কেউ যখন বলে ‘আমি ভালো নেই’, আমরা কি সত্যিই শুনি

সংকটে থাকা একজন মানুষের সব উত্তর আমাদের জানা প্রয়োজন নেই। কখনো শুধু বলতে হয়, ‘তুমি কেমন আছ? সত্যি করে বলো। আমি শুনছি।’ছবি: এআই/বন্ধুসভা

‘আপু, আমার কিছুই ভালো লাগছে না। খুব অশান্তি লাগছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। প্রচণ্ড রাগ উঠছে। সবাইকে বিরক্তিকর লাগছে, আবার কান্নাও পাচ্ছে। সবাই জোর করে আমাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। আমি এত আনলাকি কেন?’
‘আপু, আমি হাত কাটছি…’

একজন মানসিক স্বাস্থ্যপেশাজীবী হিসেবে এমন একটি বার্তা পড়ার পর প্রথম যে বিষয়টি মনে আসে, তা হলো মানুষটি হয়তো মরতে চাইছে না; সে হয়তো এই মুহূর্তের অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাইছে।

সংকটের মুহূর্তে মানুষের চিন্তার পরিসর সংকুচিত হয়ে আসে। যে মানুষটি স্বাভাবিক সময়ে অনেক সম্ভাবনা দেখতে পারে, তীব্র মানসিক যন্ত্রণার সময় সে হয়তো সামনে শুধু অন্ধকারই দেখতে পায়। তখন ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ বলা তার কাছে খুব দূরের কথা মনে হতে পারে।
তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধের প্রথম কাজ সব সময় উপদেশ দেওয়া নয়; বরং মানুষটির পাশে থাকা এবং তার কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া।

‘আমি আর পারছি না’—এই বাক্য তাই হালকাভাবে নেওয়া যায় না। এর ভেতরে থাকতে পারে দীর্ঘদিনের একাকিত্ব, প্রত্যাখ্যান, সম্পর্কের ভাঙন, অপমান, ব্যর্থতার অনুভূতি, পারিবারিক চাপ কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।

আমরা ছোটবেলা থেকেই একধরনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বড় হই। যেমন কুশল বিনিময়—
‘তুমি কেমন আছ?’
উত্তর আসে, ‘ভালো আছি।’
কিন্তু আমরা আসলে কজন ভালো থাকি?
তারপরও বলতে হয়, ‘ভালো আছি’। কারণ, ছোটবেলা থেকেই আমরা শিখেছি, নিজের আবেগ গোপন রেখে কথা বলতে হবে, নিজের কষ্ট গোপন রাখতে হবে। ভেতরে যে অনুভূতি হয়, সেই অনুভূতিটাও প্রকাশ করা যাবে না।

আমাদের শেখানো হয়, কষ্ট পাওয়া, কান্না পাওয়া, রাগ হওয়া কিংবা যেকোনো খারাপ লাগার অনুভূতি প্রকাশ করা মানেই দুর্বলতা। অনুভূতি প্রকাশ করলেই আমি দুর্বল হয়ে যাব। যে যত বেশি নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রেখে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে, সমাজের চোখে সে তত বেশি শক্তিশালী। আমরা বলতে শুনি—
‘আমি ভাই এত সহজে ভেঙে পড়ি না।’
‘এত সহজে ভেঙে পড়লে কীভাবে চলবে? সমাজে চলতে হলে তো শক্ত হতে হবে।’

আমরা আসলে দুর্বল অনুভব করতে চাই না। সবাই শক্তিশালী অনুভব করতে চাই। ভালো ছেলে বা ভালো মেয়ে হতে চাই। দায়িত্বশীল হতে চাই। অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে চাই। এগুলো আমাদের অন্তর্গত চাওয়া। ভেতরে একটা চাওয়া থাকে—আমি ভালো ছেলে বা ভালো মেয়ে হিসেবে অনুভব করতে চাই। আমি চাই কেউ আমাকে বলুক, ‘তুমি ভালো’, কিন্তু সেই চাওয়াটাও আমরা মুখে বলতে চাই না।

এই যে আমাদের মাস্ক পরার একটা অভ্যাস, এটাই আসলে ধীরে ধীরে আমাদের ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়। তাহলে কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করব? আমি তো ছোটবেলা থেকেই এভাবে শিখে আসছি। এটা শুধু আমি নই। এটা আপনি। এটা আমরা। এটা আমাদের গোটা সমাজ।

আজ ১০ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘চেঞ্জিং দ্য ন্যারেটিভ অন সুইসাইড’। আত্মহত্যা নিয়ে আমাদের চিন্তা ও কথোপকথনের ধরন বদলানোর আহ্বান। এবারের ডাক ‘কথোপকথন শুরু করি’। এই কথোপকথন হতে হবে বিচারহীন। প্রয়োজন হলে সরাসরি প্রশ্ন করতে হবে—‘তোমার কি নিজের জীবন শেষ করার চিন্তা হচ্ছে?’ এমন প্রশ্ন তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়, এমন ধারণা সঠিক নয়; বরং নিরাপদভাবে প্রশ্ন করা এবং মন দিয়ে শোনা তাকে নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দিতে পারে।

আরও পড়ুন

তবে শুধু কথা বলাই যথেষ্ট নয়। কেউ যদি নিজের ক্ষতি করে থাকে বা তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে থাকে, তাকে একা রাখা যাবে না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত পেশাদার ও জরুরি চিকিৎসা সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

আমাদের পরিবারেও এই পরিবর্তন প্রয়োজন। সন্তান পরীক্ষায় খারাপ করলে, সম্পর্ক ভেঙে গেলে, চাকরি হারালে কিংবা সামাজিকভাবে অপমানিত হলে আমরা অনেক সময় তার কষ্টকে ছোট করে দেখি। অথচ একই ঘটনা একজনের কাছে সাময়িক হতাশা, অন্যজনের কাছে হয়ে উঠতে পারে অসহনীয়। বিশেষ করে তরুণদের বলতে হবে, ‘আমাদের সময়ে এসব ছিল না’ নয়; বরং ‘তোমার সময়ে কী ঘটছে, আমাকে বলো’।

আত্মহত্যা প্রতিরোধ শুধু মানসিক স্বাস্থ্যপেশাজীবীদের দায়িত্ব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, গণমাধ্যম ও সমাজ—সবার দায়িত্ব এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সাহায্য চাওয়া লজ্জার নয়।

আত্মহত্যা প্রতিরোধের শুরু সব সময় বড় কোনো উদ্যোগ দিয়ে হয় না। কখনো একটি ফোনকল, কখনো পাশে বসে থাকা, কখনো একটি প্রশ্ন— ‘তুমি কেমন আছ?’
হয়তো সেই একটি কথায় মানুষের সব সমস্যা সমাধান হবে না। কিন্তু কথাটি তাকে এই মুহূর্ত পার হতে সাহায্য করতে পারে। আর একটি নিরাপদ আগামীকাল কখনো কখনো নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।

তাই আসুন, আত্মহত্যা নিয়ে আমাদের ভাষা বদলাই। বিচার নয়, বোঝার চেষ্টা করি। নীরবতা নয়, কথোপকথন শুরু করি। দূরে সরিয়ে নয়, পাশে দাঁড়াই। কারণ, সংকটে থাকা একজন মানুষের সব উত্তর আমাদের জানা প্রয়োজন নেই। কখনো শুধু বলতে হয়, ‘তুমি কেমন আছ? সত্যি করে বলো। আমি শুনছি।’

সাইকোথেরাপিস্ট ও মানসিক–বিষয়ক প্রশিক্ষক, কনসালট্যান্ট, সিটি হাসপাতাল লিমিটেড এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ