লেভ ইয়াশিন–ই কি ফুটবলের সর্বকালের সেরা গোলরক্ষক
ফুটবল মাঠে গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন গোলরক্ষক যেন শেষ প্রহরীর মতো। আক্রমণের ঝড় সামলে দলকে বাঁচিয়ে রাখার সেই কঠিন দায়িত্ব যিনি অসাধারণ দক্ষতায় পালন করেছিলেন, তিনি হলেন লেভ ইয়াশিন। ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি খেলোয়াড়ের নাম উচ্চারিত হলেও গোলরক্ষকদের মধ্যে ইয়াশিনের নাম এক অনন্য মর্যাদায় উচ্চারিত হয়। অনেকেই তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোলরক্ষক হিসেবে বিবেচনা করেন।
১৯২৯ সালের ২২ অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কোতে জন্মগ্রহণ করেন লেভ ইভানোভিচ ইয়াশিন। শ্রমজীবী এক সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মাত্র ১২ বছর বয়সে তাঁকে একটি কারখানায় কাজ করতে হয়েছিল। জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই ধীরে ধীরে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয়।
১৯৪৫ সালে তিনি মস্কোর বিখ্যাত ক্লাব ডায়নামো মস্কোতে যোগ দেন। শুরুতে তিনি আইস হকি খেলতেন। পরে কিংবদন্তি গোলরক্ষক আলেক্সি খোমিচ তাঁর প্রতিভা আবিষ্কার করেন এবং গোলরক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেন। সেই পথ ধরেই ফুটবলের ইতিহাসে শুরু হয় এক কিংবদন্তির যাত্রা। ১৯৫৩ সালে ডায়নামো মস্কোর হয়ে ইয়াশিনের অভিষেক ঘটে। এরপর প্রায় দুই দশক তিনি একই ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত ডায়নামো মস্কোর হয়ে ৩২৬টি ম্যাচ খেলেন। এই সময়ে ক্লাবটি পাঁচবার সোভিয়েত লিগ শিরোপা এবং তিনবার সোভিয়েত কাপ জয় করে। ক্লাব ফুটবলে যেমন তিনি সফল ছিলেন, তেমনি আন্তর্জাতিক ফুটবলেও ছিলেন অনন্য।
১৯৫৪ সালে সোভিয়েত জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে ইয়াশিনের। দেশের হয়ে ৭০টির বেশি ম্যাচ খেলেন তিনি। ১৯৫৬ সালের অলিম্পিক গেমসে সোভিয়েত ইউনিয়নকে স্বর্ণপদক জিততে সাহায্য করেন। এরপর ১৯৬০ সালে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। বিশ্বকাপেও তিনি ছিলেন সোভিয়েত দলের নির্ভরতার প্রতীক। ১৯৫৮ ও ১৯৬২ বিশ্বকাপে দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে এবং ১৯৬৬ বিশ্বকাপে চতুর্থ স্থানে পৌঁছাতে বড় ভূমিকা রাখেন।
ইয়াশিনের খেলার ধরন ছিল একেবারেই ভিন্ন। লম্বা দেহ, তীক্ষ্ণ প্রতিক্রিয়া এবং দুর্দান্ত অ্যাক্রোবেটিক সেভের জন্য তিনি দ্রুতই বিশ্বজুড়ে আলোচনায় চলে আসেন। কালো জার্সি পরে খেলতেন বলে তাঁকে বলা হতো ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’, ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’ কিংবা ‘ব্ল্যাক অক্টোপাস’। গোললাইনের সামনে তাঁর উপস্থিতি ছিল প্রতিপক্ষের জন্য এক আতঙ্কের নাম। গোলরক্ষকের ভূমিকা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার কৃতিত্বও অনেকাংশে তাঁর। তিনি শুধু গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে থাকতেন না, বরং পুরো রক্ষণভাগকে নিয়ন্ত্রণ করতেন, ডিফেন্ডারদের নির্দেশ দিতেন এবং প্রয়োজনে বক্সের বাইরে গিয়েও বল ক্লিয়ার করতেন। আধুনিক গোলরক্ষকদের অনেক কৌশলের সূচনা আসলে ইয়াশিনের হাত ধরেই।
তাঁর অসাধারণ কৃতিত্বের স্বীকৃতি আসে ১৯৬৩ সালে, যখন তিনি জয় করেন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ব্যালন ডি’অর। এটি ইউরোপের বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার এবং ইতিহাসে তিনিই একমাত্র গোলরক্ষক, যিনি এই সম্মান অর্জন করেছেন। ক্যারিয়ারজুড়ে তিনি ১৫০টির বেশি পেনাল্টি সেভ করেছেন এবং দুই শতাধিক ক্লিন শিটের রেকর্ড গড়েছেন। ফুটবলের প্রতি অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ সম্মানগুলোর একটি ‘অর্ডার অব লেনিন’ প্রদান করা হয়।
১৯৭১ সালে ফুটবলকে বিদায় জানান এই কিংবদন্তি গোলরক্ষক। অবসর নেওয়ার পরও তিনি ডায়নামো মস্কোর সঙ্গে প্রশাসনিক ও কোচিংয়ের বিভিন্ন ভূমিকায় যুক্ত ছিলেন। ১৯৯০ সালের মার্চে মস্কোতেই তাঁর মৃত্যু হয়, কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে তাঁর অবদান আজও অমলিন। গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ কীভাবে পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন, তার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ ছিলেন লেভ ইয়াশিন। কালো জার্সিতে মোড়ানো সেই অদম্য প্রহরী আজও ফুটবলপ্রেমীদের মনে এক অনন্ত কিংবদন্তি হয়ে বেঁচে আছেন।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা