জানালার আলোছায়া আর আমাদের ভেতরের পৃথিবী
লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।
ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল। মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ দুটি যেন ধীরে ধীরে ছানাবড়া হয়ে এল। এক লাইন আরেক লাইনের সঙ্গে মিলছে না, মাঝখানে অদৃশ্য ফাঁকা ফাঁকা ভাব। মনে হচ্ছিল, অক্ষরগুলো যদি হাত বাড়িয়ে একটু কাছে টেনে আনতে পারতাম, হয়তো বাক্যটা স্পষ্ট হতো। ঝাপসা লাগছে, একটা লাইন দেখছি আরেকটা লাইনের মাঝখানে, কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মনে হচ্ছে, কয়েকটা অক্ষর জোড়া দিলে হয়তোবা বাক্যটা পূর্ণ হতো। যা লিখছি, তা পড়া যাচ্ছে না। বুঝতে পারলাম, চোখে একটু ব্যায়ামের দরকার। ক্লান্ত অনুভূতিও হচ্ছে। নিজেকে বললাম, ‘থাক, আর নয়। এবার একটু চোখকে আরাম দাও।’
জানালাটা খোলা থাকায় পর্দাটা সরাতেই একটা হিমহিম বাতাস, চুলগুলো উড়িয়ে দিল। মনে হলো, ব্যালকনিতে গিয়ে একটু বসে থাকি। যদিও গভীর রাত। শুধু দূর থেকে এক-দুইটা গাড়ির হর্ন ও রাস্তার কুকুরের ডাক শুনতে পাচ্ছি। হালকা তৃষ্ণা পেয়েছে। পানির বোতল হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে এসে বসলাম। ঝিরঝির একটা মিষ্টি বাতাস ঘিরে ধরল। পানি খেতে খেতে চারদিকে তাকালাম। আটতলায় থাকার একটা অদ্ভুত সুবিধা আছে, নিচের পৃথিবীটা যেন ছোট হয়ে যায়, আর আকাশটা মনে হয় হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যায়।
জানালার কাচ যতটা স্বচ্ছ, ভেতরের গল্পগুলো ঠিক ততটাই গভীর। আমরা জানালার বাইরে তাকিয়ে পৃথিবী দেখি, কিন্তু জানালা আমাদের ভেতরের পৃথিবীকেও প্রতিফলিত করে। আমাদের আনন্দ, দুঃখ, একাকিত্ব, প্রেম, অপেক্ষা, স্বপ্ন— সবকিছুকে।
আকাশটা যদিও অন্ধকারে ঢাকা, তারপরও ভীষণ স্বচ্ছ মনে হচ্ছে। দূরের লাইটগুলো চোখে এসে লাগছে। অন্ধকারে ছোট এক বিন্দু আলোর ছটাও চোখে এসে লাগে। আলোটা তখন তীক্ষ্ণ মনে হয়। ভালো লাগছে দেখতে। হঠাৎ চোখে পড়ল চারপাশের বাসার জানালাগুলোর কোনোটাতে লাইট জ্বলছে, কোনোটায় আবছা আলো, কোনোটায় নীল রঙের আলো, লাল রঙের আলো, কোনো জানালায় আবার অন্ধকার। কত জীবন, কত গল্প ও কত অনুভূতি একটা শহরের জানালাজুড়ে ছড়িয়ে থাকে!
প্রতিটি জানালা যেন একেকটি ভিন্ন গল্প, একটি নীরব বই। বাইরে থেকে আমরা কেবল ফ্রেমটা দেখি, কাচে লেগে থাকা আলো বা ছায়া দেখি। কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য অজানা গল্প, প্রতিদিন যেগুলো পাশ কাটিয়ে চলে যায় তার বেশির ভাগই অজানা রয়ে যায়। এই যেমন, একটি জানালা দিয়ে কাউকে যেমন হাসতে দেখি, একইভাবে অন্য একটি জানালার আড়ালে কেউ হয়তো কান্না থামানোর চেষ্টা করছে। কোনো জানালা দিয়ে শিশুর টুনটুনে হাসির শব্দ ভেসে আসে, আবার কোনো জানালায় নিঃশব্দ বিষণ্ণতা কাচে মেঘের মতো জমে থাকে। একই সূর্য ওঠে, একই বাতাস বয়ে যায়, কিন্তু অনুভূতি ভিন্ন ভিন্ন।
ভোরবেলা জানালা খুলে যে মানুষটি আলোকে অভ্যর্থনা জানায়, সে হয়তো নতুন আশার পথে হাঁটতে শুরু করেছে। আবার কারও জন্য এই আলো একই সঙ্গে স্মৃতি ও প্রত্যাশা নিয়ে আসে। জানালার পাশে বসে থাকা বৃদ্ধ হয়তো পুরোনো দিনের স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন, আবার পাশের ফ্ল্যাটের তরুণী তাকিয়ে আছে ভবিষ্যতের স্বপ্নের দিকে।
জানালার কাচ যতটা স্বচ্ছ, ভেতরের গল্পগুলো ঠিক ততটাই গভীর। আমরা জানালার বাইরে তাকিয়ে পৃথিবী দেখি, কিন্তু জানালা আমাদের ভেতরের পৃথিবীকেও প্রতিফলিত করে। আমাদের আনন্দ, দুঃখ, একাকিত্ব, প্রেম, অপেক্ষা, স্বপ্ন— সবকিছুকে। জানালা কেবল বাইরে দেখার জন্য নয়, ভেতরের আবেগগুলোকে সঠিকভাবে অনুভব করারও একটি মাধ্যম। এখানে প্রতিনিয়ত গল্প তৈরি হয়, গল্প ভাঙে, স্বপ্ন তৈরি হয় আবার স্বপ্ন ভাঙে। প্রতিটি জানালায় গড়ে ওঠে একেকটি সম্পর্ক। মেঘলা দিনে জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা যেমন গল্প লেখে, তেমনি মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তও জানালার আড়ালে নীরবে গল্প হয়ে জমে থাকে। আর সেই গল্পগুলোই আমাদেরকে, আমাদের মানুষকে, আমাদের সম্পর্ককে আরও মানবিক, আরও জীবন্ত করে তোলে।
আমরা সবাই একেকটা জানালা। কেউ সম্পূর্ণ খোলা, কেউ আধখোলা, কেউ আবার বন্ধ। কেউ জানালা খুলতে পারি, কেউ খুলতে পারি না, কেউ আবার জানালা খুলতে চাই, কিন্তু সাহস পাই না। কারও জানালা আলোয় ভরা, কারও মৃদু ছায়ায়, কারও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। কেউ হাসছি, কেউ লড়ছি, কেউ ভুলে থাকার চেষ্টা করছি, কেউ স্মৃতি আঁকড়ে ধরছি, কেউ আবার ভবিষ্যতের স্বপ্নে ভাসছি।
জানালা মানুষের মনের রূপক। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে জানালা মানুষের অন্তর্জগৎ ও বাহ্যিক পৃথিবীর মাঝের এক প্রতীকী পথ। আমরা যখন জানালার দিকে তাকাই, অবচেতনে নিজের মনের অবস্থা বাইরের দৃশ্যে প্রতিফলিত করি, যা ‘প্রজেকশন মেকানিজম’ নামে পরিচিত। বিষয়টা কী? বাইরের দৃশ্যের মধ্যে নিজের অনুভূতিকে দেখা। সহজ করে বললে, যা নিজের মধ্যে স্বীকার করতে কষ্ট হয়, তা অন্য কিছুর মধ্যে দেখতে পাওয়া। জানালা খোলা, আধখোলা না বন্ধ এই দৃষ্টিভঙ্গির নিরিখে ব্যক্তিত্বের প্রকারভেদও করা যায়। যেমন কেউ খোলা জানালার মতো খোলামেলা, স্পষ্ট; কেউ আধখোলা, মানে সতর্ক, কিছুটা দ্বিধাগ্রস্তও। আবার কেউ বন্ধ জানালার মতো, মানে তার অতীতের অভিজ্ঞতা, ভয় বা নিরাপত্তাহীনতার কষ্ট থাকতে পারে। মনের এই জটিলতা মনোবিজ্ঞানের ভাষায় হোপ অ্যাঞ্চর নামে পরিচিত। তবে আমরা চাইলেই মনের গভীরে থাকা আশা, আকাঙ্ক্ষা বা বেঁচে থাকার স্বপ্নকে জাগিয়ে তুলতে পারি, পথ চলতে পারি নতুন করে। আর নতুন করে শুরু করার ভাবনা বা প্রচেষ্টাই হলো মনের নোঙর, যা মানুষকে ডুবে যেতে দেয় না, হারতে দেয় না।
ব্যালকনিতে বসে জানালার দিকে তাকিয়ে ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে জানালার পেছনে যে গল্পগুলো লুকিয়ে আছে, সেই গল্পগুলোর প্রতি কেমন একটা ভালোবাসা অনুভব করতে শুরু করলাম। জানালাগুলো আমাকে মুহূর্তে যা দিল, তা হলো অনেকগুলো গল্প, অনেকগুলো ভালো লাগা, অনেকগুলো কষ্ট, কান্না আর আনন্দ। যদিও কোথাও অন্ধকার, তারপরও বলা যায় না এর মধ্যে হয়তোবা কোথাও লুকিয়ে আছে অনেক আনন্দ বা অনেক কষ্ট। অন্ধকার থাকলেও কোথাও না কোথাও আলো ঠিকই একসময় জ্বলে উঠবে। ওই যে দূরে ক্ষীণ অথচ তীক্ষ্ণ আলোটি দেখা যাচ্ছে, সেটাই হোক জীবনের দিশা। অন্ধকার ঠেলে ঠিক একসময় আলো আসে, আলো আসবে।
সাইকোথেরাপিস্ট ও মানসিক–বিষয়ক প্রশিক্ষক, কনসালট্যান্ট, সিটি হাসপাতাল লিমিটেড এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ