ব্যালন ডি’অরের লড়াইয়ে এগিয়ে কারা
২০২৬ বিশ্বকাপের পর্দা নেমেছে। এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো ২০২৫–২৬ মৌসুম। এখন ফুটবল–বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে একটিই প্রশ্ন—এবার ব্যালন ডি’অর কার হাতে উঠবে?
বিশ্বকাপজয়ী স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল, মিডফিল্ডের মহাতারকা রদ্রি, ৩৯ বছর বয়সেও আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলা লিওনেল মেসি, গোলের বন্যা বইয়ে দেওয়া ইংলিশ কিংবদন্তি হ্যারি কেইন, কিংবা অতিমানবীয় ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স প্রদর্শন করা কিলিয়ান এমবাপ্পে—প্রত্যেকের পক্ষেই রয়েছে শক্তিশালী যুক্তি। শুধু তা–ই নয়, আর্লিং হলান্ড, ওসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, পাও কুবার্সি ও লাওতারো মার্টিনেজের মতো ফুটবলাররাও নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে এই লড়াইকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছেন।
তবে ব্যালন ডি’অর কেবল সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার নয়। পুরো মৌসুমজুড়ে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে সাফল্য ও ট্রফি জেতা, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে প্রভাব, মাঠে নেতৃত্ব, খেলোয়াড়সুলভ আচরণ এবং ধারাবাহিকতাই এই সম্মানজনক পুরস্কারের মূল ভিত্তি। বিশেষ করে চ্যাম্পিয়নস লিগ ও বিশ্বকাপের বছরে বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করা খেলোয়াড়েরা স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি সুবিধা পান।
২০২৫–২৬ মৌসুমের ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে কে সবচেয়ে এগিয়ে? বিশ্বকাপ ও ক্লাব মৌসুমের সামগ্রিক পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে ফুটবলের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট গোলডটকম সাজিয়েছে সম্ভাব্য সেরা ১০ দাবিদারের তালিকা এবং তাঁদের অবস্থানের যৌক্তিক ব্যাখ্যা। তবে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যালন ডি’অর র্যাঙ্কিং নয়।
১০. পাও কুবারসি (স্পেন | বার্সেলোনা)
২০২৫-২৬ মৌসুমে: ১ গোল, ২ অ্যাসিস্ট, ২৬ ক্লিন শিট। বিশ্বকাপ, লা লিগা ও সুপারকোপা দে এস্পানিয়া জয়।
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য তরুণ ডিফেন্ডারে পরিণত হয়েছেন পাও কুবারসি। বার্সেলোনা ও স্পেন—দুই দলের রক্ষণেই তিনি ছিলেন অসাধারণ। বিশ্বকাপজয়ী স্পেনের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পেয়েছেন বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান তারকার স্বীকৃতি। ডিফেন্ডারদের জন্য ব্যালন ডি’অর জয় কঠিন হলেও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে দশম স্থানে রেখেছে।
৯. খভিচা কাভারাটস্খেলিয়া (জর্জিয়া | পিএসজি)
২০২৫-২৬ মৌসুমে: ২৩ গোল, ১০ অ্যাসিস্ট। চ্যাম্পিয়নস লিগ, লিগ ওয়ান, ট্রফি দে শঁপিওঁ, উয়েফা সুপার কাপ ও ফিফা ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জয়।
যদি শুধু চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বের সেরা খেলোয়াড়ের তালিকা করা হয়, তাহলে খভিচা কাভারাতসখেলিয়ার নাম সবার ওপরে থাকবে। টুর্নামেন্টের ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে পিএসজি তারকা টানা সাতটি নকআউট ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্ট করেছেন। তবে তাঁর দেশ জর্জিয়া এবার বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারেনি। এ কারণে তিনি এ তালিকায় নবম স্থানে রয়েছেন।
৮. আর্লিং হলান্ড (নরওয়ে | ম্যানচেস্টার সিটি)
২০২৫-২৬ মৌসুমে: ৫৮ গোল, ১১ অ্যাসিস্ট। এফএ কাপ ও কারাবাও কাপ জয়।
গোল করার ক্ষেত্রে হলান্ড আবারও ছিলেন দুর্দান্ত। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ধারাবাহিকভাবে গোল করে তিনি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছেন। দীর্ঘ ২৮ বছর পর নরওয়েকে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার ক্ষেত্রে বড় অবদান রাখেন। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নরওয়েকে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে তুলতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। করেছেন টুর্নামেন্টের তৃতীয় সর্বোচ্চ ৭ গোল। সে কারণেই তিনি অষ্টম স্থানে রয়েছেন।
৭. ওসমান দেম্বেলে (ফ্রান্স | পিএসজি)
২০২৫-২৬ মৌসুমে: ২৫ গোল, ১৪ অ্যাসিস্ট। চ্যাম্পিয়নস লিগ, লিগ ওয়ান, ট্রফি দে শঁপিওঁ, উয়েফা সুপার কাপ ও ফিফা ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জয়।
ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মৌসুম কাটিয়েছেন দেম্বেলে। পিএসজির আক্রমণে গোল, অ্যাসিস্ট ও সৃজনশীলতায় তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান অস্ত্র। বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে সেমিফাইনালে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে শিরোপা জিততে না পারায় শীর্ষ দাবিদারদের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছেন।
৬. রদ্রি (স্পেন | ম্যানচেস্টার সিটি)
২০২৫-২৬ মৌসুমে: ২ গোল। বিশ্বকাপ, এফএ কাপ ও কারাবাও কাপ জয়।
স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম স্থপতি ছিলেন রদ্রি। মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত পাসিং ও ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণে তিনি ছিলেন অনন্য। পরিসংখ্যানে খুব বেশি উজ্জ্বল না হলেও মাঠে তাঁর প্রভাব ছিল অসাধারণ। তাই তিনি ব্যালন ডি’অরের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার এবং এ তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে রয়েছেন।
৫. কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স | রিয়াল মাদ্রিদ)
২০২৫-২৬ মৌসুমে: ৫৮ গোল, ১৪ অ্যাসিস্ট।
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে আবারও দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়েছেন এমবাপ্পে। গোল, গতি ও বড় ম্যাচে পারফরম্যান্স তাঁকে ইউরোপের সেরাদের কাতারে রেখেছে। দলের হয়ে কোনো শিরোপা জিততে না পারলেও হয়েছেন চ্যাম্পিয়নস লিগ ও লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতা। বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে সেমিফাইনালে তুললেও শিরোপা জিততে পারেননি। বিশ্বকাপেও হয়েছেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। তাই তিনি এ তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছেন।
৪. মাইকেল ওলিসে (ফ্রান্স | বায়ার্ন মিউনিখ)
২০২৫-২৬ মৌসুমে: ২৬ গোল, ৪১ অ্যাসিস্ট। বুন্দেসলিগা, ডিএফবি-পোকাল ও ডিএফএল-সুপারকাপ জয়।
বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দিয়েই অসাধারণ প্রভাব ফেলেছেন মাইকেল ওলিসে। গোলের পাশাপাশি অসংখ্য অ্যাসিস্ট করে ইউরোপের অন্যতম সেরা সৃজনশীল খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিশ্বকাপে ফ্রান্সের আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও শিরোপা জিততে না পারায় তিনি চতুর্থ স্থানে রয়েছেন।
৩. লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা | ইন্টার মায়ামি)
২০২৫-২৬ মৌসুমে: ৪৪ গোল, ৩০ অ্যাসিস্ট। এমএলএস কাপ জয়।
৩৯ বছর বয়সেও মেসি প্রমাণ করেছেন, তিনি এখনো বিশ্বসেরাদের একজন। ইন্টার মায়ামির হয়ে দুর্দান্ত মৌসুমের পাশাপাশি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলতে নেতৃত্ব, গোল ও অ্যাসিস্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শিরোপা হাতছাড়া হলেও অসাধারণ পারফরম্যান্স তাঁকে তৃতীয় স্থানে রেখেছে।
২. লামিনে ইয়ামাল (স্পেন | বার্সেলোনা)
২০২৫-২৬ মৌসুমে: ২৬ গোল, ২১ অ্যাসিস্ট। বিশ্বকাপ, লা লিগা ও সুপারকোপা দে এস্পানিয়া জয়।
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই লামিনে ইয়ামাল বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হয়েছেন। বার্সেলোনার হয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটানোর পাশাপাশি স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ে তিনি ছিলেন অন্যতম নায়ক। বড় ম্যাচে প্রভাব, ধারাবাহিকতা এবং দলীয় সাফল্য—সব দিক বিবেচনায় ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার তিনি।
১. হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড | বায়ার্ন মিউনিখ)
২০২৫-২৬ মৌসুমে: ৭৩ গোল, ৮ অ্যাসিস্ট। বুন্দেসলিগা, ডিএফবি-পোকাল ও ডিএফএল-সুপারকাপ জয়।
গোল করার পাশাপাশি খেলা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে হ্যারি কেইন ছিলেন অনন্য। বায়ার্নের হয়ে অসাধারণ মৌসুম কাটানোর পাশাপাশি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে প্রথম স্থানে রেখেছে।
২০২৫–২৬ মৌসুমের ব্যালন ডি’অরের প্রতিযোগিতা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম কঠিন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই। বিশ্বকাপজয়ী স্পেনের একাধিক তারকা, আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলা লিওনেল মেসি, ধারাবাহিক হ্যারি কেইন, দুর্দান্ত এমবাপ্পে এবং গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড—প্রত্যেকেই নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে এই লড়াইকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। যার ফলে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ব্যালন ডি’অর লড়াই তৈরি হয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে মৌসুমসেরা এই পুরস্কার, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত। সেদিন লন্ডনে সেরা খেলোয়াড়ের হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।
সাধারণ সম্পাদক, সাতক্ষীরা বন্ধুসভা