খুব ইচ্ছা করে কাউকে সব বলে মুক্ত হয়ে যাই

প্রতীকীছবি: ফ্রিপিক

মাঝেমধ্যে ইচ্ছা হয় কষ্টের কথাগুলো কারও কাছে বলি। প্রকৃতিঘেরা কোনো এক নির্জন স্থানে বসে নির্ভয়ে কোনো বিশ্বস্ত মানুষকে মন খুলে সব বলে ফেলি, সব প্রকাশ করে ফেলি। বুক থেকে যন্ত্রণা দূর হোক আর মাথা থেকে চিন্তা। যা আমাকে ঘুমাতে দেয় না, কাজ করতে অনাগ্রহী করে তোলে, স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনের চলার পথে ভয় সৃষ্টি করে। নানা প্রশ্ন আর বিতর্কে নিজে জর্জরিত হই প্রতিমুহূর্তে। খুব ইচ্ছা করে কাউকে সব বলে মুক্ত হয়ে যাই, অক্সিজেন নিই প্রাণ খুলে, পুরোনো সব ভুলে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখি।

কিন্তু পরমুহূর্তেই কেমন যেন চুপ হয়ে যাই। এত আগ্রহ, ইচ্ছা, তাড়না, ক্ষণিকের মধ্যেই যেন অতল সাগরে বিলীন হয়ে যায়। চারপাশে যখন তাকাই, তখন দেখি, কেউ আমার আপন নয় কিংবা আমি কাউকে আপন করতে পারিনি, প্রিয় করতে পারিনি। বিশ্বাস করে যে কাউকে কিছু কথা বলব, সে বিশ্বাসের অভাব, মানুষের অভাব, বোঝার অভাব। অথচ চারপাশে কত মানুষ, এ ক্ষুদ্র জীবনেও কত মানুষের সঙ্গে পরিচয়। দিন যত যায়, তত মানুষ অতীত হয় আর নতুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। এত সবের ভিড়ে যত্ন নেওয়া ও মনে রাখার মানুষ হয়তো হাতে গোনা কয়েকজন হয়, যদি কারও ভাগ্য ভালো হয়।

যাদের সঙ্গে আমাদের পরিচয়, তারা ব্যস্ত নিজের জীবন নিয়ে। নিজের স্বপ্ন নিয়ে, স্বপ্ন পূরণ করার সংগ্রাম নিয়ে, শত অভাব দূর করে সুন্দর জীবন গড়ার প্রত্যাশা নিয়ে। তাদের এত সময় কই আমার–আপনার কথা শোনার। আসলেই নেই। আর এটা সত্য, সুন্দর ও ইতিবাচক বিষয়। সবাই ব্যস্ত যার যার জীবন নিয়ে। যুগ এগিয়ে গেছে ন্যানোসেকেন্ডের চেয়ে ছোট্ট দৃষ্টির দ্রুতগতিতে। থেমে থাকার কোনো জো নেই। তাই কারোর জন্য কারও কাছে আসলেই সময় নেই। যার যার ঘড়ির কাঁটার সময় দেখে দেখে সে সারছে তার স্বপ্ন পূরণ করার ধাপগুলো। যে ধাপগুলো পার হলেই অনেকের বিশ্বাস, সে সফল হবে, সুন্দর জীবন পাবে, আনন্দে বাঁচতে পারবে। তাদের এই পথচলা থামার নয়, তাই সে পথে কেউ বিরতি নেয় না।

আরও পড়ুন

আমি নিজেকে প্রকাশ করার জন্য লেখা আবেদনগুলো আগুনে পুড়িয়ে ফেলি। তাতে যা ছাই হয়, সেগুলো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিই। তাতে দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণাগুলো বাতাসে মিশে গিয়ে শূন্যে মিলিয়ে যায়। কেউ দেখে না, জানে না, স্পর্শ করে না, জমিয়ে রাখে না। কোথাও কোনো চিহ্ন থাকে না। অদৃশ্যে হারিয়ে যায় মনের মধ্যে জমানো শত কষ্টের বাক্যগুলো। যেগুলো জীবনের প্রয়োজনে দানা বেঁধেছিল বুকে, জমাট হয়েছিল মাথার গুরুত্বপূর্ণ ব্রেনে। আমি এক নিমিষেই তা ধ্বংস করে দিই। মনে হয় কিছু সময়ের জন্য বেঁচে থাকার প্রকৃত স্বাদ অনুভব করি। এই অনুভূতি প্রকাশ করার মতো নয়, এ শুধু চোখ বন্ধ করে উপলব্ধি করতে হয়।

এত সব অস্থিরতার মধ্যেও মনে হয়, মনের যত্ন নেওয়ার জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখানো দরকার। পাশে থাকা কিংবা কাছে থাকা মানুষের সঙ্গে যেকোনো উপায়ে কথা প্রকাশ করা। আপন মনে হলে বিশ্বাস করে কষ্টের কারণ বলা। বিশ্বাস খুব দামি জিনিস, একবার হারালে আর মেলে না। কিন্তু মনে অবিশ্বাসের দানা দীর্ঘ হলে তা শক্ত হয়ে বরং মন ও স্বাস্থ্যের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করে। তার চেয়ে ভালো হয় মাঝেমধ্যে অবিশ্বাস্য মনে হলেও প্রয়োজনে বিশ্বাস করা। বিশ্বাস করে জমানো বাক্য বিনিময় করা। তাহলে পুরোপুরি সমাধান না হলেও মানসিক শান্তি মেলে, স্বাভাবিক কাজে গতি আসে আর জীবনে বাঁচার আগ্রহ বাড়ে।

হাজীপুর, নরসিংদী