শিশুর প্রতি সহিংসতা: ট্রমা, নীরবতা ও আমাদের দায়
আমার বয়স যখন ৬, তখন এ ধরনের এক ঘটনার শিকার হই। যেটা মনের মধ্যে এক পর্বতসমান চাপ তৈরি করে রেখেছিল প্রায় ২০ বছর পর্যন্ত। তারপর সাইকোলজিক্যাল থেরাপিটিক পড়াশোনা করতে করতে ধীরে ধীরে এই ভয়ংকর অনুভূতি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি। এই সময়ে ভয়ংকর কিছু পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। আর এখন হাজারো মানুষকে এ ধরনের ট্রমা থেকে বেরিয়ে নিয়ে আসতে কাজ করছি।
আমি আমার পেশাদার জায়গায় ভালো কাজ করছি, স্বাভাবিক জীবনযাপন করছি। অন্যরাও তাঁদের জায়গায় ঠিক একই কাজ করছে। কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যমে সব আধুনিক করলেও আমাদের মনকে আধুনিক করতে পারছি না। মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর ঘটনাটির যত পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসছে, আমি ভয়ে এড়িয়ে যেতে পারছি না, আবার পড়তেও পারছি না। মনে হচ্ছিল এটা পড়ে হয়তো এমন কিছু পাব, যা আমাকে অনেক বেশি দায়বদ্ধতায় ফেলে দেবে। নিজের ভেতরে প্রশ্ন জাগবে—যে প্রতিজ্ঞাটা নিজের সঙ্গে করেছিলাম, সেটার কতটুকু এগিয়েছি?
আমরা সন্তানদের অচেনা মানুষ থেকে সাবধান করি; কিন্তু পরিচিত মানুষের ঝুঁকি সম্পর্কে খুব কম কথা বলি। সামাজিক ভদ্রতার আড়ালে আমরা শিশুদের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিতে দ্বিধা করি
আমি পেশায় একজন সাইকোথেরাপিস্ট। বহু বছর ধরে ট্রমা নিয়ে কাজ করছি। অসংখ্য মানুষকে দেখেছি, যাঁরা শৈশবে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হয়েছে; কিন্তু বহু বছর তা কাউকে বলতে পারেনি। তাই এ ধরনের সংবাদ আমার জন্য শুধুই একটি সংবাদ নয়, এটি আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেসব মানুষের কাছে, যাঁরা বছরের পর বছর ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ এবং নীরবতার ভেতর বেঁচে থেকেছে। অনেকেই জীবনের দুই দশক পার করে তারপর প্রথমবার বুঝতে পেরেছেন—তাঁদের সঙ্গে যা ঘটেছিল, সেখানে তাঁদের দোষ ছিল না।
ট্রমা একটি ঘটনার নাম নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অভিজ্ঞতা। শৈশবে নিরাপত্তা ভেঙে গেলে মানুষের ভেতরের পৃথিবীও ভেঙে যায়। পরে সে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও ভেতরে থাকে অদৃশ্য ক্ষত; যা আত্মবিশ্বাস, সম্পর্ক, নিরাপত্তাবোধ এবং আত্মপরিচয়কে প্রভাবিত করে।
একটি ছোট জুতা। ফ্ল্যাটের সামনে পড়ে আছে। অপরটি নেই।
প্রথমে কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। মনে হয়। হয়তো খেলতে গিয়ে খুলে ফেলেছে। হয়তো পাশের বাসায় গেছে। কিন্তু অজানা এক ভয় বুকের ভেতর কামড় দেয়। একজন মা–বাবা তখন আর যুক্তি দিয়ে ভাবতে পারেন না। শুরু হয় দরজায় দরজায় ধাক্কা, উন্মত্ত খোঁজ, আতঙ্কে ভেঙে পড়া সময়।
তারপর দরজা খোলে না। দরজা ভাঙা হয়। আর সেই মুহূর্তে শুধু একটি ঘর নয়, ভেঙে যায় একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ, একটি সমাজের নৈতিক নিরাপত্তাবোধ। শিশু রামিসার মতো একটি প্রাণ হারিয়ে যায় নির্মম সহিংসতায়। আমরা খবর পড়ি, শিউরে উঠি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করি; তারপর ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক হয়ে যাই। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—কেন এ ঘটনাগুলো বারবার ঘটছে? আরও বড় প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই শিখছি?
আজ আমরা প্রযুক্তিতে আধুনিক। বহুতল ভবন, নিরাপত্তা ক্যামেরা, স্মার্ট ডিভাইস—সবই আছে। কিন্তু একটি ভয়ংকর বাস্তবতা আমরা এখনো পুরোপুরি স্বীকার করতে পারিনি:
শিশু নির্যাতনের অধিকাংশ ঘটনা অপরিচিত মানুষের দ্বারা নয়; বরং পরিচিত পরিবেশে ঘটে। অপরাধী অনেক সময় পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা, আত্মীয়, পরিবারের পরিচিত কেউ, অথবা এমন ব্যক্তি যাঁকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করা হয়।
আমরা সন্তানদের অচেনা মানুষ থেকে সাবধান করি; কিন্তু পরিচিত মানুষের ঝুঁকি সম্পর্কে খুব কম কথা বলি। সামাজিক ভদ্রতার আড়ালে আমরা শিশুদের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিতে দ্বিধা করি। এই নীরবতাই অপরাধীর শক্তি।
প্রতিটি সহিংস অপরাধের পেছনে একটি মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাস থাকে। গবেষণায় দেখা যায়, অনেক যৌন সহিংস অপরাধীর মধ্যে থাকে। সহানুভূতির ঘাটতি, ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের বিকৃত আকাঙ্ক্ষা, দীর্ঘদিনের বিকৃত কল্পনা, নিজের জীবনের অমীমাংসিত মানসিক সমস্যা, সামাজিক নীরবতার সুযোগ। এর অর্থ এই নয় যে সব মানসিক সমস্যাগ্রস্ত মানুষ অপরাধী হয়ে ওঠে। বরং সমাজ যখন সতর্কসংকেতগুলো উপেক্ষা করে, তখন ঝুঁকি বেড়ে যায়। অস্বাভাবিক আচরণ, সহিংসতা, নারীবিদ্বেষ, অথবা যৌন বিকৃত প্রবণতার প্রকাশ—এগুলোকে ‘ব্যক্তিগত বিষয়’ বলে এড়িয়ে গেলে আমরা পরোক্ষভাবে বিপদকে বড় হতে দিই।
অভিভাবকদের জন্য জরুরি করণীয়
শিশু সুরক্ষা শুরু হয় সচেতনতা থেকে। তাই—
• শরীর সম্পর্কে শিক্ষা দিন: শিশুকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে। তার শরীর তার নিজের। ব্যক্তিগত অংশ আছে, যেখানে অনুমতি ছাড়া কেউ স্পর্শ করতে পারবে না।
• ‘না’ বলার অধিকার দিন: শিশুকে বাধ্য করবেন না জোর করে আদর নিতে বা কারও কোলে যেতে। সম্মতি শেখানো নিরাপত্তার প্রথম ধাপ।
• গোপনীয়তার সংস্কৃতি ভাঙুন: যদি কেউ শিশুকে বলে ‘এটা গোপন রাখবে’, তাকে শেখান, খারাপ গোপন কথা কখনো লুকিয়ে রাখা যাবে না।
• আচরণের পরিবর্তন লক্ষ করুন: হঠাৎ ভয় পাওয়া, নির্দিষ্ট কাউকে এড়িয়ে চলা, দুঃস্বপ্ন, আচরণগত পরিবর্তন। এগুলো সতর্কসংকেত হতে পারে।
• বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করুন: শিশু যেন জানে সে যেকোনো বিষয় বললেও তাকে দোষ দেওয়া হবে না।
ট্রমা আসলে শুধু একজনের নয়, পুরো সমাজের। প্রতিটি এমন ঘটনা শুধু একটি শিশুর মৃত্যু নয়; এটি হাজারো মানুষের ভেতরের অমীমাংসিত ট্রমাকে আবার জাগিয়ে তোলে। যাঁরা শৈশবে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নিয়ে বেঁচে আছেন, তাঁদের জন্য এই সংবাদগুলো আবারও পুরোনো ভয় ফিরিয়ে আনে।
সাইকোথেরাপিস্ট ও মানসিক–বিষয়ক প্রশিক্ষক, কনসালট্যান্ট, সিটি হাসপাতাল লিমিটেড এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ