যে মানুষটি প্রমাণ করেছেন, পরিশ্রমই সবচেয়ে বড় প্রতিভা
‘আপ ইনটু দ্য স্কাই! আ টোউয়ারিং হেডার, অ্যান্ড হি ইজ ডান ইট এগেইন! ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, দ্য মাস্টার অব দ্য ইমপসিবল!’
ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠ যেন আকাশ চিরে ভেসে আসে। মুহূর্তের মধ্যেই কোমা থেকে জেগে ওঠেন এক রোগী। পরে জানা যায়, তাঁর জেগে ওঠার পেছনে ছিল এক মানুষের নাম—তাঁর আজীবনের অনুপ্রেরণা, তাঁর আইডল, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
আজ বলছি পর্তুগালের মাদেইরা দ্বীপে জন্ম নেওয়া সেই বিস্ময় বালকের গল্প। যে পরিবারে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী, যে অভাবের কারণে তাঁর মা একসময় গর্ভপাতের কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু যাঁকে সৃষ্টিকর্তা কোটি মানুষের স্বপ্ন হয়ে ওঠার জন্য পাঠান, তাঁকে কি এত সহজে থামানো যায়?
হয়তো তাঁর ট্রফির সংখ্যা অন্য কারও তুলনায় কম হতে পারে। হয়তো কেউ বলবে, জন্মগত প্রতিভায় তিনি মেসি কিংবা আরও কিছু কিংবদন্তির মতো ছিলেন না। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস আর অদম্য মানসিকতার মাধ্যমে তিনি নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যেখানে পৌঁছানো কেবল প্রতিভার নয়, চরিত্রেরও পরীক্ষা।
সফল হওয়ার পর মানুষ প্রায়ই নিজের অতীত ভুলে যায়। কিন্তু রোনালদো কখনো ভুলে যাননি। ছোটবেলায় চরম দারিদ্র্যের কারণে ক্ষুধার্ত রোনালদো ও তাঁর বন্ধুরা একটি ম্যাকডোনাল্ডসের পেছনের দরজায় গিয়ে অবিক্রীত বার্গার চাইতেন। সেখানকার এক কর্মী (এডনা) তাঁদের নিয়মিত খাবার দিতেন। বহু বছর পর বিশ্বতারকা হওয়ার পরও রোনালদো সেই উপকারের কথা ভোলেননি; বরং এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে খুঁজে বের করে ধন্যবাদ জানানোর ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন।
সেই কর্মী নিজেই বলেন, এত বছর পরও রোনালদো তাঁকে মনে রেখেছেন—এটাই তাঁর জীবনের অন্যতম বড় আনন্দ। একজন বিশ্বতারকার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এ ঘটনাই তাঁর বিনম্র ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল উদাহরণ।
কিন্তু শুধু এই একটি ঘটনাই কি তাঁকে আলাদা করে?
যেখানে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার অনেক তারকা খেলোয়াড় বিলাসিতা আর উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের জন্য আলোচিত, সেখানে রোনালদো এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত। কোমল পানীয় কিংবা অ্যালকোহল পান করেন না, ধূমপান করেন না, শরীরে ট্যাটু করেন না। রক্তদান করতে পারেন বলেই শরীরে ট্যাটু করান না। দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থ শিশুদের সাহায্য করা, দান-অনুদান—এমন অসংখ্য মানবিক কাজের গল্প রয়েছে, যা এক লেখায় শেষ করা সম্ভব নয়।
হয়তো বিশ্বকাপ জিততে না পারার কারণে, কিংবা মেসিকে না রেখে নিজেকে সর্বকালের সেরা মানার কারণে তাঁকে অসংখ্যবার ট্রলের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু এখানেই তাঁর ভিন্নতা। তিনি কখনো বিতর্কের জবাব কথায় দেননি; দিয়েছেন মাঠে। বারবার ব্যর্থতা, সতীর্থদের অবহেলা, দলের চাপ, কোটি মানুষের প্রত্যাশা—সবকিছুকে শক্তিতে পরিণত করে নিজের সেরাটা বের করে এনেছেন। নিজেকে প্রতিদিন নতুন করে প্রমাণ করার এই মানসিকতাই তাঁকে অনন্য করেছে।
আজকে আমরা যে পর্তুগালকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে চিনি, তার মূল কান্ডারি ও প্রাণপুরুষ তিনি। তাঁর হাত ধরেই মূলত পর্তুগিজ ফুটবল এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং বৈশ্বিক ফুটবলে নিজেদের স্থায়ী শক্তিমত্তা প্রতিষ্ঠা করেছে।
যদি একটি বিশ্বকাপ ট্রফিই সর্বকালের সেরার একমাত্র মানদণ্ড হতো, তবে ফুটবল ইতিহাস থেকে ইয়োহান ক্রুইফ, পাওলো মালদিনি, লুকা মদরিচের মতো অসংখ্য কিংবদন্তির নামও মুছে যেত। অথচ তাঁরা অমর—তাঁদের ফুটবল, তাঁদের প্রভাব আর তাঁদের উত্তরাধিকারের জন্য।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও ঠিক তেমনই এক নাম। তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি প্রমাণ করেন যে স্বপ্ন, শৃঙ্খলা, পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস থাকলে অসম্ভব বলে কিছু থাকে না। তাঁর গল্পে অনুপ্রাণিত হয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হলান্ড, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো বর্তমান প্রজন্ম; ভবিষ্যতেও অসংখ্য তরুণ তাঁর পথ ধরেই নিজের স্বপ্নকে তাড়া করবেন।
কিংবদন্তিরা তাঁদের ট্রফির জন্য স্মরণীয় হন, কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের গল্পের জন্য অমর হয়ে থাকেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো সেই অমরদের একজন।
‘টু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো—দ্য ম্যান হু প্রুভড দ্যাট হার্ড ওয়ার্ক ক্যান টার্ন ড্রিমস ইনটু ডেসটিনি। ইয়োর লিগেসি উইল ইন্সপায়ার জেনারেশনস ফরেভার।’
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাভার বন্ধুসভা