নেইমার কি পারবেন বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাসে অমর হতে

ব্রাজিলের শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সীদের কাছে নেইমার সমান জনপ্রিয়রয়টার্স

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে এরই মধ্যে নেইমার জুনিয়র তাঁর নাম খোদাই করে ফেলেছেন। ১২৮ ম্যাচ খেলে দেশটির ইতিহাসের সর্বাধিক ৭৯টি গোল এবং সর্বাধিক ৫৯টি অ্যাসিস্ট সেই কথাই বলছে। দেড় দশক ধরে দেশটির পোস্টার বয় তিনি। বর্তমানে সেলেসাওদের হয়ে খেলা প্রত্যেক তরুণ তারকার আইডল তিনি। ব্রাজিলের শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সীদের কাছে নেইমার সমান জনপ্রিয়। তবু কোথাও যেন একটা কমতি রয়েছে।

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে নেইমার যতটা উঁচুতে, বিশ্ব ফুটবলে ঠিক ততটা নন। তাঁর ট্রফি ক্যাবিনেটে যে বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা নেই। সর্বোচ্চ সফলতা ২০১৩ সালের ফিফা কনফেডারেশন কাপ এবং ২০১৬ সালে অলিম্পিক গোল্ড মেডেল। কিন্তু এই দুটি শিরোপা তেমন বড় নয়। ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ পুরস্কার ব্যালন ডি’অরও নেই। আর বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তিদের তালিকায় নিজের নাম খোদাই করতে হলে একটা বিশ্বকাপ যে চাই–ই চাই। সেটা নেইমারের প্রত্যেক সমর্থকই একবাক্যে স্বীকার করেন। আবার সমালোচকেরা এই একটি কারণে নেইমারকে কিংবদন্তির কাতারে ফেলতে চান না।

সম্প্রতি পানামার বিপক্ষে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ম্যাচে না খেললেও মাঠে ছিলেন নেইমার
এএফপি

২০২৬ বিশ্বকাপ কি সেই অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দেবে
যেভাবে সবকিছু ঠিকঠাকভাবে এগোচ্ছে, তাতে সমর্থকেরা আশা করতেই পারেন। অনেকে বিষয়টিকে মেলাচ্ছেন ২০০২ বিশ্বকাপের সঙ্গে। সেবার রোনালদো লুইস নাজারিও দে লিমা; বিশ্বব্যাপী পরিচিত রোনালদো, ও ফেনোমেনো, কিংবা আর৯ নামে—তিনি দুর্দান্ত নৈপুণ্য প্রদর্শন করে ব্রাজিলকে পঞ্চম শিরোপা জেতাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন।

তবে নেইমারের সঙ্গে বিষয়টি মিলে যাচ্ছে অন্য একটি কারণে। ১৯৯৯ সালের ঘটনা, গোটা বিশ্ব আঁতকে উঠেছিল রোনালদোকে মাঠে পড়ে যেতে দেখে। তাঁর হাঁটু পুরোপুরি ভেঙে গিয়েছিল। লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার সেই শব্দ এখনো দর্শকদের কানে বেজে ওঠে। অনেকে ভেবেছিল ক্যারিয়ার হয়তো এখানেই শেষ। কিন্তু মানুষটা যে রোনালদো, হার মানেননি। অদম্য মানসিক শক্তি, হারিয়ে যাওয়া সিংহাসন পুনরুদ্ধারের জেদ—এসবই তাঁকে আবার তুলে আনে ফুটবলের রাজত্বে। চোটের কারণে মাঠে ফিরতে পারেননি দীর্ঘদিন। ২০০২ বিশ্বকাপের আগে কোনো ম্যাচও খেলতে পারেননি। তবু তাঁর ওপর ভরসা রেখেছিলেন তৎকালীন কোচ ফিলিপো স্কোলানি। বাকিটা ইতিহাস।

আরও পড়ুন
চোটের কারণে গত চার বছরে ব্রাজিলের হয়ে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলতে পেরেছেন নেইমার। বাকিটা সময় থাকতে হয়েছে মাঠের বাইরে
ছবি: রয়টার্স

এবার নেইমারও একই ঘটনার মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন। ২০২২ সালের ৯ ডিসেম্বর কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে বাদ পড়ে ব্রাজিল। সেই হারের পর ২৭৩ দিন জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন নেইমার। ২০২৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বলিভিয়ার বিপক্ষে ব্রাজিলের জার্সিতে ফেরেন বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচে। মাঝের এ সময়ে চোটের কারণে ডান অ্যাঙ্কেলে অস্ত্রোপচার করান, পুরোপুরি ফিট হয়ে উঠতে তাই সময় লাগে এবং পিএসজি থেকে সৌদি আরবের ক্লাব আল হিলালে যোগদানের কাজও সারেন। এরপর ২০২৩ সালেরই ১৭ অক্টোবর, মন্তেভিদিওতে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে এসিএল চোট পেয়ে মাঠের বাইরে ছিটকে পড়েন নেইমার। এরপর একাধিকবার জাতীয় দলে ডাক পেলেও চোটের কারণে পুরোপুরি ফিট হয়ে না ওঠায় আর জাতীয় দলে ফিরতে পারেননি ব্রাজিল ফরোয়ার্ড।

সেই অপেক্ষা দীর্ঘ হতে হতে আরও ৯৭২ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আল হিলাল ছেড়ে নিজের শৈশবের ক্লাব সান্তোসে নাম লেখান নেইমার। ক্লাবটির হয়ে ম্যাচ খেললেও পুরোপুরি ফিট হতে পারছিলেন না। মাঝে আরও বেশ কয়েকবার চোটে পড়েন। ফলে ফেরাটা আরও দীর্ঘ হয়।

আর মাত্র চার দিন পরই আরও একটি বিশ্বকাপ খেলতে মাঠে নামছে ব্রাজিল। মরক্কোর বিপক্ষে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ম্যাচে যদি নেইমার খেলার সুযোগ পান, তাহলে ৯৭৫ দিন পর জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামবেন এই তারকা ফুটবলার। আর গত বিশ্বকাপ থেকে হিসাব করলে ১২৪৮ দিন মাঠের বাইরে ছিলেন নেইমার। এর মধ্যে ম্যাচ খেলতে পেরেছেন মাত্র দুটি।

বাবার সঙ্গে নেইমার
রয়টার্স

অদম্য মানসিক শক্তি
একজন বড় ফুটবলারের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর ধৈর্য ও মানসিকতা। নেইমার সেই ক্ষেত্রে শতভাগ মার্ক পাবেন। চোটের কারণে এত দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকাটা যে কতটা যন্ত্রণার, তা গত মাসে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা নেইমারের বাবার এক খোলাচিঠিতেই উঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন, ‘মন্তেভিদিওতে সেই চোটের পর থেকে যে যন্ত্রণা আর সংশয় আমাদের তাড়া করে বেড়িয়েছে, তা নিয়ে চাইলে আমি অনেক কিছুই লিখতে পারতাম, বাবা। এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় মুখ বুজে আমাদের যেসব মন্তব্য শুনতে বা পড়তে হয়েছে, সেগুলোও মনে করিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু আজ আনন্দের দিন...। এই মুহূর্তে শুধু সেসব শিশুর হাসিমুখই আমার চোখে ভাসছে, যারা যেখানেই তোমাকে দেখেছে, তোমার নাম ধরে চিৎকার করেছে। আমরা জানি, এই মুহূর্তটির জন্য তুমি কতটা উন্মুখ ছিলে, কতটা কঠোর পরিশ্রম করেছ। সব কষ্ট, সন্দেহ ও নীরবতা পেরিয়ে ঈশ্বর এত দূর আমাদের সাহায্য করেছেন। অভিনন্দন, বাবা! আরেকটি বিশ্বকাপে আমি তোমার পাশেই থাকব!’

আরও পড়ুন
নেইমার
নেইমারের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডল

৩৪ বছর বয়সী নেইমার এবারের বিশ্বকাপটা খুব করে চেয়েছেন খেলতে। সেটার জন্যই চোটের সঙ্গে এই দীর্ঘ লড়াই। তাঁর ক্যারিয়ারে এটা চতুর্থ ও শেষ বিশ্বকাপ। ব্রাজিলকে তাদের বহুল প্রতীক্ষিত ‘হেক্সা’ শিরোপা এনে দিতে চান তিনি। তারপরই যে তিনি পাবেন ফুটবল ইতিহাসে অমরত্ব। যদিও এই ফরোয়ার্ড মনে করছেন, ফুটবল ইতিহাসে তাঁর স্থায়ী জায়গা এরই মধ্যে তৈরি হয়ে আছে। ব্রাজিলের ফুটবলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সম্প্রতি রেডবুল আল্টিমেট সকার চ্যালেঞ্জে অংশ নিতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে নেইমার বলেন, ‘আমি মনে করি ফুটবলে আমার লিগ্যাসি তৈরি হয়ে গেছে। ফুটবলের কথা উঠলে যে কেউই কোনো না কোনোভাবে আমাকে মনে রাখবে। তাই আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে আমি ইতিহাস গড়তে পেরেছি, ফুটবলের ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করে রেখে যেতে পেরেছি। একদিন আমি আমার সন্তানদের, নাতি-নাতনিদের বলতে পারব, দেশের জন্য আমি কত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছি।’

বাংলাদেশ সময় ১৪ জুন ভোর ৪টায়, ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। এই ম্যাচের মধ্য দিয়েই হয়তো ৯৭৫ দিন পর বিখ্যাত হলুদ জার্সি পরে মাঠে নামতে যাচ্চ্ছেন নেইমার। আর শুরু হচ্ছে বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তিদের তালিকায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখার মিশন। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা সমর্থকেরাও চান এই মিশন সফল হোক।