জীবনের ক্লেদাক্ত বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কি প্রকৃত মুক্তি মেলে
এখনো মনে পড়ে, বছর দুই আগেও ভাবতাম যে মানুষ কেন দুঃখকে এত আঁকড়ে ধরে? কেন যন্ত্রণার চর্বিতচর্বণ করে বারবার স্মৃতিকাতরতার চোরাবালিতে ডুব দেয়? মনে হতো, চাইলেই তো এই বিষাদের মেঘ এড়িয়ে রোদ্দুরে ভেসে থাকতে পারি। কিন্তু বাস্তবতায় পা দিয়ে এখন বুঝতে পারি, সেই ভাবনা কতটা ঠুনকো ছিল। পদ্মপাতার জলের মতো জগৎ থেকে নিজেকে নির্লিপ্ত রাখা কি আদৌ সম্ভব? আমি যদি নিজেকে শুচিতার চূড়ায় বসিয়ে ভাবি যে তোমাদের কল্লোলিত কোলাহলে মিশলে আমার আত্মা কলুষিত হবে, কিংবা স্খলনের ভয়ে যদি জীবনের কোনো আঙিনায় পা না রাখি, তবে সেই নিষ্ক্রিয়তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?
অথচ বাস্তবতা এই যে প্রিয় মানুষ বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস ফেললেও আমার ভেতরে ঝড় ওঠে। তাঁর লেখা কোনো বিচ্ছেদ গান কিংবা বিষণ্ন কবিতার দুটি বাক্য পড়লেও তার রেশ সপ্তাহখানেক আমার সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে; কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারি না। অথচ চাইলেই পারতাম এই অনুভূতির পিঞ্জর ভেঙে উল্লাসের উৎসবে মাতোয়ারা হতে। কিন্তু তার পরিণতি কী হতো? আমি একাকী হয়ে যেতাম। আর তখন সেই শুষ্ক, তথাকথিত পবিত্র আত্মার নিঃসঙ্গতার বিষণ্নতা আমাকে তিলে তিলে গ্রাস করত। ঠিক যেমন খাঁচার ভেতর বন্দী পাখি তার ডানা বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে একসময় ওড়ার ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলে, আমার অবস্থাও হতো তেমন।
নৈতিকতা নিয়ে সমাজে কত মুখরোচক আলোচনা হয়, অথচ এই নৈতিকতা অনেক সময় সূক্ষ্ম ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়। ফ্রিডরিখ নিৎসে যেমন সমাজকে স্লেভ মোরালিটি এবং মাস্টার মোরালিটির দ্বন্দ্বে চিরে দেখিয়েছেন, যেখানে দুর্বলরা নিজেদের অক্ষমতাকেই নৈতিকতার চাদরে ঢেকে রাখে। নিৎসে তাঁর ‘অন দ্য জিনিয়ালজি অব মোরালস’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, সমাজে যারা শারীরিকভাবে বা রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ও অবদমিত ছিল, তারা ক্ষমতাশালীদের (মাস্টার মোরালিটি) প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও ঈর্ষা থেকে এই নৈতিকতার জন্ম দিয়েছে। তাঁর মতে, এটি আসলে দুর্বলদের একধরনের মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষা, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের অক্ষমতাকে নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব হিসেবে জাহির করে সান্ত্বনা খোঁজে।
আবার আমাদের মতো সাধারণ মানুষের এই পাপবিদ্ধ হওয়ার ভয়ে গুটিয়ে থাকা এবং নৈতিকতা রক্ষার নামে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকাকে জার্মান দার্শনিক জর্জ ভিলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ফিনোমেনোলজি অব স্পিরিট’-এ ‘বিউটিফুল সৌল’ বা সুন্দর আত্মার ধারণা দিয়ে চিহ্নিত করেছেন। এই সুন্দর আত্মা যেন সেই কাচের পুতুলের মতো, যা বাইরের পৃথিবীর সামান্য ধুলাবালির স্পর্শ সইতে পারে না বলে নিজেকে গুটিয়ে রাখে শোকেসে।
আমরা যদি ফরাসি অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জঁ পল সার্ত্রের দর্শনের দিকে তাকাই, তবে দেখব তিনি এই ধরনের নিষ্ক্রিয়তাকে ব্যাড ফেইথ বা আত্মপ্রতারণা বলেছেন। সার্ত্রের মতে, মানুষ যখন নিজের স্বাধীনতা আর দায়বদ্ধতা এড়াতে কোনো অজুহাতের আশ্রয় নেয়, তখন সে আসলে নিজের সঙ্গে ছলনা করে। আবার মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইয়ুং-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, আমরা যদি আমাদের ভেতরের অন্ধকার দিক বা শ্যাডোকে স্বীকার না করে আলোর ভান করি (ভালো বলছি মানে তার মধ্যে মন্দ থাকবেই), তবে সেই ব্যক্তিত্ব কখনো পূর্ণতা পায় না। অর্থাৎ নিজেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ভেবে সমাজ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা হলো মরীচিকা।
এই অন্তহীন দোলাচলের ইতি আমরা কীভাবে টানতে পারি? হেগেল নিজেই তার সমাধান দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, এই বন্ধনদশার অবসান তখনই ঘটে, যখন সেই সুন্দর আত্মা বুঝতে পারে যে জগৎকে সম্পূর্ণ বর্জন করে অন্তরের মণিকোঠায় পবিত্রতা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। কাদা না মেখে যেমন পদ্মফুল ফোটানো যায় না, তেমনি জীবনের ক্লেদাক্ত বাস্তবতাকে অস্বীকার করে প্রকৃত মুক্তি মেলে না। যখন সে নিজের সীমাবদ্ধতা আর দোষগুলো অকপটে স্বীকার করে এবং অন্যকে মার্জনা করতে শেখে, তখনই সে এই রক্তমাংসের বাস্তব জগতের সঙ্গে একাত্ম হতে পারে। তখন সে হাত মেলাতে পারে তার সঙ্গে, যাকে একসময় সে অপবিত্র বা সুন্দর আত্মা নয় বলে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। আর সেই অহংকারহীন, নিঃশর্ত মিলনের পরম মুহূর্তেই ঈশ্বর বিরাজ করেন। আমরা তখনই জীবনের মধ্যে প্রকৃত ঈশ্বরের স্পন্দন খুঁজে পাই।
শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগ, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়।