কাজ না করলে কি সম্পর্কেও দূরত্ব আসে
ভালোবাসা দিয়ে সম্পর্কের শুরু। কিন্তু সেই সম্পর্ক টিকে থাকে দায়িত্বে। দায়িত্বের সবচেয়ে দৃশ্যমান, আবার সবচেয়ে নীরব প্রকাশ হলো কাজ। পরিবার, দাম্পত্য কিংবা কর্মক্ষেত্র—সব সম্পর্কের গভীরে তাকালে দেখা যায়, কাজই মানুষের অবস্থান নির্ধারণ করে দেয়।
একজন মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক নিঃশর্ত ভালোবাসার প্রতীক। তবু মা সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পান তখনই, যখন তাঁর সন্তান দায়িত্বশীল হয়, নিজের পড়াশোনা বা কাজের প্রতি মনোযোগী থাকে। যে সন্তান কর্মঠ, যে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন, তাকে নিয়ে মায়ের দুশ্চিন্তা কমে। ভালোবাসা হয়তো সমানই থাকে, কিন্তু সন্তানের কাজে মায়ের মনে জন্ম নেয় গর্ব। এ গর্বই সম্পর্কের ভেতরে একধরনের নীরব শক্তি যোগ করে।
সম্পর্কের ভাষা শুধু আবেগের নয়, দায়িত্বেরও। কাজ সেই দায়িত্বের সবচেয়ে বাস্তব রূপ। কাজই মানুষকে সম্পর্কের ভেতরে প্রয়োজনীয় করে তোলে,
দাম্পত্য সম্পর্কেও কাজের ভূমিকা গভীর। আমাদের সমাজে এখনো পরিবারকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দুজনের হলেও কাজ না করলে একসময় সম্পর্কের ভেতরে প্রশ্ন তৈরি হয়। স্বামী যখন নিয়মিত কাজ করেন, সংসারের দায় নেন, তখন স্ত্রী তাঁর মধ্যে ভরসার জায়গা খুঁজে পান। আবার একইভাবে স্ত্রী যদি কোনোভাবেই সংসার, সন্তান বা নিজের জীবনের দায়িত্বে সক্রিয় না থাকেন, তাহলে অনেক স্বামীই মানসিকভাবে ক্লান্ত বোধ করেন। এখানে কাজ মানে শুধু চাকরি নয়, ঘরের কাজ, পরিবার সামলানো, মানসিক সমর্থন দেওয়া—সবই কাজ। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন কোনো পক্ষই দায়িত্ব নিতে চায় না।
অকর্মঠতা অনেক সময় সম্পর্কের ভেতরে অদৃশ্য চাপ তৈরি করে। একজন মানুষ যদি দীর্ঘদিন কোনো কাজে যুক্ত না থাকেন, তাহলে তাঁর দায় অন্যদের ওপর এসে পড়ে। সেই চাপ ধীরে ধীরে ভালোবাসাকে ক্লান্ত করে তোলে। তখন সম্পর্ক আর আনন্দের থাকে না, হয়ে ওঠে বোঝার মতো ভারী। এ বাস্তবতা স্বীকার করা কঠিন হলেও অস্বীকার করা যায় না।
বেঁচে থাকার, অর্থাৎ জীবনযাপনের সবচেয়ে বড় উৎস কর্মস্থল। কর্মক্ষেত্রেও সম্পর্ক গড়ে ওঠে কাজের মাধ্যমেই। অফিসে বস সাধারণত সেই কর্মীকেই আস্থা দেন, যিনি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেন, সময়মতো সিদ্ধান্ত নেন এবং প্রয়োজনে বাড়তি উদ্যোগ দেখান। সহকর্মীদের সঙ্গেও সম্পর্ক দৃঢ় হয় তখনই, যখন কাজের জায়গায় একজন মানুষ নিজের ভূমিকা ঠিকভাবে পালন করেন। কাজ এখানে শুধু ফল দেওয়ার বিষয় নয়, এটি বিশ্বাসযোগ্যতার প্রকাশ।
কাজ মনেও প্রভাব ফেলে। কাজ থাকলে মানুষ নিজেকে প্রয়োজনীয় মনে করেন। নিজের একটা ভূমিকা আছে এ অনুভূতি মানসিক শান্তি এনে দেয়। বিপরীতে দীর্ঘদিন অকর্মণ্য থাকলে নিজের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেন। সেই অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে কথায়, আচরণে, নীরবতায়।
সম্পর্কের ভাষা শুধু আবেগের নয়, দায়িত্বেরও। কাজ সেই দায়িত্বের সবচেয়ে বাস্তব রূপ। কাজই মানুষকে সম্পর্কের ভেতরে প্রয়োজনীয় করে তোলে, আস্থার জায়গা তৈরি করে। তাই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ভালোবাসার পাশাপাশি কাজের এই নীরব দায় স্বীকার করাই হয়তো সবচেয়ে জরুরি।
ভালোবাসা মানুষকে কাছে আনে, আর কাজ মানুষকে ধরে রাখে। এ সত্যই আমাদের সম্পর্কগুলোর গভীরে প্রতিদিন নীরবে কাজ করে যায়।
আমি আমার জীবনটাকে যেভাবে উপভোগ করি, কাজে থাকি, কাজে বাঁচি, কাজের মাধ্যমেই স্বপ্ন পূরণ করি। কাজ করি ঘরে, সর্বোচ্চ মেধা-শ্রম দিয়ে থাকি কর্মস্থলে এবং সমাজের জন্য দেশের জন্য একজন নীরব স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করি। সর্বোপরি নিজেকে প্রশান্তিতে রাখতে, টিকিয়ে রাখতে, বাঁচিয়ে রাখতেই কাজ করি।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা