কীভাবে অলিম্পিককে প্রচারণার মঞ্চ বানিয়েছিলেন হিটলার

১৯৩৬ সালের অলিম্পিক গেমস দেখছেন হিটলারছবি: আইওসি অলিম্পিক মিউজিয়াম/অলস্পোর্ট

১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক। ৪৯টি দেশের হাজারো ক্রীড়াবিদ একত্র হয়েছিলেন অলিম্পিকের মঞ্চে। স্টেডিয়ামে উৎসবের আবহ, দর্শকের উচ্ছ্বাস, নিখুঁত আয়োজন—সবকিছুই যেন একটি আদর্শ ক্রীড়া আসরের ছবি। কিন্তু সেই ছবির আড়ালে ধীরে রচিত হচ্ছিল রাজনৈতিক প্রচারণার এক সুপরিকল্পিত অধ্যায়। এটি ছিল এমন একটি অলিম্পিক, যেখানে পদকের জন্য যেমন লড়াই হয়েছে, তেমনি লড়াই হয়েছে মতাদর্শের। যেখানে দৌড়ের ট্র্যাকে যেমন নতুন ইতিহাস লেখা হয়েছে, তেমনি বিশ্বরাজনীতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছে। তাই ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিককে শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায় না।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ছিল অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জাতীয় অপমানের ভারে ন্যুব্জ। ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তির কঠোর শর্ত, ক্ষতিপূরণ এবং সামরিক সীমাবদ্ধতা জার্মান সমাজে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। সেই অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে ১৯৩৩ সালে ক্ষমতায় আসে অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি পার্টি। ক্ষমতায় এসেই হিটলার একটি নতুন জার্মানির স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন; একটি শক্তিশালী, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং তথাকথিত ‘আর্য শ্রেষ্ঠত্ব’-এর রাষ্ট্র।

মজার বিষয় হলো, ১৯৩৬ সালের অলিম্পিকের আয়োজক হিসেবে বার্লিনকে নির্বাচিত করা হয়েছিল ১৯৩১ সালে, যখন নাৎসিরা ক্ষমতায় আসেনি। কিন্তু ক্ষমতায় এসে হিটলার বুঝতে পারেন, অলিম্পিক হতে পারে বিশ্বের সামনে তাঁর শাসনব্যবস্থাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার সবচেয়ে বড় সুযোগ। এরপর আর এটিকে শুধু ক্রীড়া আসর হিসেবে দেখা হয়নি, হয়ে ওঠে রাষ্ট্র পরিচালিত এক বিশাল প্রচারণা। বার্লিনকে নতুনভাবে সাজানো হয়। নির্মিত হয় প্রায় এক লাখ দর্শক ধারণক্ষমতার আধুনিক অলিম্পিক স্টেডিয়াম। উন্নত করা হয় সড়ক, রেল ও যোগাযোগব্যবস্থা। বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ প্রেস সেন্টার তৈরি করা হয়। শহরজুড়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়। এমনকি অলিম্পিক চলাকালে ইহুদিবিরোধী পোস্টার ও সাইনবোর্ডও সাময়িকভাবে সরিয়ে ফেলা হয়, যাতে বিদেশি অতিথিরা নাৎসি জার্মানির কঠোর বাস্তবতা বুঝতে না পারেন।

এই পুরো পরিকল্পনার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল নাৎসি প্রচারণামন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলসের। তাঁর লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট, বিশ্ব যেন বার্লিন ছেড়ে যায় একটি আধুনিক, সভ্য ও শক্তিশালী জার্মানির ছবি নিয়ে। তবে সবাই এই আয়োজনকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে অলিম্পিক বর্জনের দাবি ওঠে। অনেকের যুক্তি ছিল, যে রাষ্ট্র নিজ দেশের নাগরিকদের একটি অংশকে বর্ণ ও ধর্মের কারণে বৈষম্যের শিকার করছে, সেই রাষ্ট্রের আয়োজিত অলিম্পিকে অংশ নেওয়া উচিত নয়। কিন্তু দীর্ঘ বিতর্কের পর অধিকাংশ দেশ অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিও মনে করেছিল, খেলাধুলাকে রাজনীতির বাইরে রাখা উচিত। কিন্তু বাস্তবে রাজনীতি তখন স্টেডিয়ামের ভেতরেই প্রবেশ করে ফেলেছিল।

হিটলারের অন্যতম বিশ্বাস ছিল তথাকথিত ‘আর্য জাতির শ্রেষ্ঠত্ব’। তাঁর ধারণা অনুযায়ী, উত্তর ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত শ্বেতাঙ্গরাই মানবজাতির শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। তাই এই অলিম্পিকে জার্মানির সাফল্যকে তিনি নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শের বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উত্তরটি এসেছিল একজন ক্রীড়াবিদের পা থেকে।

যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামায় দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারে জন্ম নেওয়া জেসি ওয়েন্স তখনো বর্ণবৈষম্যের বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করছিলেন। নিজের দেশেই তিনি সমান অধিকার পেতেন না। অথচ সেই মানুষই বার্লিন অলিম্পিকে এসে এমন এক ইতিহাস লিখলেন, যা আজও ক্রীড়াজগতের অন্যতম অনুপ্রেরণার গল্প।

আরও পড়ুন

১০০ মিটার স্প্রিন্টে স্বর্ণপদক জয় দিয়ে শুরু। এরপর ২০০ মিটারেও সবাইকে পেছনে ফেললেন। লংজাম্পে আরেকটি স্বর্ণ। সব শেষে ৪১০০ মিটার রিলেতে যুক্তরাষ্ট্রকে এনে দিলেন চতুর্থ স্বর্ণপদক। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে চারটি স্বর্ণপদক; সেই সময়ের অলিম্পিক ইতিহাসে যা ছিল বিস্ময়কর। তবে জেসি ওয়েন্সের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি লুকিয়ে আছে লংজাম্প প্রতিযোগিতায়।

যোগ্যতা পর্বে তিনি দুবার ফাউল করেন। আর একবার ভুল করলেই বাদ পড়তেন। ঠিক তখনই তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী, জার্মান লংজাম্পার লুজ লং এগিয়ে এসে তাঁকে পরামর্শ দেন রানআপের শুরুটা একটু পেছন থেকে নিতে, যাতে ফাউল না হয়। প্রতিযোগী হয়েও এমন পরামর্শ ক্রীড়াঙ্গনে বিরল। ওয়েন্স সেই পরামর্শ মেনে সফলভাবে ফাইনালে ওঠেন এবং শেষ পর্যন্ত স্বর্ণপদক জেতেন। লুজ লং পান রৌপ্য। প্রতিযোগিতা শেষে দুজন একসঙ্গে হাত ধরে দর্শকের অভিবাদন গ্রহণ করেন। নাৎসি মতাদর্শ যেখানে মানুষকে বর্ণে ভাগ করছিল, সেখানে একজন জার্মান ও একজন কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানের এই বন্ধুত্ব বিশ্বকে ভিন্ন এক বার্তা দেয়। পরে ওয়েন্স নিজেই বলেছিলেন, জীবনে অনেক পদক পেলেও লুজ লংয়ের বন্ধুত্ব ছিল তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান অর্জনগুলোর একটি।

জেসি ওয়েন্সকে নিয়ে আরেকটি বহুল প্রচলিত গল্পের প্রচলন আছে। আর তা হলো—হিটলার নাকি তাঁর সঙ্গে করমর্দন করতে চাননি। বাস্তবে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। অলিম্পিকের প্রথম দিনে হিটলার কয়েকজন জার্মান বিজয়ীকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। পরে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি জানিয়ে দেয়, যদি তিনি কাউকে অভিনন্দন জানান, তাহলে সবাইকেই জানাতে হবে। এরপর তিনি আর ব্যক্তিগতভাবে কোনো বিজয়ীকেই অভিনন্দন জানাননি। ফলে ওয়েন্সকে উদ্দেশ করে আলাদা করে অপমান করার জনপ্রিয় গল্পটির ঐতিহাসিক ভিত্তি স্পষ্ট নয়। তবে এটাও সত্য, ওয়েন্স দেশে ফিরে এসেও যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন।

১৯৩৬ সালের অলিম্পিক আরেকটি কারণে ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এই আসরেই প্রথমবারের মতো আধুনিক অলিম্পিক টর্চ রিলে চালু হয়। প্রাচীন গ্রিসের অলিম্পিয়া থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মশাল বার্লিনে পৌঁছায়। আজ অলিম্পিক মানেই যে মশাল রিলে, তার সূচনা হয়েছিল এই আসরেই। শুধু তা–ই নয়, জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাতা লেনি রিফেনস্টাল নির্মাণ করেন ‘অলিম্পিয়া’ নামের প্রামাণ্যচিত্র। স্লো-মোশন, ট্র্যাকিং শট, আন্ডারওয়াটার ক্যামেরাসহ নানা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্মিত এই চলচ্চিত্র আজও ক্রীড়া চিত্রায়নের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সঙ্গে এটি নাৎসি প্রচারণার অংশ হওয়ায় সমালোচনারও মুখে পড়ে।

পদক তালিকায় শেষ পর্যন্ত শীর্ষে ছিল জার্মানি। সংখ্যার হিসাবে হয়তো হিটলারের দেশই সবচেয়ে সফল। কিন্তু ইতিহাস শুধু পদকের হিসাব রাখে না, ইতিহাস মনে রাখে প্রতীককে।

হিটলার চেয়েছিলেন, বিশ্ব যেন ১৯৩৬ সালের অলিম্পিককে মনে রাখে আর্য শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে। কিন্তু প্রায় ৯ দশক পরে দাঁড়িয়ে মানুষ সবচেয়ে বেশি স্মরণ করে একজন কৃষ্ণাঙ্গ অ্যাথলেটের চারটি স্বর্ণপদক, একজন জার্মান প্রতিদ্বন্দ্বীর মানবিক আচরণ এবং সেই অলিম্পিকের মাধ্যমে রাজনীতি ও খেলাধুলার জটিল সম্পর্ককে।

১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। খেলাধুলা কখনোই শুধু খেলা নয়। কখনো এটি রাষ্ট্রের প্রচারণার মাধ্যম হয়ে ওঠে, কখনো প্রতিবাদের ভাষা, কখনো আবার মানবতার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। একটি সরকার স্টেডিয়ামকে নিজের আদর্শের মঞ্চ বানাতে পারে, কিন্তু মাঠের ভেতরে একজন ক্রীড়াবিদের সততা, প্রতিভা ও মানবিকতা অনেক সময় সেই আদর্শের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। হয়তো এ কারণেই বার্লিন অলিম্পিক ইতিহাসে শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি আয়না, যেখানে আমরা একসঙ্গে দেখতে পাই খেলাধুলার সৌন্দর্য, রাজনীতির প্রভাব, বর্ণবাদের নির্মমতা এবং মানবতার অবিনাশী শক্তিকে।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা