নাহিদের অনুপস্থিতি অজিদের বিপক্ষে টাইগারদের কতটা ভোগাবে

নাহিদ রানাপ্রথম আলো

২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এমন সফরে শুধু দলের ফল নয়, নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগও থাকে। সেই সুযোগের সবচেয়ে বড় নামের একটি ছিলেন নাহিদ রানা। বাংলাদেশের পেস আক্রমণে তাসকিন আহমেদ ও শরীফুল ইসলামের অভিজ্ঞতার পাশে নাহিদের কাঁচা গতি যোগ হয়ে তৈরি হতে পারত ভিন্ন মাত্রার এক আক্রমণ। কিন্তু সেই আক্রমণ এখন আর পূর্ণ থাকছে না।

গ্রেড ২ সাইড স্ট্রেইন চোটের কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজ থেকে ছিটকে গেছেন নাহিদ রানা। তাঁর পুনর্বাসনে অন্তত ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। ফলে ১৩ আগস্ট ডারউইনে শুরু হতে যাওয়া প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের সবচেয়ে দ্রুতগতির পেসারকে দেখা যাবে না।

অথচ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের ঠিক আগে নাহিদের সামর্থ্যের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনটি এসেছিল অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধেই। জুনে ঢাকায় প্রথম ওয়ানডেতে ১০ ওভারে ৪১ রান দিয়ে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন নাহিদ। তাঁর চারটি উইকেটই এসেছিল ঘণ্টায় অন্তত ১৪৬ কিলোমিটার গতির বলে; এর মধ্যে কয়েকবার তাঁর গতি ১৫০ কিলোমিটার ছাড়িয়েছিল। ৪.১০ ইকোনমি রেটে করা সেই স্পেলেই বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে ৮৬ রানে হারিয়ে সিরিজের শুরুটা করেছিল দারুণভাবে।

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখিয়েছেন তাসকিন আহমেদ ও নাহিদ রানা
ফেসবুক

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নাহিদের টেস্ট বোলিং দেখার আগ্রহ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর সর্বোচ্চ গতি ১৫২ কিলোমিটার। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন গতির বোলার বিরল। কিন্তু এবার সেই গতির ঝড় মাঠে উঠবে না।
প্রশ্ন তাই শুধু নাহিদ রানা নেই—এখানেই শেষ নয়। বরং বড় প্রশ্ন, নাহিদকে ছাড়া বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ ঠিক কোথায় সবচেয়ে বেশি ভুগবে?

নাহিদ রানাকে নিয়ে আলোচনা হলেই প্রথমে আসে তাঁর গতি। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর গুরুত্ব শুধু স্পিডগানে ওঠা সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। ঘণ্টায় ১৪৫–১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করা একজন পেসার ব্যাটারের হাতে থাকা সময় কমিয়ে দেন। শরীরের কাছে আসা বলের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে হয় দ্রুত। শর্ট বলের বিপরীতে ব্যাটারের প্রতিক্রিয়া বদলে যায়। আর একই লেংথের বলও একজন দ্রুতগতির বোলারের হাত থেকে এসে ব্যাটারের কাছে ভিন্ন রকম অনুভূত হয়। নাহিদের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যোগ হয় তাঁর উচ্চতা। ফলে গতি ও বাউন্স একসঙ্গে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়। টেস্ট ক্রিকেটে এই সমন্বয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পাঁচ দিনের ম্যাচে একজন বোলারের কাজ শুধু উইকেট নেওয়া নয়; ব্যাটারকে দীর্ঘ সময় অস্বস্তিতে রাখাও। নাহিদ সেই অস্বস্তি তৈরি করার জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে স্বাভাবিক অস্ত্রগুলোর একটি।

নাহিদের অনুপস্থিতি অস্ট্রেলিয়ার জন্য কেন স্বস্তির হতে পারে, সেটি বুঝতে খুব বেশি পেছনে তাকাতে হয় না। মাত্র কয়েক মাস আগে বাংলাদেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা নাহিদের গতির মুখোমুখি হয়েছে। সেই ম্যাচে তাঁর চার উইকেট শুধু পরিসংখ্যানের দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, ম্যাচের গতিপথেও প্রভাব ফেলেছিল। বাংলাদেশের ২৮১ রানের জবাবে অস্ট্রেলিয়া থেমেছিল ১৯৫ রানে। নাহিদের চার উইকেটের মধ্যে ছিল অস্ট্রেলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারদের শিকার। অর্থাৎ বড় দলের বিপক্ষে তাঁর গতি যে শুধু আলোচনার বিষয় নয়, ম্যাচের গতিপথ বদলানোর ক্ষমতাও রাখে—সেটির প্রমাণ তিনি ইতিমধ্যে দিয়েছেন।

মাত্র কয়েক মাস আগে বাংলাদেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা নাহিদের গতির মুখোমুখি হয়েছিল
প্রথম আলো

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচ হাইলাইটেও তাঁর বোলিং আলাদাভাবে উঠে এসেছিল। ১৫০ কিলোমিটার বেশি গতির বল এবং চার উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের জন্য সেটি ছিল নাহিদের সামর্থ্যের সরাসরি পরিচয়। তাই অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের কাছে নাহিদ কোনো অচেনা নাম ছিলেন না। তাঁরা জানতেন, এই তরুণকে সামলাতে শুধু টেকনিক যথেষ্ট নয়; দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও প্রয়োজন। এখন সেই পরীক্ষাটাই আর দিতে হবে না।

টেস্ট ম্যাচের শুরুটা পেসারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বলে সুইং, সিম ও বাউন্স কাজে লাগিয়ে ব্যাটারকে শুরুতেই চাপে রাখা যায়। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে বাউন্স ও ক্যারির ধরন বাংলাদেশের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। সেখানে নাহিদের উচ্চতা ও গতি বাড়তি কার্যকর হতে পারত। বাংলাদেশের পরিকল্পনাটা কল্পনা করা যাক। এক প্রান্তে তাসকিন আহমেদ—অভিজ্ঞতা, নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণাত্মক পেসের সমন্বয়। অন্য প্রান্তে নাহিদ রানা—ঘণ্টায় ১৪৫ থেকে ১৫০ কিলোমিটার আশপাশের গতি, উচ্চতা এবং বাউন্স। ব্যাটারের জন্য দুটি প্রান্তে দুটি আলাদা সমস্যা। একজন বোলারকে সামলাতে গিয়ে ব্যাটার পরের ওভারে অন্য ধরনের গতি ও অ্যাঙ্গেলের মুখোমুখি হচ্ছেন। এখানেই তৈরি হয় বোলিং আক্রমণের বৈচিত্র্য। নাহিদ না থাকায় বাংলাদেশের সেই পরিকল্পনাটি বদলে যাবে।

তাসকিনের ওপর দায়িত্ব বাড়বে। সঙ্গী হাসান মাহমুদ হয়তো তাঁর সুইং দিয়ে কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারবে। কিন্তু নাহিদের মতো সরাসরি গতির হুমকি তৈরি করা সহজ হবে না। এটাই বাংলাদেশের প্রথম বড় ভোগান্তি। একজন দ্রুতগতির বোলারের মূল্য সব সময় তাঁর নিজের উইকেট দিয়ে বোঝা যায় না। ধরা যাক, নাহিদ এক প্রান্ত থেকে টানা কয়েক ওভার ১৪৫ কিলোমিটারের আশপাশে বল করছেন। ব্যাটার তাঁর গতি সামলাতে গিয়ে নিজের স্বাভাবিক শট খেলতে পারছেন না। শরীরের দিকে আসা বল নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। তখন অন্য প্রান্তের বোলার একটু বেশি আক্রমণাত্মক লেংথে বল করার সুযোগ পান। অর্থাৎ নাহিদ নিজে উইকেট না পেলেও অন্য বোলারের জন্য পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন। এটাই একজন পেসারের অদৃশ্য অবদান। তাঁর উপস্থিতিতে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে একটি ‘স্পিড কনট্রাস্ট’ তৈরি হতো। নাহিদের দ্রুত বলের পর তাসকিন বা হাসানের তুলনামূলক ভিন্ন গতির বল ব্যাটারের টাইমিংয়ে প্রভাব ফেলতে পারত। আবার নাহিদের শর্ট বলের পর মিরাজের স্পিন ব্যাটারের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারত। এই বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশই এখন নেই।

আরও পড়ুন
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নাহিদ রানাকে মিস করবে বাংলাদেশ
শামসুল হক

নাহিদ রানার গুরুত্ব বোঝার জন্য বলতে হয়, ২০২৬ সালেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়েছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫ উইকেটের পারফরম্যান্সের পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪ উইকেট—শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ধারাবাহিকভাবে প্রভাব রাখার সক্ষমতা দেখিয়েছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই ওয়ানডেতে তাঁর মোট ৪ উইকেট এসেছে ১৯ ওভারে ৮৬ রান দিয়ে, অর্থাৎ বোলিং গড় ২১.৫০ এবং ইকোনমি ৪.৫২। এর আগে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজেও নাহিদের পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। টেস্টে তার বোলিং ক্যারিয়ার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১২টি টেস্টের ২১ ইনিংসে বল করে ৩৮টি উইকেট তিনি সংগ্রহ করেছেন এবং দুটি ইনিংসে সর্বোচ্চ ৫টি করে উইকেট পেয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৬ সালে তাঁর উন্নতির সবচেয়ে বড় দিক হলো—গতি এখন আর শুধু সম্ভাবনার গল্প নয়; সেই গতি দিয়ে নিয়মিত উইকেটও এনে দিচ্ছেন তিনি। এই জায়গাতেই অস্ট্রেলিয়া সফরটি তাঁর জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজের দেশের বাইরে, অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপের বিপক্ষে নাহিদ কী করতে পারেন—এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার অপেক্ষা ছিল। সেই উত্তর আপাতত সবার অজানা।

নাহিদের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের পেস আক্রমণের নেতৃত্ব স্বাভাবিকভাবেই তাসকিন আহমেদের ওপর থাকবে। তাসকিনের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর অভিজ্ঞতা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিনের লড়াই তাঁকে শিখিয়েছে কীভাবে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বোলিং করতে হয়। কিন্তু নাহিদের সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য সমন্বয়টি যে ধরনের বৈচিত্র্য তৈরি করতে পারত, সেটি এখন আর সম্ভব নয়। হাসান মাহমুদ তাঁর সুইং দিয়ে আক্রমণে আলাদা মাত্রা যোগ করতে পারে। মেহেদী হাসান মিরাজও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন—বিশেষ করে পেসাররা যদি প্রথম দিকে চাপ তৈরি করতে পারেন এবং তিনি পরে সেই চাপ ধরে রাখতে পারেন। কিন্তু এখানে মূলকথাটি হলো—নাহিদের বিকল্প একজন নয়। তাঁর অভাব পূরণ করতে হবে তাসকিনের নেতৃত্ব, হাসানের বৈচিত্র্য এবং মিরাজের নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে।

বাংলাদেশের তারকা ফাস্ট বোলার নাহিদ রানা
শামসুল হক

অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রস্তুতি ম্যাচও বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কসংকেত দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়েছে। সেই ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার পেসার ক্যাম্পবেল থম্পসন নিয়েছেন ৮ উইকেট। অবশ্য প্রস্তুতি ম্যাচের ফল দিয়ে টেস্ট সিরিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। দুই দলের একাদশ, পরিকল্পনা ও ম্যাচের উদ্দেশ্যও আলাদা হতে পারে। তবে এটুকু বোঝা গেছে, অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সামনে পরীক্ষা সহজ হবে না। বাংলাদেশ যদি ব্যাটিংয়ে চাপে পড়ে, বোলারদেরই ম্যাচে ফেরার রাস্তা তৈরি করতে হবে। প্রতিপক্ষকে বড় স্কোর থেকে আটকাতে হবে। দ্রুত কয়েকটি উইকেট এনে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে হবে। নাহিদ থাকলে এই কাজের জন্য বাংলাদেশের হাতে একটি বাড়তি অস্ত্র থাকত। এখন সেই দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে অন্যদের।

নাহিদ রানা নেই—বাংলাদেশের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা। বিশেষ করে এমন একটি সিরিজে, যেখানে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের পেস বোলিংকে নিজেদের সামর্থ্যের কঠিনতম পরীক্ষাগুলোর একটির মুখোমুখি হতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা হয়তো তাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারেন। যে ১৫০ কিলোমিটারের ঝড়ের জন্য তাঁদের প্রস্তুত হতে হচ্ছিল, সেই ঝড় এবার মাঠে উঠবে না। কিন্তু ক্রিকেটে একজনের অনুপস্থিতি অন্যদের জন্যও সুযোগ তৈরি করে। তাসকিনের নেতৃত্বে পুরো বোলিং আক্রমণকে প্রমাণ করতে হবে—নাহিদ রানা না থাকলেও বাংলাদেশকে সহজে হারানো যাবে না।

সাধারণ সম্পাদক, সাতক্ষীরা বন্ধুসভা