ব্রাজিলের ‘হেক্সা’ স্বপ্ন এবার কি পূরণ হবে

বিশ্বকাপের শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে জয়ের পর দর্শকদের অভিবাদনের জবাব দিচ্ছেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলাররাএএফপি

ব্রাজিল কি এ বছর ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলে তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ষষ্ঠ শিরোপা জিততে পারবে? এর উত্তর কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। এমনকি অধিকাংশ ফুটবল বিশ্লেষক সম্ভাব্য শিরোপাজয়ীর তালিকায় পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের রাখেনি। কারণটা দলটির গত চার বছরের পারফরম্যান্স। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের পর থেকেই সেলেসাওদের খেলায় সেই পুরোনো ছন্দ আর নেই। একের পর এক পরাজয়ে একটা সময় প্রশ্ন ওঠে— ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে তো ব্রাজিল!

সেই অনিশ্চয়তা অনেক আগেই দূর হয়ে গেছে। আর মাত্র তিন দিন। বাংলাদেশ সময় ১৪ জুন ভোর ৪টায়, আরও একটি বিশ্বকাপের আসরে নিজেদের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামতে যাচ্ছে হলুদ জার্সিধারীরা। প্রতিপক্ষ গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে অনুশীলনে ব্রাজিল ফুটবল দল
এএফপি

‘ফেবারিট’ তকমা না থাকায় চাপমুক্ত
চার বছর পরপর বিশ্বকাপ ফুটবল আসে এবং প্রতিবারই সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নদের তালিকায় ঘুরেফিরে মাত্র কয়েকটি দলের নামই আসে—আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন। এর বাইরে ইংল্যান্ড, পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়া ও নেদারল্যান্ডসের নামও কখনো কখনো আসে। তবে এবার সম্ভাব্য জয়ীদের মধ্যে কেউ কেউ নাম বললেও ‘ফেবারিট’ তকমা নেই ব্রাজিলের গায়ে। এই তকমা না থাকাটা ইতিবাচকভাবে দেখছেন তারকা মিডফিল্ডার ক্যাসিমিরো। সম্প্রতি বিশ্বকাপ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, ‘আমরা বড় ফেবারিট নই। তবে আমরা ভালো অবস্থায় আছি। অভিজ্ঞ ও তারুণ্যের মিশ্রণে আমাদের স্কোয়াডটি শক্তিশালী। যদিও এবার এক ধাপ পিছিয়ে আছি, তবু আমরা প্রস্তুত এবং এটা সব সময় ভালো দিক।’

ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি
এএফপি

আনচেলত্তি ফ্যাক্টর
এবার বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করছে কার্লো আনচেলত্তির ওপর। ২০২৫ সালের মে মাসে তিনি সেলেসাওদের কোচ হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন। তার আগপর্যন্ত দলটি ছিল ছন্নছাড়া। একের পর এক পরাজয় ও ড্রয়ে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। আনচেলত্তি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক বছরে পুরোনো ছন্দ কিছুটা হলেও ফিরে এসেছে। এখন পর্যন্ত তাঁর অধীনে ১২ ম্যাচ খেলে ব্রাজিল জয় পেয়েছে ৭টিতে, ২টিতে ড্র এবং পরাজিত হয়েছে ৩টি ম্যাচে। সব মিলিয়ে জয়ের হার ৫৮ শতাংশ।

তবে কেবল এই তথ্য দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে সফল এই দলটির ওপর আনচেলত্তির প্রভাব বোঝানো যাবে না। ২০২২ বিশ্বকাপের পর থেকে ব্রাজিলের খেলা এতটাই সৌন্দর্যহীন হয়ে পড়েছিল যে ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকার আগে বিরক্ত হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট করেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদিনহো। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রীতি ম্যাচ ১–১ গোলে ড্র হওয়ার পর তিনি লিখেছিলেন, ‘যারা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলকে ভালোবাসে, তাদের জন্য এই মুহূর্তটা হতাশার। খেলা দেখার জন্য উৎসাহ খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই দলটা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম বাজে। দলে কোনো ভালো নেতা নেই, অধিকাংশই মোটামুটি মানের খেলোয়াড়।’

আরও পড়ুন
ব্রাজিল দলের অনুশীলনে কোচ কার্লো আনচেলত্তি ও ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস জুনিয়র
সিবিএফ

এর বছরখানেক পরের ঘটনা। কার্লো আনচেলত্তিকে কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর সেই রোনালদিনহো আবারও দলটিকে নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার করেন। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি এবং আমি তাঁকে (কার্লো আনচেলত্তি) ভালোভাবে জানি। আমার মনে হয় ফেডারেশনের খুবই ভালো সিদ্ধান্ত এটি। আমার পছন্দ হয়েছে। একজন ব্রাজিলিয়ান হিসেবে আমি খুবই খুশি। আশা করি, আগামী বিশ্বকাপে তিনি দারুণ কিছু করবেন।’

সবচেয়ে বড় কথা, শুধু রোনালদিনহো নন, সব ব্রাজিলিয়ান সমর্থকই মনে করেন এই মুহূর্তে কেউ যদি তাদের বহুল প্রতীক্ষিত ‘হেক্সা’ এনে দিতে পারেন, সেই ব্যক্তি একমাত্র কার্লো আনচেলত্তি।

সম্প্রতি পানামার বিপক্ষে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ম্যাচে না খেললেও মাঠে ছিলেন নেইমার
এএফপি

নেইমারের অন্তর্ভুক্তি
ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার জুনিয়র। ১২৮ ম্যাচে ৭৯ গোল করে এই তালিকায় সবার ওপরে তিনি। পেছনে ফেলেছেন ৭৭ গোল করা ফুটবলের রাজা পেলেকে। দেড় দশক ধরে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের পোস্টার বয় তিনি। জাতীয় দলের অন্য সদস্যদের কাছে সান্তোস তারকা একজন আইডল। সেটি যেন এখন আবারও নতুন করে পুরো বিশ্ব জেনে নিচ্ছে।

২০২২ বিশ্বকাপের পর থেকে জাতীয় দলের হয়ে নেইমার খেলতে পেরেছেন মাত্র দুটি ম্যাচ। একের পর এক চোটের কারণে থাকতে হয়েছে মাঠের বাইরে। চোট থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে আবার নতুন করে চোটে মাঠের বাইরে—এ যেন অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়! সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে জাতীয় দলে ফেরার অনিশ্চয়তা। সবাই ভেবেছিল কার্লো আনচেলত্তি নিশ্চয়ই তাঁর দলে নেইমারকে রাখবেন। কিন্তু তিনিও অপেক্ষায় রেখে দেন। তবে একেবারে ‘না’ করেননি। শর্ত জুড়ে দেন—সম্পূর্ণ ফিট হলে তবেই দলে ডাকবেন। অন্যদিকে বিশ্বকাপও ঘনিয়ে আসতে থাকে।

বিশ্বকাপ খেলতে দলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে নেইমার।

গত এক বছরে আনচেলত্তি ব্রাজিলের যত জায়গাতেই গিয়েছেন, সব জায়গাতেই তাঁকে একটি প্রশ্ন বারবার শুনতে হয়েছে—‘নেইমারকে বিশ্বকাপে নিচ্ছেন তো?’ প্রতিবারই তিনি হেসে জবাব দিয়ে বলেছেন, বিবেচনায় আছে। তবু কারও শঙ্কা দূর হচ্ছিল না। এমনকি নেইমারও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কিছুটা আশান্বিত হয়ে পড়েন। কারণ, যতবারই খেলার জন্য সুস্থ হচ্ছিলেন, ততবারই কোনো না কোনো নতুন চোট বাধা দিচ্ছিল। তবে সব শঙ্কা দূর করে সেলেসাওদের ‘নাম্বার টেন’র ওপর ভরসা রেখেছেন কার্লো আনচেলত্তি। বিশ্বকাপের দল ঘোষণার পর এ খবরে পুরো ব্রাজিলজুড়ে সমর্থকদের উল্লাসই বলে দেয় তাঁরাও নেইমারের ওপর কতটা ভরসা করেন।

বিশ্বকাপ দলে নেইমারের অন্তর্ভুক্তির পর পুরো দলের চেহারাও যেন পরিবর্তন হয়ে গেছে। সতীর্থরা সবাই খুশি। সমর্থকেরাও খুশি। সেই সঙ্গে সবার মধ্যে আবারও ‘হেক্সা’ জয়ের প্রত্যাশা নতুন করে জেগেছে। তবে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘হেক্সা’ জিততে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। সেই পর্যন্ত আশাবাদী হতে দোষ কোথায়!