ওসিডি: যে কষ্ট আমরা বুঝতেই শিখিনি
‘এতবার হাত ধোও কেন?’
‘একই জিনিস বারবার চেক করার কী আছে?’
‘তুমি তো অযথাই বেশি চিন্তা করো!’
বাংলাদেশের অনেক পরিবারে হয়তো এমন কথাগুলো খুব পরিচিত। কেউ বারবার দরজা, গ্যাসের চুলা কিংবা বৈদ্যুতিক সুইচ পরীক্ষা করলে আমরা তাকে বলি, ‘তোমার মাথায় সমস্যা আছে।’ কেউ বারবার হাত পরিষ্কার করলে বলি, ‘এত পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার কী দরকার?’
কেউ একই প্রশ্ন বারবার করলে বিরক্ত হয়ে যাই। কিন্তু আমরা খুব কমই ভাবি, এর পেছনে কি কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকতে পারে?
আমাদের দেশে শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে কথা বলা যতটা স্বাভাবিক, মানসিক অসুস্থতা নিয়ে কথা বলা ততটা স্বাভাবিক নয়। জ্বর হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া স্বাভাবিক, দাঁতে ব্যথা হলে ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো চিন্তা যদি দিনের পর দিন একজন মানুষকে ভেতর থেকে অস্থির করে রাখে, কোনো ভয় যদি তাকে বারবার একই কাজ করতে বাধ্য করে, তখন অনেকেই সেটিকে চিকিৎসার বিষয় হিসেবে দেখেন না।
এখানেই অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার বা ওসিডি নিয়ে আমাদের অজ্ঞতার একটি বড় জায়গা তৈরি হয়।
ওসিডি আসলে কী?
ওসিডির দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—অবসেশন ও কমপালসন।
অবসেশন হলো অনিচ্ছাকৃতভাবে বারবার ফিরে আসা অস্বস্তিকর চিন্তা, ভয় বা মানসিক তাড়না। আর কমপালসন হলো সেই অস্বস্তি বা উদ্বেগ কমানোর জন্য বারবার কোনো কাজ করা বা কোনো মানসিক আচরণ সম্পন্ন করা।
ধরুন, একজন মানুষের মনে বারবার আসছে, ‘দরজাটা ঠিকমতো লক হয়নি’। সে জানে দরজা লক করেছে। তারপরও সন্দেহটা যাচ্ছে না। সে আবার গিয়ে দেখে। কিছুক্ষণ পর আবার সন্দেহ হয়। আবার দেখে। একসময় হয়তো সে নিজেই ভাবতে পারে, ‘আমি তো জানি দরজাটা লক করা। তাহলে আবার কেন দেখছি?’
কিন্তু শুধু বুঝতে পারলেই সেই তাড়নাটা সব সময় বন্ধ হয়ে যায় না। এটাই ওসিডির কষ্টের জায়গাগুলোর একটি।
‘আমি তো পরিষ্কার থাকতে পছন্দ করি, আমারও ওসিডি আছে’
ওসিডি নিয়ে আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, যে মানুষ পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসে, গোছানো থাকতে পছন্দ করে বা কোনো কাজ বারবার করে, তার ওসিডি আছে।
আসলে বিষয়টি এত সহজ নয়।
পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করা স্বাভাবিক। দরজা লক করেছি কি না, একবার নিশ্চিত হওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু যখন কোনো চিন্তা বা আচরণ এতটাই তীব্র ও পুনরাবৃত্তিমূলক হয়ে ওঠে যে তা একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবন, পড়াশোনা, কাজ, সম্পর্ক কিংবা মানসিক শান্তিতে উল্লেখযোগ্য সমস্যা তৈরি করে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাই ওসিডিকে মজা করে ‘পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার রোগ’ বলা উচিত নয়। এতে যাঁরা সত্যিই ওসিডির সঙ্গে লড়ছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতাকে ছোট করা হয়।
‘নিজেকে বোঝালেই তো হয়’
আমাদের সমাজে মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, ‘নিজেকে শক্ত করো, ‘বেশি চিন্তা কোরো না’, ‘মনকে বোঝাও, সব ঠিক হয়ে যাবে’।
কিন্তু ওসিডিতে সমস্যাটি শুধু বেশি চিন্তা করা নয়। একজন মানুষ হয়তো নিজের চিন্তার অযৌক্তিকতা বুঝতে পারছেন। তবু সেই চিন্তা বারবার ফিরে আসতে পারে। তিনি হয়তো জানেন যে দশবার দরজা পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই, কিন্তু না করলে ভেতরের অস্বস্তি এতটাই বেড়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত আবার পরীক্ষা করেন।
তাই বাইরে থেকে বিষয়টি যতটা অদ্ভুত মনে হয়, ভেতর থেকে তা একজন মানুষের জন্য ততটাই ক্লান্তিকর হতে পারে।
আমাদের দেশে সমস্যা আরও বড়। কারণ, আমরা অনেক সময় সমস্যাটাকেই চিনতে পারি না।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা আগের তুলনায় বাড়ছে। তবু অনেক মানুষের কাছে সাইকোলজিস্ট বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারদের কাছে যাওয়া এখনো দৈনন্দিন স্বাস্থ্যসেবার স্বাভাবিক অংশ হয়ে ওঠেনি। অনেকে জানেই না কখন একজন সাইকোলজিস্টের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।
ফলে কেউ যদি বছরের পর বছর অনিচ্ছাকৃতভাবে বারবার একই চিন্তা মাথায় আসা, কোনো কিছু অতিরিক্তভাবে পরীক্ষা করা, জীবাণু বা ময়লা নিয়ে ভয়, একই কাজ বারবার করা কিংবা তীব্র উদ্বেগ নিয়ে বেঁচে থাকেন, তিনি হয়তো সেটিকে নিজের ‘স্বভাব’ বলেই ধরে নেন।
কেউ ভাবেন, ‘আমি এমনই’।
কেউ বলেন, ‘আমার একটু বেশি পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস।’
কেউ আবার নিজের চিন্তার জন্য লজ্জিত হন এবং কাউকে কিছু বলেন না। আর পরিবারের মানুষ হয়তো বলেন, ‘এসব কিছুই না। বেশি ভাবলে এমন হয়।’
এভাবে সমস্যাটি চিহ্নিত হওয়ার আগেই অনেক সময় বছরের পর বছর কেটে যায়।
সাহায্য চাইতে লজ্জা কেন?
আমরা শরীরের অসুস্থতাকে যতটা সহজে গ্রহণ করি, মনের অসুস্থতাকে ততটা করি না। একজন মানুষ যদি বলেন, ‘আমার পেটে ব্যথা করছে’; আমরা তাকে ডাক্তার দেখাতে বলি।
কিন্তু তিনি যদি বলেন, ‘একই চিন্তা বারবার মাথায় আসছে, আমি খুব অস্থির হয়ে যাচ্ছি’; তখন হয়তো তাকে বলা হয়, ‘এত ভাবো কেন?’
এই পার্থক্যটা আমাদের বদলাতে হবে।
সাইকোলজিস্টের কাছে যাওয়া মানে কেউ পাগল হয়ে গেছে, এমন নয়। যেমন শরীর ভালো রাখার জন্য চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া স্বাভাবিক, তেমনি মানসিক সুস্থতার জন্য একজন মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারের সাহায্য নেওয়াও স্বাভাবিক।
ওসিডি নিয়ে হাসি নয়, বোঝাপড়া প্রয়োজন
কারও বারবার হাত ধোয়া দেখে হাসার আগে একবার ভাবুন, হয়তো সে নিজেও এই আচরণটি করতে করতে ক্লান্ত।
কারও বারবার দরজা পরীক্ষা করা দেখে বিরক্ত হওয়ার আগে ভাবুন, হয়তো সে জানে এটি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি, কিন্তু নিজের অস্বস্তির সঙ্গে লড়াই করছে।
কারও অদ্ভুত মনে হওয়া চিন্তার কথা শুনে তাকে বিচার করার আগে মনে রাখা দরকার, অনিচ্ছাকৃত চিন্তা একজন মানুষের ইচ্ছা, চরিত্র বা পরিচয়ের সরাসরি প্রতিফলন নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, ওসিডি কোনো হাসির বিষয় নয়। এটি কোনো ব্যক্তির দুর্বল মানসিকতার প্রমাণও নয়।
সচেতন হতে হবে
ওসিডি সম্পর্কে জানা মানে নিজের বা অন্য কারও ক্ষেত্রে নিজে নিজে পরামর্শ দেওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো, কখন কোনো আচরণ বা চিন্তা স্বাভাবিক অভ্যাসের সীমা ছাড়িয়ে একজন মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে, সেটি বুঝতে শেখা।
যদি কোনো চিন্তা বা আচরণ দীর্ঘদিন ধরে তীব্র অস্বস্তি তৈরি করে, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং পড়াশোনা, কাজ, সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে, তাহলে বিষয়টিকে অবহেলা না করে একজন মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। কারণ, মানসিক কষ্টও কষ্ট। তারও গুরুত্ব আছে। চিকিৎসা আছে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সাহায্য চাওয়া কোনো লজ্জার বিষয় নয়।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের আরও অনেক কথা বলা দরকার। কারণ, অনেক মানুষ হয়তো অসুস্থ হয়েও জানেন না যে তাঁদের সাহায্য প্রয়োজন। কেউ হয়তো জানেন না কোথায় যাবেন। আবার কেউ জানলেও সমাজের বিচারভীতিতে চুপ করে থাকেন।
ওসিডি নিয়ে আমাদের প্রথম কাজ তাই কাউকে ‘অদ্ভুত’ বলা নয়। প্রথম কাজ হলো বোঝার চেষ্টা করা। কিছু যুদ্ধ চোখে দেখা যায় না। কিছু মানুষ প্রতিদিন নিজের মনের সঙ্গেই যুদ্ধ করেন, নীরবে, একা। আর হয়তো আমাদের একটি ছোট্ট সচেতন বাক্যই সেই নীরব মানুষটিকে প্রথমবারের মতো বলতে সাহস দিতে পারে, ‘তোমার সমস্যাটা ছোট নয়। প্রয়োজনে সাহায্য নেওয়া স্বাভাবিক।’
শিক্ষার্থী, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়