মানুষ কেন ট্রেন্ড ফলো করে

এআইয়ের এই সময়ে ক্যারিকেচার, জিবলি আর্টসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন টুলস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে।

ইনস্টাগ্রাম ও রিলসের যুগে এখন ট্রেন্ড খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এআইয়ের এই সময়ে ক্যারিকেচার, জিবলি আর্টসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন টুলস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে। এসব ট্রেন্ড মানুষকে দারুণভাবে আকর্ষণ করে। প্রশ্ন হলো মানুষ কেন এসব সাময়িক ট্রেন্ডে অংশ নেয়, অন্যকে নকল করে, আর অনলাইনে পোস্ট করে? ট্রেন্ড অনুসরণের মনোবিজ্ঞান বুঝতে পারলে পরিচয়, অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি এবং মানুষের সংযোগের চাহিদা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

সামষ্টিক মানসিকতা ও সামাজিক প্রমাণ
সামষ্টিক মানসিকতাই ট্রেন্ড অনুসরণের মূল কারণ। মনোবৈজ্ঞানিক ভাষায়, যেখানে অনেক মানুষ কোনো আচরণ বা ধারণা গ্রহণ করে শুধু এই কারণে যে অন্যরাও সেটি করছে। ইতিহাসে এই প্রবণতা গভীরভাবে লক্ষ করা যায়। প্রাচীন সমাজে দল বেঁধে থাকা ছিল টিকে থাকার শর্ত, একা চলা মানেই বিপদ।

যখন আমরা দেখি বন্ধু, পরিচিত বা ইনফ্লুয়েন্সাররা কোনো ট্রেন্ড অনুসরণ করছেন, তখন সেটিকে বেশি গ্রহণযোগ্য, আকর্ষণীয় ও সামাজিকভাবে লাভজনক মনে করি। যেমন ২০২০ সালে করোনার সময় ডলি পার্টন চ্যালেঞ্জে অংশগ্রহণকারীরা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিন্ডার ও লিংকডইনের জন্য চারটি ভিন্ন প্রোফাইল ছবি একসঙ্গে পোস্ট করত। এটি মানুষকে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিজের পরিচয় কীভাবে উপস্থাপন করে—তা দেখানোর সুযোগ দেয়। ট্রেন্ডটি ছিল সহজে শেয়ারযোগ্য ও মজার।

আরও পড়ুন

নিজস্ব পরিচয় প্রচারের ট্রেন্ড
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের নিজের নানা রূপ সাজিয়ে দেখানোর সুযোগ দেয়। প্রতিটি ট্রেন্ড হয়ে ওঠে পরিচয় পরীক্ষা বা দৃঢ় করার একটি ক্ষেত্র। যেমন জিবলি ট্রেন্ড ব্যবহারকারীদের স্টুডিও জিবলি সিনেমার মতো ভিডিও বানাতে উৎসাহিত করে।

এই ট্রেন্ড একধরনের আবেগ ও সৌন্দর্যবোধকে তুলে ধরে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘আমরা শুধু নিজের ভেতরে তাকিয়ে নয়, বরং সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে নিজের পরিচয় গড়ে তুলি (গফম্যান, ১৯৫৯)।’ জিবলি ট্রেন্ডে অংশ নেওয়া মানে শুধু ফিল্টার ব্যবহার নয়, বরং নিজের একটি আদর্শ রূপ তুলে ধরা। যেখানে সৌন্দর্য, গভীরতা ও শান্তির আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠে। যেন বলা হচ্ছে ‘আমি এমন জীবনই চাই।’

ডোপামিন চক্র
এর পেছনে একটি জৈবিক দিকও আছে। কোনো ট্রেন্ডে পোস্ট দিয়ে লাইক, শেয়ার বা প্রশংসাসূচক মন্তব্য পেলে মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেম সক্রিয় হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মস্তিষ্কের সেই অংশগুলোকে উত্তেজিত করে, যেগুলো খাবার বা মাদকেও সক্রিয় হয়। ট্রেন্ড অনুসরণ করলে বেশি স্বীকৃতি, এমনকি ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম ট্রেন্ডিং কনটেন্টকে অ্যালগরিদমে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে যাদের ভেতরের আগ্রহের চেয়ে বাইরের স্বীকৃতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তারা আগ্রহ না থাকলেও বা সামান্য লজ্জা লাগলেও ট্রেন্ডে অংশ নেয়।

ফোমো
ট্রেন্ড আমাদের মধ্যে একধরনের ফোমো তৈরি করে। অর্থাৎ কিছু মিস হয়ে যাওয়ার ভয়। অনেকে এই ভয় থেকেই ট্রেন্ডে অংশ নেয়। এটি মানুষের মৌলিক মানসিক চাহিদা বা অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন। যেমন সাম্প্রতিক জিবলি ট্রেন্ডে সবাই যখন বিভিন্ন ছবির কোলাজ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছিল, তখন আপনিও হয়তো এই দৃশ্য দেখে চিন্তা করেছেন, এতে অংশ না নিলে নিজেকে আলাদা বা পিছিয়ে পড়া মনে হতে পারে। অর্থাৎ আগ্রহ থেকে নয়, বরং বাদ পড়ে যাওয়ার ভয়ে ট্রেন্ডে যোগ দেওয়া।

ট্রেন্ড যখন বিপজ্জনক
সব ট্রেন্ড ক্ষতিকর নয়, অনেক ট্রেন্ড ইতিবাচকও। তবে একই মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া কখনো বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জেও ব্যবহৃত হয়। সহপাঠীদের চাপ, নতুনত্বের খোঁজ আর স্বীকৃতির তাগিদে বিশেষ করে কিশোরেরা কিছু ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এ ছাড়া কিছু ট্রেন্ড স্টেরিওটাইপও জিইয়ে রাখতে পারে। যেমন ডলি পার্টন চ্যালেঞ্জ অজান্তেই দেখিয়ে দেয়, ডেটিং অ্যাপ আর পেশাদার প্ল্যাটফর্মে মানুষ কেমন হওয়া উচিত। যদিও এটি মজা হিসেবেই করা হয়েছিল, তবু এতে সমাজের গভীর কিছু প্রত্যাশা প্রতিফলিত হয়েছে।

সম্মিলিত মানিয়ে নেওয়ার উপায় হিসেবে
ট্রেন্ডের ইতিবাচক দিকও আছে। করোনা মহামারির সময় মানুষ টক দইয়ের রুটি বানানো, ভাইরাল নাচ বা মজার চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে সময় উপভোগ করেছে। এসব দলগত আচরণ মানুষকে ভৌগোলিক দূরত্বের মধ্যেও একে অপরের সঙ্গে যুক্ত রাখে।

তাই ট্রেন্ড শুধু সুন্দর ফিল্টার বা ভাইরাল কোলাজ নয়। এগুলো আমাদের মানসিক দর্পণ, যেখানে দেখা যায় আমরা কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করি, পরিচয় গড়ি ও অনুভূতি খুঁজি। কখনো ট্রেন্ড মানে অনুকরণ, কখনো সৃজনশীলতা, চাপ মোকাবিলা বা কোথাও অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চেষ্টা।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে