ছোট্ট অস্থিকলস থেকে যেভাবে অ্যাশেজ সিরিজের জন্ম

বর্তমানে অ্যাশেজ অস্ট্রেলিয়ার দখলে। অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের হাতে অ্যাশেজের মূল ট্রফি ছোট্ট অস্থিকলসছবি: ইনস্টাগ্রাম

ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন অনেক ট্রফি আছে, যেগুলোর মূল্য সোনা বা রুপা দিয়ে মাপা যায়। কিন্তু একটি ট্রফি আছে, যার মূল্য নির্ধারণ হয় ইতিহাস, অহংকার আর আবেগ দিয়ে। সেটি হলো অ্যাশেজ। মাত্র ১১ সেন্টিমিটার উচ্চতার একটি ছোট্ট অস্থিকলস (Ashes Urn)। এই ক্ষুদ্র ট্রফির জন্য ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে লড়ে যাচ্ছে। আধুনিক ক্রিকেটে আইসিসি বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি কিংবা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জৌলুশ যতই বাড়ুক না কেন, টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ মর্যাদার লড়াই বলতে আজও সবার আগে উচ্চারিত হয় একটি নাম—অ্যাশেজ।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম কোনো পরিকল্পিত টুর্নামেন্ট থেকে নয়, বরং এক ব্যঙ্গাত্মক সংবাদপত্রের লেখার মধ্য দিয়ে। আর সেই লেখাই সময়ের সঙ্গে হয়ে উঠেছে ক্রিকেটের সবচেয়ে গৌরবময় ঐতিহ্যের প্রতীক।

১৮৮২ সালের ২৯ আগস্ট। লন্ডনের ঐতিহাসিক ওভাল মাঠে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার টেস্ট ম্যাচ। নিজেদের মাঠে ইংল্যান্ড ছিল স্পষ্ট ফেবারিট। কিন্তু ক্রিকেট-বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে মাত্র ৭ রানের নাটকীয় জয় তুলে নেয় অস্ট্রেলিয়া। সেটিই ছিল ইংল্যান্ডের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম টেস্ট জয়। এই পরাজয়ের পর ব্রিটিশ সাপ্তাহিক দ্য স্পোর্টিং টাইমস একটি ব্যঙ্গাত্মক শোকবার্তা প্রকাশ করে। সেখানে লেখা হয়েছিল ইংরেজ ক্রিকেট মারা গেছে, তার দেহ দাহ করা হবে এবং সেই ছাই (Ashes) অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাওয়া হবে। কথাটি ছিল নিছক রসিকতা। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সেটিই বাস্তবে পরিণত হয়।

অ্যাশেজ ট্রফি
রয়টার্স

১৮৮২-৮৩ মৌসুমে ইংল্যান্ড দল অস্ট্রেলিয়া সফরে যায়। অধিনায়ক আইভো ব্লাই ঘোষণা দেন, তিনি ‘ইংলিশ ক্রিকেটের ছাই’ ফিরিয়ে আনবেন। সফর শেষে ইংল্যান্ড সিরিজ জিতে যায়। মেলবোর্নে একদল নারী তাঁকে একটি ছোট্ট পোড়ামাটির অস্থিকলস উপহার দেন। ধারণা করা হয়, এর ভেতরে একটি বেল বা স্টাম্পের পোড়া ছাই সংরক্ষিত ছিল। সেই ছোট্ট অস্থিকলসই পরে ‘Ashes Urn’ নামে বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতীকে পরিণত হয়। আজও মূল অস্থিকলসটি লন্ডনের লর্ডস ক্রিকেট জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে; বিজয়ী দল এটির প্রতিরূপ ট্রফি গ্রহণ করে।

অ্যাশেজ ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া দুই জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মসম্মানের লড়াই। সাধারণত প্রতি দুই বছর পরপর ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া পর্যায়ক্রমে নিজেদের দেশে পাঁচ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ আয়োজন করে। সিরিজ ড্র হলে বর্তমান চ্যাম্পিয়নই অ্যাশেজ ধরে রাখে—এটিও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য।

এমন অনেক অসাধারণ মূহুর্তের জন্ম দিয়েছে অ্যাশেজ। ছবি : এএফপি

অ্যাশেজের ইতিহাসে এমন অসংখ্য অধ্যায় রয়েছে, যেগুলো ক্রিকেটকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। ১৯৩২-৩৩ সালের বডিলাইন সিরিজ ছিল তার মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত। ডন ব্র্যাডম্যানকে থামাতে ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। ক্রিকেটের ইতিহাসে এত বড় বিতর্ক খুব কমই দেখা গেছে। এরপর আসে স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যানের যুগ। টেস্ট ক্রিকেটে ৯৯.৯৪ গড়ের এই কিংবদন্তি ব্যাটার অ্যাশেজকে নিজের রাজত্বে পরিণত করেছিলেন। তাঁর ব্যাটিং অস্ট্রেলিয়াকে বহুবার সিরিজ জিতিয়েছে এবং অ্যাশেজকে দিয়েছে নতুন উচ্চতা। আশির দশকে ইয়ান বোথামের অবিশ্বাস্য অলরাউন্ড নৈপুণ্যে ১৯৮১ সালের সিরিজ ইতিহাসে ‘বোথামস অ্যাশেজ’ নামে অমর হয়ে আছে। আবার ২০০৫ সালের অ্যাশেজকে অনেক ক্রিকেট-বিশ্লেষক সর্বকালের সেরা টেস্ট সিরিজ হিসেবে বিবেচনা করেন। মাইকেল ভনের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড এবং রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার সেই লড়াই কোটি দর্শককে টেস্ট ক্রিকেটের প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছিল।

সময়ের সঙ্গে অ্যাশেজের নায়কও বদলেছে। একসময় যেখানে ব্র্যাডম্যান, লেন হাটন কিংবা ডেনিস লিলি ছিলেন আলোচনায়, পরবর্তী সময়ে সেই তালিকায় যোগ হয়েছেন শেন ওয়ার্ন, গ্লেন ম্যাকগ্রা, স্টিভ ওয়াহ, রিকি পন্টিং, অ্যালিস্টার কুক, জেমস অ্যান্ডারসন, স্টিভ স্মিথ, বেন স্টোকস, জো রুট, প্যাট কামিন্স এবং মিচেল স্টার্কের মতো কিংবদন্তিরা। তাঁদের পারফরম্যান্স শুধু ম্যাচের ফল নির্ধারণ করেনি, অ্যাশেজের ইতিহাসকে করেছে আরও সমৃদ্ধ।

আরও পড়ুন
ওয়াটারফোর্ড ক্রিস্টাল অ্যাশেজ ট্রফি হাতে অস্ট্রেলিয়া দল
এএফপি

পরিসংখ্যানও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার গভীরতা তুলে ধরে। ১৮৮২ সাল থেকে ২০২৫-২৬ মৌসুম পর্যন্ত ৭৪টি অ্যাশেজ সিরিজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া জিতেছে ৩৫টি, ইংল্যান্ড ৩২টি এবং ৭টি সিরিজ ড্র হয়েছে। সিরিজ ড্র হলে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ট্রফি ধরে রাখায় অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘ সময় ধরে অ্যাশেজের দখল বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

আধুনিক ক্রিকেটে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের ব্যস্ত সূচি, টি-টোয়েন্টির জনপ্রিয়তা এবং ওয়ানডে ক্রিকেটের বাণিজ্যিক সাফল্যের মধ্যেও অ্যাশেজের আবেদন একটুও কমেনি। বরং ক্রিকেটারদের কাছে এটি এখনো ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি। কারণ, এখানে শুধু দক্ষতা নয়, প্রয়োজন ধৈর্য, মানসিক দৃঢ়তা এবং পাঁচ দিনের কঠিন লড়াইয়ে টিকে থাকার সামর্থ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অস্ট্রেলিয়া ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। প্যাট কামিন্সের নেতৃত্বে তাদের বোলিং আক্রমণ এবং ট্রাভিস হেড, স্টিভ স্মিথদের ব্যাটিং-দৃঢ়তা দলটিকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড বাজবল দর্শনের মাধ্যমে আক্রমণাত্মক টেস্ট ক্রিকেট খেললেও ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি। ২০২৫ সালের অ্যাশেজ সিরিজে অস্ট্রেলিয়া ৪-১ ব্যবধানে জয় পেয়ে আবারও প্রমাণ করেছে, নিজেদের মাটিতে তারা কতটা দুর্ধর্ষ। ফলে বর্তমানে অ্যাশেজের অস্থিকলসও অস্ট্রেলিয়ার দখলেই রয়েছে।

অ্যাশেজকে ঘিরে উত্তেজনা কখনো পুরোনো হয় না।

তবে অ্যাশেজের সৌন্দর্য এখানেই যে এটি কখনোই শুধু পরিসংখ্যানের গল্প নয়। প্রতিটি নতুন সিরিজে লেখা হয় এক একটি নতুন গল্প, ইতিহাস। নতুন নায়ক আসে, নতুন নাটক জন্ম নেয়, আবার ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হয় নতুন অধ্যায়। একটি দুর্দান্ত স্পেল, একটি ডাবল সেঞ্চুরি কিংবা একটি অবিশ্বাস্য ক্যাচ, মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে পুরো সিরিজের গতিপথ। আজ যখন ক্রিকেটের সংজ্ঞা দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তখনো অ্যাশেজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্রিকেট কেবল বিনোদন নয়, এটি ঐতিহ্য, আত্মমর্যাদা এবং ইতিহাসের উত্তরাধিকার। ১৮৮২ সালের একটি ব্যঙ্গাত্মক সংবাদ থেকে যে গল্পের শুরু, সেটি আজও কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর হৃদয়ে সমান আবেগ নিয়ে বেঁচে আছে।

সম্ভবত এ কারণেই অ্যাশেজকে ঘিরে উত্তেজনা কখনো পুরোনো হয় না। একটি ছোট্ট অস্থিকলসের ভেতরে যে আগুন জ্বলেছিল দেড় শতাব্দী আগে, সেই আগুন আজও নিভে যায়নি। বরং প্রতিটি নতুন সিরিজে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ক্রিকেটের সবচেয়ে গৌরবময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা—অ্যাশেজ।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা