ফুটবলে লাল-সবুজের নতুন ভরসা
ফুটবল মাঠে মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে থাকা একজন খেলোয়াড় পুরো খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেন। আক্রমণ গড়ে তোলা, প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়া এবং দলের ভারসাম্য বজায় রাখা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু এই জায়গাটি। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরে মাঝমাঠে সেই নিয়ন্ত্রণ, সেই স্থিরতা অনুপস্থিত ছিল। দল হয়ে পড়েছিল অসংগঠিত ও দিশাহীন। ঠিক এই অবস্থায় হামজা চৌধুরীর আগমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
হামজার অন্তর্ভুক্তি শুধু একটি পজিশনের ঘাটতি পূরণ নয়, বরং পুরো দলের খেলায় নতুন মাত্রা যোগ করার সুযোগ তৈরি করেছে। ইউরোপের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে খেলার অভিজ্ঞতা, ম্যাচ পড়ার দক্ষতা এবং মাঝমাঠে খেলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা—এই সবকিছু মিলিয়ে তিনি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
১৯৯৭ সালের ১ অক্টোবর ইংল্যান্ডের লফবোরোতে জন্মগ্রহণ করেন হামজা দেওয়ান চৌধুরী। গ্রেনাডিয়ান বাবা এবং বাংলাদেশি মায়ের সন্তান তিনি। শ্রমজীবী না হলেও এক সাধারণ পারিবারিক পরিবেশেই বেড়ে ওঠা তাঁর শৈশব। ছোটবেলা থেকেই একটি ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি মুসলিম পরিবারের আবহে বড় হন। মায়ের পৈতৃক নিবাস সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার বাহুবলে। শৈশব থেকেই বাংলাদেশে যাতায়াতের কারণে এ দেশের সংস্কৃতি, মানুষ আর মাটির সঙ্গে তাঁর একটি গভীর আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়।
২০০৫ সালে মাত্র সাত বছর বয়সে লেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাবের একাডেমিতে যোগ দিয়ে ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেন হামজা। ছোটবেলা থেকেই তাঁর প্রতিভা নজরে পড়ে কোচদের। কৈশোরেই ইউরোপের বেশ কয়েকটি বড় ক্লাব তাঁর দিকে নজর দিয়েছিল। ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে। ২০১৬ সালে বার্টন অ্যালবিয়নে ধারে খেলে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক ঘটে তাঁর। সেখানে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও পরিণত করে তোলে।
২০১৭ সালে লেস্টার সিটির মূল দলে অভিষেকের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর শীর্ষ পর্যায়ের যাত্রা। এরপর প্রিমিয়ার লিগ, ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতা—সবখানেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন। লেস্টারের হয়ে শতাধিক ম্যাচ খেলার পাশাপাশি ২০২১ সালে এফএ কাপ জয়ের গৌরব অর্জন করেন। ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় গোল করে তিনি প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলার হিসেবে নতুন ইতিহাসও গড়েন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে শুরুটা হয়েছিল ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে। ২০১৮ সালে টুলন টুর্নামেন্টে অভিষেকের পর ২০১৯ সালের উয়েফা ইউরোপিয়ান অনূর্ধ্ব-২১ চ্যাম্পিয়নশিপেও দলের অংশ ছিলেন তিনি। তখন স্বপ্ন ছিল ইংল্যান্ডের সিনিয়র দলে খেলা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় সিদ্ধান্ত। ২০২৪ সালে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন। ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের অনাপত্তি সনদ পাওয়ার মাধ্যমে সেই পথ আরও সুগম হয়।
বাংলাদেশ জাতীয় দলে তাঁর অন্তর্ভুক্তি ঘটে এমন এক সময়ে, যখন দলটি দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের বাইরে ছিল। সমর্থকদের মনে জমে ছিল হতাশা, প্রশ্ন আর অনিশ্চয়তা। ঠিক সেই সময় একজন ইউরোপীয় লিগে খেলা, অভিজ্ঞ এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ মিডফিল্ডারের আগমন যেন নতুন করে আশার আলো জ্বালায়।
২০২৫ সালের ২৫ মার্চ ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বাংলাদেশের হয়ে তাঁর অভিষেক ঘটে। ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হলেও মাঝমাঠে তাঁর উপস্থিতি ছিল স্পষ্ট। খেলার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়া এবং বল বণ্টনের দক্ষতা—সব মিলিয়ে তিনি দলকে একটি নতুন মাত্রা এনে দেন। একই বছরের ৪ জুন ভুটানের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করে তিনি তাঁর সামর্থ্যের প্রমাণ দেন।
হামজা চৌধুরীর খেলার ধরন আধুনিক ফুটবলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি শুধু রক্ষণে অবদান রাখেন না, আক্রমণ গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মাঝমাঠে তাঁর উপস্থিতি পুরো দলকে সংগঠিত হতে সাহায্য করে। তাঁর আত্মবিশ্বাস এবং খেলার প্রতি নিবেদন সতীর্থদের মাঝেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তবে বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। একজন খেলোয়াড় একা পুরো দলকে বদলে দিতে পারেন না। ফুটবল একটি দলগত খেলা, যেখানে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। তবু একজন খেলোয়াড় তাঁর অভিজ্ঞতা, মানসিকতা এবং পেশাদারত্ব দিয়ে একটি দলের ভেতরে পরিবর্তনের সূচনা করতে পারেন।
হামজা চৌধুরীর আগমন বাংলাদেশের ফুটবলে সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে একজন খেলোয়াড় কীভাবে পুরো খেলার গতিপথ প্রভাবিত করতে পারেন, তার একটি সম্ভাবনাময় উদাহরণ হয়ে উঠছেন তিনি। লাল-সবুজের জার্সিতে তাঁর প্রতিটি উপস্থিতি এখন শুধু একটি ম্যাচের অংশ নয়—এটি একটি জাতির নতুন করে স্বপ্ন দেখার গল্প।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা