রহিম কাকার চায়ের দোকানে বিশ্বকাপের আনন্দ
গ্রামের বাজারের শেষ মাথায় রহিম কাকার ছোট্ট চায়ের দোকানটি ছিল আমাদের রাতজাগা স্বপ্নের ঠিকানা। বিশ্বকাপ এলেই দোকানে চালু হতো একটি পুরোনো টেলিভিশন। বাঁশের খুঁটিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো অ্যানটেনা। টেলিভিশনের দৃশ্যগুলো কখনো ঝাপসা হতো, কখনো অ্যানটেনা নড়লে পর্দা ভরে যেত দানাদার রেখায়। তবু আমাদের উৎসাহে কোনো ঘাটতি ছিল না।
আমি তখন কলেজের ছাত্র। রাতের খাবার খেয়েই বন্ধুদের সঙ্গে ছুটে যেতাম সেখানে। কেউ বেঞ্চে বসত, কেউ দাঁড়িয়ে থাকত, কেউ আবার দোকানের সামনে ইটের ওপর বসে খেলা দেখত। রহিম কাকা এক হাতে চা বানাতেন, আরেক হাতে টিভির অ্যানটেনা ঠিক করতেন। খেলার উত্তেজনায় তিনি কখনো ধারাভাষ্যকার, কখনো কোচ, কখনো আবার রেফারি হয়ে যেতেন।
সেদিন ছিল বিশ্বকাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। শেষ কয়েক মিনিট বাকি। চারদিকে নিস্তব্ধতা। চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার শব্দটুকুও যেন শোনা যাচ্ছিল। সবার চোখ টেলিভিশনের পর্দায়।
হঠাৎ আমাদের পছন্দের দলের স্ট্রাইকার বল নিয়ে এগিয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জাল কাঁপিয়ে দিল সে।
মুহূর্তেই বাজার ফেটে পড়ল উল্লাসে। কেউ লাফিয়ে উঠল, কেউ চিৎকার করে কাঁদতে লাগল, কেউ সিজদায় পড়ে গেল। সেই উন্মাদনার মাঝখানে রহিম কাকার হাত থেকে ফুটন্ত চায়ের কেটলি মাটিতে পড়ে গেল। গরম চা ছড়িয়ে পড়ল দোকানের মেঝেতে।
সবাই ভেবেছিলাম তিনি আফসোস করবেন। কিন্তু তিনি দুই হাত উঁচু করে শিশুর মতো হাসতে হাসতে বললেন, ‘কেটলি ভাঙলে কেটলি কেনা যায়, কিন্তু জীবনে এমন গোল কয়বার দেখা যায়?’
সেদিন কথাটা শুনে আমরা হেসেছিলাম।
আজ প্রায় পনেরো বছর কেটে গেছে। গ্রামের সেই দোকান নেই। রহিম কাকাও আর বেঁচে নেই। এখন শহরের আরামদায়ক ক্যাফেতে বসে বিশাল স্ক্রিনে খেলা দেখি। ছবি ঝকঝকে, শব্দ নিখুঁত, চেয়ার আরামদায়ক।
তবু গোল হলে আর আগের মতো বুক কেঁপে ওঠে না।
আজ বুঝি, আমরা শুধু ফুটবল দেখতে যেতাম না। আমরা আসলে একসঙ্গে আনন্দ খুঁজতে যেতাম। ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা, কয়েকজন বন্ধু আর একজন সরল মানুষের অকৃত্রিম উচ্ছ্বাস মিলেই তৈরি করত সেই রাতগুলোর জাদু।
এখন খেলা দেখি, গোলও দেখি। কিন্তু মাঝেমধ্যে মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ম্যাচগুলো হয়তো সেই ছোট্ট চায়ের দোকানেই শেষ হয়ে গেছে।
সৈয়দপুর, নীলফামারী