ভুল করলেই কেন নিজের ওপর এত রাগ হয়

ভুল জীবনের অংশ। ভুল করাও মানুষের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতাছবি: এআই/বন্ধুসভা

ঢাকার একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মায়া (ছদ্মনাম)। সে যে কাজই করে, কোনো না কোনো ভুল করবেই। এ নিয়ে শিক্ষক থেকে শুরু করে সহপাঠীরা পর্যন্ত কথা শোনায়। মাঝেমধ্যে হতাশ হয়ে সে বলে, ‘আমি যা কিছুই করি, কারোই পছন্দ হয় না।’ একসময় সে নিজেকেই দোষারোপ করতে শুরু করে। বলে, ‘আমি মানুষটাই ঝামেলার।’

সুদীপ্ত রাজশাহীর একটি বেসরকারি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। তার কাজ ক্লায়েন্টদের মেইল পাঠানো। একবার ভুল করে একজনের ফাইল সে আরেকজনকে পাঠিয়ে দেয়। এর পর থেকেই মনের মধ্যে অস্বস্তি…‘আমি কি বড় কোনো ভুল করে ফেললাম!’
পরমুহূর্তেই সঠিক ফাইলটা আবার পাঠিয়ে দেয়। তবু ডেস্কে বসে বারবার সেই ভুলের কথাই ভাবতে থাকে, সবাই নিশ্চয়ই তার ভুল ধরে ফেলবে! এখন কি তাকে সবাই অযোগ্য মনে করবে!

আপনি কি কখনো মায়া কিংবা সুদীপ্তর মতো এমন অনুভূতির মধ্য দিয়ে গেছেন? অন্য কেউ ভুল করলে তাকে যতটা সহজে ক্ষমা করতে পারেন, নিজের ভুলের ক্ষেত্রে কি ততটাই কঠোর হন? ছোটখাটো কোনো ভুল কি কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাথায় ঘুরতে থাকে? এগুলোর উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে মন খারাপ করার কিছু নেই। এমন ভুল আপনি একা নন, অনেকেই করেন।

এ সমস্যায় যাঁরা ভুগছেন, তাঁদের উদ্দেশে মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ও লেখক জোনিস ওয়েব বলেন, ‘আজ আমি আপনাকে বোঝাতে চাই, কীভাবে অজান্তেই আপনি নিজের পথে নিজেই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার উপায়ও আছে।’

সাইকোলজি টুডেতে মার্কিন এই মনোবিজ্ঞানী বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন—

ভুলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনুভূতি
নিজের প্রতি সবচেয়ে কঠোর মানুষগুলোর মধ্যে একটি বিষয় প্রায়ই দেখা যায়, তাঁরা নিজেদের অনুভূতি সম্পর্কে খুব একটা সচেতন নন। কেন?

কারণ, আমরা যখনই কোনো ভুল করি, তা যত ছোটই হোক, আমাদের ভেতরে একটি অনুভূতির জন্ম হয়। আর যে অনুভূতিকে আমরা সচেতনভাবে খেয়াল করি না, সেটিই অনেক সময় আমাদের ওপর বেশি প্রভাব বিস্তার করে। অজান্তেই সেই অনুভূতি আমাদের চিন্তা ও আচরণকে পরিচালনা করতে থাকে।

বিষয়টি বোঝার জন্য চুলায় বসানো একটি পাতিলের কথা ভাবুন। আপনি যদি পাতিলটির দিকে খেয়াল রাখেন, আঁচ বেশি হলে কমিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু পাতিলটি চুলায় বসিয়ে রেখে চলে গেলে? আঁচ বাড়তেই থাকবে, একসময় পানি ফুটে উপচে পড়বে।

খেয়াল না করা অনুভূতিও অনেকটা তেমন। কোনো ভুলের পর ভেতরে যে অস্বস্তি, লজ্জা, ভয় বা অপরাধ বোধ তৈরি হয়, সেটিকে যদি আমরা চিনতে না পারি, তাহলে সেটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। একসময় ছোট একটি ভুলও আমাদের কাছে বিশাল কোনো ব্যর্থতা বলে মনে হয়।

শৈশবের মানসিক অবহেলা
আমাদের দেশে এটি বেশ পরিচিত একটি অভিজ্ঞতা। সমস্যা হলো, এটি খুব সহজে চোখে পড়ে না।

শৈশবের মানসিক অবহেলা বলতে মা–বাবা আপনার সঙ্গে কী করেছেন, তা বোঝায় না; বরং বোঝায়, আপনার অনুভূতির ক্ষেত্রে তাঁরা কী করেননি।
শিশু যখন বড় হয়ে ওঠে, তখন চারপাশের মানুষ যদি তার অনুভূতিগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে না দেখেন, বুঝতে না চান বা সেগুলোর প্রতি প্রয়োজনমতো সাড়া না দেন, তখন ধীরে ধীরে এই মানসিক অবহেলা তৈরি হতে পারে।

এখানে এমন কোনো একটি ঘটনা থাকে না, যেটিকে আপনি চিহ্নিত করে বলতে পারবেন—‘এই ঘটনাটিই আমাকে কষ্ট দিয়েছে।’
কোনো দৃশ্যমান ক্ষত থাকে না। ভয়ংকর কোনো স্মৃতিও হয়তো থাকে না। এ কারণেই বিষয়টি এত সহজে অদৃশ্য থেকে যায়। এমনকি এমন একটি পরিবারেও শৈশবের মানসিক অবহেলা ঘটতে পারে, যেখানে মা–বাবা সন্তানকে ভালোবাসতেন, তার প্রয়োজনীয় সবকিছু দিয়েছেন এবং বাইরে থেকে দেখলে পরিবারটিকে একেবারেই স্বাভাবিক মনে হতো।

তবু বছরের পর বছর আপনার অনুভূতিগুলো যদি যথেষ্ট গুরুত্ব না পায়, তাহলে মনের গভীরে একটি নীরব ধারণা জন্ম নিতে পারে, ‘আমার অনুভূতির তেমন মূল্য নেই।’ ধীরে ধীরে সেই ধারণা নিজের প্রতিও ছড়িয়ে পড়তে পারে, ‘হয়তো আমার তেমন মূল্য নেই।’

এর সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হারিয়ে যায়। শিশু হিসেবে আমরা কিছু আবেগজাত দক্ষতা শেখার সুযোগ পাই না—কীভাবে নিজের অনুভূতিকে চিনতে হয়, তার নাম দিতে হয় এবং সেটিকে সামলাতে হয়। কেউ হয়তো আপনার পাশে বসে বলেনি, ‘তুমি এখন কষ্ট পাচ্ছ, তুমি রাগ করছ, তোমার ভয় লাগছে; চলো, আমরা এটা নিয়ে কথা বলি।’
ফলে বড় হয়ে আপনি নিজের অনুভূতিগুলো সামলাতে গিয়ে অনেকটা নিজের মতো করেই পথ খুঁজে নিয়েছেন।

এখানে একটি কথা বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি, মানসিক অবহেলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাবা-মায়েরাও অনেক সময় ইচ্ছা করে এমনটি করেন না। তাঁরা হয়তো নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, কোনো কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিংবা তাঁদের শৈশবও ছিল একই রকম। তাঁরাও হয়তো কখনো শেখেননি, কীভাবে সন্তানের অনুভূতিকে বুঝতে হয়, তার পাশে দাঁড়াতে হয়।

যে জিনিস কেউ নিজে পায়নি, তা অন্যকে দেওয়াও অনেক সময় তার পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই অনেক ক্ষেত্রেই এর জন্য কাউকে দোষী করার প্রয়োজন নেই।
আর আপনি আজ নিজের প্রতি যেভাবে কঠোর, সেটিও আপনার দোষ নয়। আপনাকে অন্যভাবে নিজের অনুভূতিকে সামলাতে শেখানো হয়নি। আপনি শুধু শৈশবে যা শিখেছেন, তা-ই করে চলেছেন। এই সত্য বুঝতে পারা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তখনই আপনি ধীরে ধীরে নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ করার সুযোগ পাবেন।

আরও পড়ুন

তাহলে কী করবেন?
আবেগ ও অনুভূতি সামলানোর দক্ষতা যেকোনো বয়সেই শেখা সম্ভব।
মানুষ ভুল করবেই। সমাধান হলো—ভুলের পর নিজের ভেতরে কী ঘটছে, সেদিকে একটু মনোযোগ দেওয়া। অনুভূতিটিকে চিনে নেওয়া, যাতে সেটি আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। এ জন্য কয়েকটি ছোট ধাপ অনুসরণ করা যেতে পারে।

আপনার ভেতরে একটি অনুভূতি তৈরি হয়েছে যে তা প্রথমে বুঝতে হবে। কোনো ভুল করার পর যদি অস্বস্তি, লজ্জা কিংবা ভয় আপনাকে ঘিরে ধরে, তাহলে একটু থামুন। নিজের ভেতরে তাকান। নিজেকে বলুন, ‘এই মুহূর্তে আমার ভেতরে একটি অনুভূতি তৈরি হচ্ছে।’ শুধু এটুকু সচেতন হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। এরপর অনুভূতিটির নাম দিন। আপনার হয়তো লজ্জা লাগছে। হয়তো ভয় হচ্ছে, অন্যরা আপনার ভুল ধরে ফেলবে। হয়তো মনে হচ্ছে, সবাই আপনাকে অযোগ্য ভাববে। যে অনুভূতিই হোক, সেটিকে অস্বীকার করার দরকার নেই। অনুভূতিটিকে অনুভব করার অধিকার আপনার আছে। অনেক সময় কোনো অনুভূতিকে স্বীকার করে তার একটি নাম দিতে পারলেই তীব্রতা কমে আসে। নিজের ভেতরে কী চলছে, সেটি ভাষায় প্রকাশ করতে পারা আমাদের সেই অনুভূতির সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করতে সাহায্য করে।

নিজেকে নয়, নিজের কাজকে বিচার করুন। ‘আমি ভুল করেছি’ এবং ‘আমি একজন ভুল মানুষ’—এই দুটি কথার মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে। আপনি যা করেছেন, তার দায়িত্ব নিন। কিন্তু একটি ভুলের সঙ্গে আপনার পুরো পরিচয়কে জুড়ে দেবেন না। ‘আমি ভুল করেছি’—এই উপলব্ধি আপনাকে পরেরবার আরও সতর্ক হতে সাহায্য করবে। কিন্তু ‘আমি অযোগ্য’, ‘আমি সব সময় ভুল করি’, ‘আমি ভালো নই’—এ ধরনের ভাবনা আপনাকে শুধু ভেতর থেকে দুর্বল করে দেবে।

নিজেকে পরিবর্তন করতে কখনোই দেরি হয় না
ছোটবেলায় যখন আপনার অনুভূতিগুলো বারবার উপেক্ষিত হয়েছে, তখন আপনি সেগুলোর যত্ন নিতে শেখেননি। আপনার সঙ্গে এমনটাই ঘটেছে। এই বিষয় জানা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শৈশবে আপনি যা শেখেননি, বড় হয়েও তা শেখা সম্ভব। শেখার কোনো বয়স নেই। নিজের অনুভূতিকে বুঝতে এবং স্বীকার করতে যত বেশি শিখবেন, নিজের প্রতি আক্রমণাত্মক কঠোর কণ্ঠটি ততই ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসবে।

ভুল জীবনের অংশ। ভুল করাও মানুষের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। তাই পরেরবার কোনো ছোট ভুল করে যখন নিজের ওপর রাগ হতে শুরু করবে, একটু থামুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন—‘আমি কী অনুভব করছি?’
হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে নিজের প্রতি একটু বেশি কোমল হওয়ার পথ।