ক্রিকেটের নৈতিক সংকট: আইসিসির নিরপেক্ষতা কোথায়
ক্রিকেট আর কেবল একটি খেলা নয়, এটি এখন অর্থনীতি, কূটনীতি ও ক্ষমতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি বৈশ্বিক রাজনীতি। সাম্প্রতিক টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে, তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ক্ষমতার ভারসাম্য কতটা অসম।
বাংলাদেশ যখন নিরাপত্তা, দর্শক ও সাংবাদিকদের সুরক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলো সামনে আনে, তখন সেগুলোকে ‘অতিরঞ্জিত’ বা ‘অযৌক্তিক আশঙ্কা’ হিসেবে উপেক্ষা করা হয়। অথচ আইসিসির নিজস্ব ঝুঁকি মূল্যায়ন নথিতেই সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ঝুঁকির মাত্রা ‘মাঝারি থেকে উচ্চ’ হিসেবে উল্লেখ আছে। প্রশ্ন হলো, এই ঝুঁকি যদি বাস্তবায়িত হয়, দায়ভার কে নেবে?
ক্রিকেট যদি সত্যিই বৈশ্বিক খেলা হয়, তবে তা কোনো একটি দেশের করপোরেট স্বার্থে পরিচালিত হতে পারে না। ছোট বা মাঝারি শক্তির দেশগুলোকে বারবার আপস করতে বাধ্য করা হলে ক্রিকেটের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানেই আইসিসির নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ। বিশ্বের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে তাদের দায়িত্ব ছিল সব দেশের উদ্বেগ সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রস্তাবিত বিকল্প ভেন্যু পরিবর্তন, গ্রুপ পুনর্বিন্যাস কিংবা নিরপেক্ষ স্থানে ম্যাচ আয়োজন—একটির পর একটি প্রত্যাখ্যান হওয়ায় স্পষ্ট হয়, সিদ্ধান্তের পাল্লা শুরু থেকেই একদিকে হেলে ছিল।
বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে আইপিএল থেকে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনার পর। এর পরপরই বাংলাদেশের ওপর কূটনৈতিক ও সূচিগত চাপ বৃদ্ধি কাকতালীয় মনে করার সুযোগ খুব কমই আছে। বিসিসিআইয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব যে আইসিসির সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে, সেটি এখন আর গোপন কোনো সত্য নয়।
ক্রিকেট যদি সত্যিই বৈশ্বিক খেলা হয়, তবে তা কোনো একটি দেশের করপোরেট স্বার্থে পরিচালিত হতে পারে না। ছোট বা মাঝারি শক্তির দেশগুলোকে বারবার আপস করতে বাধ্য করা হলে ক্রিকেটের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশ্বকাপ আয়োজন তখন কেবল একটি ব্র্যান্ডিং ইভেন্টে পরিণত হয়, যেখানে ন্যায্যতা ও সম্মানের প্রশ্ন গৌণ হয়ে যায়।
বাংলাদেশের এই অবস্থান নিছক একটি দেশের ক্ষোভ নয়, এটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। আজ বাংলাদেশ, কাল অন্য কোনো দেশ। তাই এই লড়াই একক নয়; এটি ক্রিকেটকে সত্যিকার অর্থে সবার খেলা হিসেবে টিকিয়ে রাখার লড়াই।
ক্ষমতার রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে ক্রিকেটকে যদি বাঁচাতে হয়, তবে আইসিসিকে সত্যিকারের নিরপেক্ষ অভিভাবকের ভূমিকায় ফিরতেই হবে। না হলে মাঠের খেলায় উত্তেজনা থাকলেও ক্রিকেটের আত্মা হারিয়ে যাবে প্রশাসনিক বৈষম্যে।
সভাপতি, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা