ভালোবাসা মানে দখল নয়, দায়বদ্ধতা

ভালোবাসা মানে কাউকে তার নিজের মতো করে থাকতে দেওয়ার সাহসছবি: ফ্রিপিক

ভালোবাসা দিবস এলেই আমরা যেন এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় নামি, হুমড়ি খেয়ে পড়ি। কে কীভাবে দিবসটাকে পালন করব, কোথায় যাব, কাকে কী উপহার দেব, কীভাবে ছবি তুলব—দেশজুড়ে ভালোবাসা তখন অনুভবের চেয়ে প্রদর্শনের উৎসবে রূপ নেয়। কিন্তু এই ভিড়ের মধ্যেই কোথাও যেন নিঃশব্দে হারিয়ে যায় সেই গভীর, শান্ত ভালোবাসা। প্রকৃত ভালোবাসার অর্থ ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়। ভালোবাসা আসলে প্রতিদিনের দায়িত্ব, প্রতিদিনের চর্চা, আর প্রতিদিনের অনুভব।

ভালোবাসা হলো মানুষের জীবনের অন্যতম গভীর অনুভূতি। কিন্তু এই অনুভূতিই অনেক সময় ভুলভাবে ব্যাখ্যা হয়। ভালোবাসাকে যখন দখল, নিয়ন্ত্রণ কিংবা অধিকার হিসেবে দেখা হয়, তখন তা আর ভালোবাসা থাকে না। তা হয়ে ওঠে চাপ, ভয় এবং কষ্টের উৎস। প্রকৃত ভালোবাসা কখনোই কাউকে বন্দী করে না; বরং সে দায়িত্ব নেয় একজন মানুষের মানসিক, আবেগিক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার।

ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের মতো করে গড়ে তোলার চেষ্টা নয়। ভালোবাসা মানে কাউকে তার নিজের মতো করে থাকতে দেওয়ার সাহস। যেখানে ভালোবাসা দখলে পরিণত হয়, সেখানে প্রশ্ন করা অনিরাপদ হয়ে ওঠে, অনুভূতি প্রকাশ ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়, আর ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভেতর একজন মানুষ নিজের কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলে। এই হারিয়ে যাওয়া অনেক সময় চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে মানুষটি ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

দায়বদ্ধ ভালোবাসা জানে যে ভালোবাসা মানে নিয়ন্ত্রণ নয়। ভালোবাসা মানে নিরাপত্তা। এখানে শাসন নেই, আছে সম্মান। অভিযোগের চেয়ে বোঝার চেষ্টা বেশি। ‘তুমি এমন কেন?’ প্রশ্নের বদলে আসে, ‘তুমি কেমন আছ?’ দায়বদ্ধ ভালোবাসা অন্যজনের সীমাকে হুমকি হিসেবে দেখে না, বরং সেই সীমাকেই সম্মান করে।

আরও পড়ুন

ভালোবাসার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল থাকা। কারও না বলা, চুপ থাকা কিংবা দূরে সরে যাওয়াকে অবজ্ঞা হিসেবে না দেখে, তার পেছনের কারণ বোঝার চেষ্টা করা। কারণ, সব নীরবতা অবহেলা নয়; অনেক সময় নীরবতা নিজেকে সামলে নেওয়ার একটি ভাষা। দায়বদ্ধ ভালোবাসা এই ভাষা শুনতে শেখে।

সুস্থ ভালোবাসায় ‘না’ বলা নিরাপদ। এখানে দূরত্ব মানেই সম্পর্কের ভাঙন নয়, আর স্বাধীনতা মানেই বিচ্ছেদ নয়; বরং স্বাধীনতা সম্পর্ককে আরও পরিণত করে। যখন একজন মানুষ জানে যে সে নিজের মতো করে ভাবতে, অনুভব করতে ও সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তখনই সে সম্পর্কের ভেতর সত্যিকারের উপস্থিত থাকতে পারে।

ভালোবাসা তখনই অর্থপূর্ণ হয়, যখন তা বোঝা হয়ে ওঠে না। যখন ভালোবাসার জন্য নিজেকে ছোট করতে হয় না, নিজের প্রয়োজন চাপা দিতে হয় না বা বারবার নিজেকে প্রমাণ করতে হয় না। দায়বদ্ধ ভালোবাসা মানুষকে নিঃশেষ করে না; বরং ধীরে ধীরে শক্ত করে তোলে।

ভালোবাসা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় ফুল, উপহার কিংবা মুহূর্তের রোমান্টিকতার বাইরে থাকা একটি গভীর সত্য। ভালোবাসা প্রতিদিনের চর্চা, প্রতিদিনের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের ভেতরেই ভালোবাসার প্রকৃত সৌন্দর্য।

এই ভালোবাসা দিবসে, ভালোবাসার নামে দখল নয়, দায়বদ্ধতা, সম্মান এবং মানসিক নিরাপত্তাকেই বেছে নেওয়া হোক।

সাইকোথেরাপিস্ট ও মানসিক–বিষয়ক প্রশিক্ষক, কনসালট্যান্ট, সিটি হাসপাতাল লিমিটেড এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ