে আমাকে শান্ত করে। খুব অপরাধবোধ হচ্ছিল। কারণ, বাবার সব সন্তান ও নাতি-নাতনিরা তার পাশে ছিল। শুধু আমি পাশে ছিলাম না। ওই সময় ফুটবল ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। তারপর বাবার শেষকৃত্যের জন্য দেশে ফিরে সত্যি ভেবেছিলাম হয়তো আর কখনো ফুটবল খেলব না।

নাপোলিতে এসে নিজেকে আবার খুঁজে পেলাম। আমার জীবন বদলে দেওয়ার জন্য এই শহর, দর্শক এবং সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাই। প্রথম মিটিংয়ে কোচকে নিজের মানসিক অবস্থার কথা বলেছিলামও। তিনি বাবার মতো স্নেহ করতেন। তিনি আমাকে বিশ্বাস করতেন এবং ভাবতেন আমি বিশ্বের সেরা হতে পারি।
একবার একটি ম্যাচে ২ গোল করলাম। তিনি ড্রেসিংরুমে এসে আমাকে বললেন, ‘তুমি আজ ৪টা গোল করতে পারতে। কাল তোমাকে ভিডিও দেখাব।’

আমি তাদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে চাই, যারা আমার মতো বেড়ে উঠছে। এই সংখ্যাটা মিলিয়নে। সেই শিশুরা যারা পরের বেলা কী খাবে, সেটার জন্য কাজ করে, ট্রাফিকে পানি বিক্রি করে, ময়লার স্তূপে কিছু পাওয়ার আশায় খোঁড়াখুঁড়ি করে। জীবনযুদ্ধ করে। স্বপ্ন দেখে। প্রার্থনা করে।